৬ অক্টোবর, ২০২৬ এ ৫:৪৫ PM
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাবিজ্ঞানবিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্থান: বহুপাক্ষিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংকট, ভূরাজনীতি ও গ্লোবাল সাউথ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্থান: বহুপাক্ষিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংকট, ভূরাজনীতি ও গ্লোবাল সাউথ
২০২৬ সালের ২২ জানুয়ারি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ডব্লিউএইচও থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রস্থান কার্যকর হয়েছে। ঠিক দুদিন পর, ২৪ জানুয়ারি ডব্লিউএইচও জেনেভায় এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানায় যে, ওয়াশিংটনের এই পশ্চাদপসরণ যুক্তরাষ্ট্র এবং অবশিষ্ট বিশ্ব উভয়কেই মারাত্মকভাবে অসুরক্ষিত করে তুলেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের ওপর ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই আন্তর্জাতিক সংস্থার জন্মলগ্ন থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ছিল প্রধান প্রতিষ্ঠাতা অংশীদার এবং বৃহত্তম নিয়মিত অর্থায়নকারী। ডব্লিউএইচওর বাৎসরিক বাজেটের প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ জোগান দিত ওয়াশিংটন, যার আর্থিক পরিমাণ বছরে প্রায় ৪০ কোটি থেকে ৫০ কোটি ডলারের সমতুল্য। সংস্থাটির ৭৮ বছরের ইতিহাসে কোনো পরাশক্তির এমন আকস্মিক ও পূর্ণাঙ্গ প্রস্থান ইতিপূর্বে কখনো ঘটেনি। এই বিদায় কেবল একটি সাধারণ আর্থিক সংকট নয়, বরং আধুনিক বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিকেই গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে।
বহুপাক্ষিক জনস্বাস্থ্য কূটনীতির মূল ভিত্তি দাঁড়িয়ে থাকে বিশ্বজনীন সংহতি, রিয়েল টাইম তথ্য আদান-প্রদান এবং যৌথ রোগতাত্ত্বিক নজরদারির ওপর। কোনো সংক্রামক ব্যাধি যখন আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করে ছড়িয়ে পড়ে, তখন কোনো একক রাষ্ট্র কেবল নিজের ভৌগোলিক দেয়াল তুলে পুরোপুরি সুরক্ষিত থাকতে পারে না। বৈশ্বিক সংক্রামক রোগের বিস্তার রোধে সম্মিলিত বহুপাক্ষিক কাঠামোর কোনো কার্যকর বিকল্প নেই। কিন্তু ওয়াশিংটনের বর্তমান নীতি এককেন্দ্রিক জাতীয় নিরাপত্তা ও বিচ্ছিন্নতাবাদের ওপর গুরুত্ব দেওয়ায় বহুপাক্ষিক যৌথ সুরক্ষার ধারণাটি তীব্র রাজনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছে। জেনেভায় ডব্লিউএইচওর নির্বাহী পর্ষদের জরুরি বৈঠক এবং ২০২৬ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনের আগে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাই এক নজিরবিহীন ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। এই রূপান্তর কেবল বড় পরাশক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক চালচিত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং আফ্রিকার সাহারা অঞ্চল থেকে শুরু করে বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ উন্নয়নশীল দেশের তৃণমূল স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সুদূরপ্রসারী কম্পন সৃষ্টি করছে।
অধ্যায় ১: ওয়াশিংটনের অভিযোগ ও বহুপাক্ষিক কাঠামোর ভাঙন
হোয়াইট হাউসের এই ঐতিহাসিক প্রস্থানের পটভূমি আকস্মিক নয়, বরং এটি দীর্ঘ কয়েক বছরের রাজনৈতিক ক্ষোভ ও প্রাতিষ্ঠানিক দূরত্বের চূড়ান্ত পরিণতি। ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি শপথ গ্রহণের দিনেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে ডব্লিউএইচও থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সদস্যপদ প্রত্যাহারের এক বছর মেয়াদী আনুষ্ঠানিক নোটিশ জারি করেন। সেই সাংবিধানিক সময়সীমা পূর্ণ করে ২০২৬ সালের ২২ জানুয়ারি দেশটি সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। প্রস্থান কার্যকর হওয়ার সাথে সাথে মার্কিন প্রশাসন ডব্লিউএইচও সদর দপ্তর থেকে তাদের সমস্ত বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র বা সিডিসির বিশেষজ্ঞদের প্রত্যাহার করে নেয়। একই সাথে ডব্লিউএইচওর পরিচালনা পর্ষদ, কারিগরি কমিটি কিংবা যৌথ নীতি নির্ধারণী অধিবেশনে যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্ব সম্পূর্ণ স্থগিত করা হয়।
ওয়াশিংটনের এই বিদায়ের পেছনে তিনটি প্রধান অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রথমত, ২০২০ সালে শুরু হওয়া কোভিড মহামারি ব্যবস্থাপনায় ডব্লিউএইচওর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা এবং চীনের প্রতি সংস্থাটির তথাকথিত পক্ষপাতিত্ব। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক কাঠামোর ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার রোধে প্রয়োজনীয় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি। তৃতীয়ত, স্বাধীন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ দ্বারা প্রস্তাবিত জরুরি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন না করা। মার্কিন প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, আমেরিকান করদাতাদের অর্থ এমন এক আন্তর্জাতিক সংস্থায় খরচ করা সমীচীন নয়, যা জাতীয় সার্বভৌমত্বকে পাশ কাটিয়ে আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ আরোপের চেষ্টা করে। আরও চরম পদক্ষেপ হিসেবে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জন্য ডব্লিউএইচওর অনুকূলে যুক্তরাষ্ট্রের নির্ধারিত সদস্য চাঁদা বাবদ পাওনা প্রায় ২৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার বকেয়া পরিশোধ না করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে হোয়াইট হাউস।
ডব্লিউএইচও জেনেভায় প্রদত্ত আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই অভিযোগগুলো সরাসরি খণ্ডন করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে যে, মহামারি চলাকালে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে দ্রুততম সময়ে তথ্য সরবরাহ করা হয়েছিল এবং কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ পদক্ষেপে হস্তক্ষেপ করা হয়নি। ডব্লিউএইচও কখনোই সদস্য দেশগুলোর ওপর কোনো ধরনের বাধ্যতামূলক লকডাউন, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা কিংবা বাধ্যতামূলক ভ্যাকসিন সনদ প্রয়োগের আইন তৈরি করেনি। এসব সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট সার্বভৌম সরকারগুলোর নিজস্ব রাজনৈতিক বিবেচনায় গৃহীত হয়েছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, স্বাধীন বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্ম ত্যাগ করে কোনো রাষ্ট্র জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তায় একক সাফল্য অর্জন করতে পারে না। বরং আন্তর্জাতিক নজরদারি কাঠামো থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে নেওয়া ওয়াশিংটনের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ মহামারি প্রস্তুতিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
অধ্যায় ২: অর্থায়নের শূন্যতা, নজরদারি ব্যবস্থার ঝুঁকি ও বিকল্প তহবিল
ডব্লিউএইচওর আর্থিক কাঠামো প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত, যার একটি হলো সদস্য রাষ্ট্রগুলোর নির্ধারিত সংবিধিবদ্ধ চাঁদা এবং অন্যটি স্বেচ্ছাসেবী আর্থিক অনুদান। সংস্থাটির মোট বাজেটের সিংহভাগই আসে স্বেচ্ছাসেবী তহবিল থেকে, যার প্রধান উৎস ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের এই আকস্মিক প্রত্যাহারের ফলে সংস্থাটির নিয়মিত কার্যক্রম ও কর্মসূচিগুলোতে প্রায় বিশ শতাংশের বিশাল বাজেট ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বৈশ্বিক পোলিও নির্মূল উদ্যোগ বা জিপিইআই এবং জরুরি স্বাস্থ্য তহবিল বা সিএফই। সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আফ্রিকার দুর্গম অঞ্চলে মাতৃস্বাস্থ্য ও নবজাতক মৃত্যুহার কমানোর যেসব কর্মসূচি চলছিল, সেগুলোতে রাতারাতি অর্থায়ন স্থগিত হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
আর্থিক সংকটের চেয়েও গুরুতর সংকট দেখা দিয়েছে বৈশ্বিক রোগতাত্ত্বিক তথ্য বিনিময় ও প্যাথোজেন নজরদারির ক্ষেত্রে। গত সাত দশক ধরে ডব্লিউএইচওর গ্লোবাল ইনফ্লুয়েঞ্জা নজরদারি ও প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা বা জিআইএসআরএস বিশ্বজুড়ে নতুন নতুন ফ্লু ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্স সংগ্রহ করে বার্ষিক ভ্যাকসিনের রূপরেখা তৈরি করে আসছে। মার্কিন রোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা সিডিসি ছিল এই নেটওয়ার্কের সবচেয়ে শক্তিশালী কারিগরি খুঁটি। যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের প্রত্যাহার করে নেওয়ায় মার্কিন ল্যাবরেটরিগুলোর জিনোম সিকোয়েন্সিং ডেটা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে ভাগাভাগি করার নিয়মিত প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে কোনো অজানা জুনোটিক ভাইরাস বা নতুন প্যাথোজেন সীমান্ত পেরিয়ে মানুষের শরীরে সংক্রমিত হলে তা দ্রুত শনাক্ত করার বৈশ্বিক চেইন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে তথ্যের বিচ্ছিন্নতা সবসময় সংক্রামক জীবাণুকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ করে দেয়।
এই গভীর আর্থিক ও কাঠামোগত শূন্যতা মোকাবিলায় জেনেভায় বিকল্প তহবিলের নতুন কৌশলগত সমীকরণ শুরু হয়েছে। ২০২৪ সালে গৃহীত চতুর্দশ সাধারণ কর্মসূচির অধীনে ডব্লিউএইচও তাদের প্রথম ইনভেস্টমেন্ট রাউন্ডের মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহের কাজ জোরদার করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ফ্রান্স, জার্মানি ও নেদারল্যান্ডস তাদের স্বেচ্ছাসেবী অনুদান বৃদ্ধি করার ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো, বিশেষ করে সৌদি আরব ও কাতার ডব্লিউএইচওর জরুরি কার্যক্রমে নতুন করে আর্থিক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলছে। একই সাথে এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ অর্থনীতি দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান বিশ্ব স্বাস্থ্য কূটনীতিতে নিজেদের অবস্থান সংহত করতে এগিয়ে এসেছে। তবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনটি লক্ষ করা যাচ্ছে উন্নয়নশীল বিশ্বে। আফ্রিকান ইউনিয়নের সাম্প্রতিক অবস্থান অনুযায়ী, আফ্রিকা মহাদেশকে বেঁচে থাকার জন্য বিদেশি ত্রাণের ওপর নির্ভরশীলতা ত্যাগ করে স্বাস্থ্য সার্বভৌমত্ব অর্জন করতে হবে। মহাদেশীয় স্তরে নিজস্ব ওষুধ ও ভ্যাকসিন উৎপাদন ক্ষমতা গড়ে তোলাই এখন তাদের দীর্ঘমেয়াদী নীতি।
অধ্যায় ৩: জেনেভায় ক্ষমতার শূন্যতা, চীন ও মহামারি চুক্তির সংকট
আন্তর্জাতিক কূটনীতির একটি চিরন্তন সত্য হলো, কোনো পরাশক্তি যখন একটি বহুপাক্ষিক মঞ্চ থেকে পিছু হটে, তখন সেখানে কখনোই স্থায়ী শূন্যতা থাকে না। জেনেভায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সদর দপ্তরে যুক্তরাষ্ট্রের বিদায় যে শূন্যতা তৈরি করেছে, তা পূরণ করতে দ্রুত এগিয়ে আসছে দ্বিতীয় বৃহত্তম পরাশক্তি চীন। বেইজিং ইতোমধ্যে তাদের হেলথ সিল্ক রোড উদ্যোগের আওতায় এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে চিকিৎসা সহায়তা সম্প্রসারণের গতি বাড়িয়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক ফোরামে আমেরিকান অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে চীন ডব্লিউএইচওর নীতি নির্ধারণী কমিটিগুলোতে নিজেদের কর্মকর্তাদের প্রভাব সংহত করার চেষ্টা করছে। এর ফলে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য কূটনীতি একটি নিরপেক্ষ বৈজ্ঞানিক পরিমণ্ডলের বদলে পরাশক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক দাবার ঘুঁটিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।
এই মেরুকরণের সবচেয়ে প্রত্যক্ষ আঘাত এসেছে প্রস্তাবিত বৈশ্বিক মহামারি চুক্তি বা প্যান্ডেমিক এগ্রিমেন্টের ওপর। কোভিড পরবর্তী পৃথিবীতে নতুন কোনো মহামারির পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলো এক ঐতিহাসিক আইনগত চুক্তি প্রণয়নের জন্য দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে দরকষাকষি করে আসছিল। এই চুক্তির অন্যতম মূল উদ্দেশ্য হলো প্যাথোজেন বা জীবাণুর জেনেটিক ডেটা আদান-প্রদান এবং ভ্যাকসিন ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধের ন্যায্য বণ্টনের সুনির্দিষ্ট আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করা। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শুরু থেকেই এই চুক্তিকে তাদের জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও মার্কিন ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মেধা সম্পত্তির ওপর আঘাত হিসেবে চিহ্নিত করে আসছিল। ওয়াশিংটনের আনুষ্ঠানিক প্রস্থান এই ঐতিহাসিক চুক্তিকে আইনি ও রাজনৈতিকভাবে চরম দুর্বল করে দিয়েছে। বিশ্বের শীর্ষ গবেষণা ও ওষুধ প্রস্তুতকারী পরাশক্তিকে বাইরে রেখে কোনো বৈশ্বিক মহামারি চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন প্রায় অসম্ভব।
এই সংকটময় পরিস্থিতিকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের সাথে তুলনা করলে বর্তমান বিশ্বের বিপজ্জনক বিভাজনটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগে যখন তীব্র স্নায়ুযুদ্ধ চলছিল, তখনও যুক্তরাষ্ট্র ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্ল্যাটফর্মে একযোগে কাজ করেছিল। সেই সময় আদর্শিক বৈরিতা থাকা সত্ত্বেও দুই পারমাণবিক পরাশক্তি গুটিবসন্ত নির্মূলের বৈশ্বিক অভিযানে বিজ্ঞান ও ভ্যাকসিনের অবাধ আদান-প্রদান নিশ্চিত করেছিল। সেই যৌথ সংহতির ফলেই ১৯৮০ সালে মানবজাতি সফলভাবে গুটিবসন্ত নির্মূল ঘোষণা করতে পেরেছিল। কিন্তু আজকের একবিংশ শতাব্দীতে আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য তার সেই যৌথ নৈতিক মেরুদণ্ড হারিয়ে একতরফা জাতীয়তাবাদ ও বাণিজ্য সুরক্ষাবাদের শিকার হয়েছে। এটি গোটা মানবজাতির সম্মিলিত সুরক্ষাব্যবস্থার এক অপূরণীয় ক্ষতি।
অধ্যায় ৪: বাংলাদেশের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা ও উন্নয়নশীল বিশ্বের কৌশল
বৈশ্বিক স্বাস্থ্য কূটনীতির এই ভূরাজনৈতিক ভূমিকম্প বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল ও জনবহুল দেশগুলোর ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে বাধ্য। স্বাধীনতা পরবর্তী পাঁচ দশকে বাংলাদেশ জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় যেসব ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে, তার সাথে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিরবচ্ছিন্ন কারিগরি ও প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারিত্ব অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআই বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রান্তিক পর্যায়ে ৯৫ শতাংশের বেশি শিশুকে টিকার আওতায় এনেছে। এই দীর্ঘ প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ ২০১৪ সালে পোলিওমুক্ত দেশের আন্তর্জাতিক সনদ লাভ করে এবং মাতৃ ও নবজাতকের ধনুষ্টংকার সফলভাবে নির্মূল করতে সক্ষম হয়। এছাড়া ডব্লিউএইচওর প্রোটোকল ও সহায়তায় কালাজ্বর নির্মূলে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে ঢাকা। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বা আইসিডিডিআর,বি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাথে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ওরাল কলেরা ভ্যাকসিন মজুত ও গবেষণায় আন্তর্জাতিক মানে অবদান রেখে আসছে।
তবে বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সামনে তিনটি গুরুতর নতুন স্বাস্থ্যঝুঁকি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। প্রথমত, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ডেঙ্গুর ব্যাপক বিস্তার সারা দেশে প্রায় বছরব্যাপী স্থায়ী রূপ নিয়েছে। দ্বিতীয়ত, প্রায় প্রতি বছর শীত মৌসুমে বাদুড় থেকে সংক্রমিত নিপাহ ভাইরাসের প্রাণঘাতী প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়, যার মৃত্যুহার সত্তর শতাংশেরও বেশি। তৃতীয়ত এবং সবচেয়ে ভয়াবহ নীরব সংকট হলো অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী সুপারবাগের বিস্তার। ডব্লিউএইচওর জরুরি তহবিল ও কারিগরি সরবরাহ চেইন ব্যাহত হলে এসব মহামারি মোকাবিলার মতো জিনোম সিকোয়েন্সিং কিট, জরুরি ওষুধ এবং ডায়াগনস্টিক সরঞ্জামের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। উপরন্তু আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে গেলে তৃণমূল পর্যায়ের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর ওপর আর্থিক চাপ বৃদ্ধি পাবে।
এই সংকটময় পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য নীতি নির্ধারকদের জন্য পুরোনো নির্ভরতার কৌশল পুনর্বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রথমত, জিডিপির অনুপাতে জাতীয় স্বাস্থ্য বাজেটের বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে কোনো আন্তর্জাতিক তহবিলের শূন্যতা তৈরি হলে দেশীয় জরুরি কার্যক্রম থমকে না যায়। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বেসরকারি ওষুধশিল্পের বিশাল উৎপাদন সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে নিজস্ব ভ্যাকসিন উদ্ভাবন ও বায়োটেকনোলজি গবেষণায় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, একমুখী বহুপাক্ষিক নির্ভরতার বদলে আঞ্চলিক সহযোগিতা কাঠামো, যেমন বিমসটেক বা দক্ষিণ এশীয় ফোরামের মাধ্যমে যৌথ সংক্রামক ব্যাধি নজরদারি ও জরুরি ওষুধ তহবিল গঠন করা আবশ্যক। বৈশ্বিক ব্যবস্থার ভাঙন স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে, জাতীয় জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তা এখন আর কেবল আন্তর্জাতিক সহযোগীদের অনুগ্রহের ওপর ছেড়ে দেওয়ার মতো কোনো গৌণ বিষয় নয়। এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌম অস্তিত্ব রক্ষার এক অপরিহার্য নীতি।
আমরা কী শিখলাম?
১. আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তা কোনো বিচ্ছিন্ন অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; কোনো একটি পরাশক্তি বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্ম ত্যাগ করলে বিশ্বজুড়ে রোগতাত্ত্বিক নজরদারি ও জরুরি প্রস্তুতি চরম ঝুঁকিতে পড়ে।
২. ডব্লিউএইচওর বাৎসরিক বাজেটে একক দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্বকে রাজনৈতিক জিম্মিদশায় পরিণত করে।
৩. আন্তর্জাতিক মহামারি মোকাবিলার মূল শক্তি হলো রিয়েল টাইম বৈজ্ঞানিক তথ্য ও জিনোম সিকোয়েন্স ভাগাভাগি করা, যা বন্ধ হলে নতুন ভাইরাসের মিউটেশন দ্রুত শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
৪. শীতল যুদ্ধকালীন আদর্শিক সংঘাতের ভেতরেও বিজ্ঞান ও মানবিক কারণে যৌথ উদ্যোগ সম্ভব হলেও বর্তমান একবিংশ শতাব্দীতে আন্তর্জাতিক কূটনীতি সেই নৈতিক ঐক্য ধরে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে।
৫. অনুদাননির্ভরতা কাটিয়ে উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোর নিজস্ব স্বাস্থ্য সার্বভৌমত্ব ও স্থানীয় ওষুধ উৎপাদন সক্ষমতা অর্জনই ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য নিরাপত্তার একমাত্র টেকসই নিশ্চয়তা।
৬. বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোকে উদীয়মান জলবায়ু রোগ ও সুপারবাগের ঝুঁকি মোকাবিলায় জাতীয় স্বাস্থ্য বাজেট বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক যৌথ স্বাস্থ্য প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
উপসংহার
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রস্থান কেবল জেনেভার একটি ভবনের প্রাতিষ্ঠানিক টানাপোড়েন নয়, বরং এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বহুপাক্ষিক ঐক্যের কফিনে আরও একটি পেরেক। স্বাস্থ্য কখনোই কোনো সীমান্ত চেনে না, কোনো জাতীয় পাসপোর্টের তোয়াক্কা করে না এবং কোনো পরাশক্তির রাজনৈতিক সীমানায় বন্দি থাকে না। একটি মহামারি কতটা মারাত্মক আকার ধারণ করবে, তা নির্ধারিত হয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সবচেয়ে দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থাটি কতটা সুরক্ষিত তার ওপর। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি এই ঐতিহাসিক প্রস্থানকে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে গ্রহণ না করে, তবে আগামী দিনে বিশ্ব মানবজাতিকে আরও ভয়াবহ মহামারি বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে। একই সাথে এই সংকট উন্নয়নশীল বিশ্বের সামনে একটি ঐতিহাসিক সুযোগও তৈরি করেছে। কোনো দূরবর্তী পরাশক্তির করুণা বা খেয়ালের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং নিজস্ব স্বনির্ভরতা, আঞ্চলিক সংহতি এবং বিজ্ঞানভিত্তিক স্বাস্থ্য সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই গড়ে তুলতে হবে আগামীর জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা দুর্গ।
নিজেকে যাচাই করুন