১৪ অক্টোবর, ২০২৬ এ ১:৩৪ PM
ইতিহাস ও ঐতিহ্যমধ্যযুগীয় চিকিৎসালয় ও হাকিমদের ভেষজ দাওয়াই: স্বাধীন সুলতানি বাংলায় তিব্ব-ই-ইউনানি, দারুশ শিফা ও স্বাস্থ্যসেবার গৌরবময় ঐতিহ্য

মধ্যযুগীয় চিকিৎসালয় ও হাকিমদের ভেষজ দাওয়াই: স্বাধীন সুলতানি বাংলায় তিব্ব-ই-ইউনানি, দারুশ শিফা ও স্বাস্থ্যসেবার গৌরবময় ঐতিহ্য
মধ্যযুগীয় বাংলায় চতুর্দশ থেকে ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত স্বাধীন ইলিয়াস শাহী ও গণেশ-পরবর্তী সুলতানি শাসনামলে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এক গৌরবময় প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পারস্য ও মধ্য এশিয়া থেকে আগত অভিজ্ঞ হাকিমদের হাত ধরে প্রবেশ করে তিব্ব-ই-ইউনানির ধারা। রাজ্যের সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে রাজধানী পাণ্ডুয়া, গৌড় ও সোনারগাঁওয়ে গড়ে উঠেছিল সুসংগঠিত দাতব্য চিকিৎসালয় বা দারুশ শিফা। ওয়াকফ ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পরিচালিত এসব প্রতিষ্ঠান সুশাসনের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
বাংলার আর্দ্র জলবায়ুতে ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর, ওলাউঠা ও আমাশয়ের মতো ব্যাধি সবসময়ই মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করত। এই প্রাকৃতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মুসলিম হাকিমগণ প্রাচীন ভারতীয় আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা ও স্থানীয় কবিরাজি অভিজ্ঞতার সাথে ইউনানি পদ্ধতির এক চমৎকার মেলবন্ধন ঘটান। রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও আলেম সমাজের উদ্যোগে মধ্যযুগীয় চিকিৎসালয়গুলো আর্তমানবতার আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়। বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণ, পথ্য ব্যবস্থাপনা এবং উন্নত নাড়ি পরীক্ষার মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা প্রদান ছিল আধুনিক গণস্বাস্থ্য ব্যবস্থার এক ঐতিহাসিক ভিত্তি।
অধ্যায় ১: স্বাধীন সুলতানি বাংলায় ইউনানি চিকিৎসাবিজ্ঞানের আগমন ও রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা
ইলিয়াস শাহী রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ বাংলাকে প্রথমবারের মতো এক অখণ্ড সালতানাতে রূপ দিলে জ্ঞানবিজ্ঞানের বহু শাখার দুয়ার উন্মুক্ত হয়। পরবর্তীকালে গিয়াসউদ্দীন আজম শাহ, রুকনুদ্দীন বারবাক শাহ ও আলাউদ্দীন হোসেন শাহের আমলে চিকিৎসাবিদ্যা নতুন শিখরে পৌঁছায়। মুসলিম শাসকগণ উপলব্ধি করেছিলেন যে সালতানাতের স্থায়িত্ব কেবল সামরিক শক্তিতে নয়, বরং প্রজাবর্গের সুস্বাস্থ্যের ওপর নির্ভরশীল। ফলে রাজদরবারে প্রধান হাকিম হিসেবে উচ্চশিক্ষিত চিকিৎসাবিদদের অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হতো।
তিব্ব-ই-ইউনানি চিকিৎসা দর্শন প্রাচীন গ্রিক মনীষী হিপোক্রেটিস ও গ্যালেনের তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে, যাকে পরবর্তীতে মুসলিম মনীষী ইবনে সিনা ও আল-রাজি পূর্ণাঙ্গ রূপ দেন। এই পদ্ধতিতে বিশ্বাস করা হতো যে মানবদেহের সুস্থতা চারটি প্রধান শারীরিক তরল বা আখলাতের ভারসাম্যের ওপর নির্ভরশীল, যার মধ্যে রয়েছে রক্ত, কফ, হলুদ পিত্ত ও কৃষ্ণপিত্ত। যখন কোনো কারণে শরীরে এই চার তরলের স্বাভাবিক ভারসাম্যে বিচ্যুতি ঘটে, তখনই মানুষ বিভিন্ন জটিল ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়। হাকিমগণ নাড়ি পরীক্ষার মাধ্যমে রোগীর শরীরের অভ্যন্তরীণ উষ্ণতা, আর্দ্রতা ও মেজাজের তারতম্য নির্ণয় করতেন।
চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতাব্দীতে মধ্যপ্রাচ্য ও দিল্লী থেকে বহু পণ্ডিত ও অভিজ্ঞ তবিব বাংলায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তাঁদের সাথে আনা চিকিৎসা পাণ্ডুলিপিগুলো তৎকালীন সোনারগাঁও ও পাণ্ডুয়ার মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষার্থীদের পাঠ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হতো। চীনা পর্যটক মাহুয়ান পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বাংলায় এসে রাজধানী পাণ্ডুয়া ও সোনারগাঁওয়ের বাজারে ওষধি দ্রব্যের সমৃদ্ধ বিপণি প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তিনি উল্লেখ করেন যে বাংলার চিকিৎসকরা অত্যন্ত প্রজ্ঞাবান এবং সেখানে ভেষজ উপাদানের সুসংগঠিত ব্যবস্থা ছিল।
সুলতানি আমলের চিকিৎসাবিজ্ঞানের আরেকটি ঐতিহাসিক দিক ছিল এর উদার ও বহুত্ববাদী সমন্বয়ী চরিত্র। মুসলিম সুলতানদের দরবারে শীর্ষস্থানীয় হাকিমদের পাশাপাশি স্থানীয় অভিজ্ঞ চিকিৎসকদেরও রাজবৈদ্য পদে দায়িত্ব দেওয়া হতো। সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহের রাজদরবারে মুকুন্দদাস নামে একজন বিখ্যাত দেশীয় চিকিৎসক ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবে অত্যন্ত সম্মান লাভ করেছিলেন। একই সাথে প্রাচীন চিকিৎসা শাস্ত্র অমৃতকুণ্ড বাংলায় থাকাকালেই কাজী রুকনুদ্দীন সমরকন্দি কর্তৃক অনূদিত হয়ে চিকিৎসা সংস্কৃতির মেলবন্ধন রচনা করেছিল।
অধ্যায় ২: দারুশ শিফা ও বিমারিস্তান: মধ্যযুগীয় চিকিৎসালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ
মধ্যযুগীয় ইসলামী সভ্যতায় হাসপাতাল বা চিকিৎসালয়কে সাধারণত বিমারিস্তান, দারুশ শিফা বা শিফাখানা নামে অভিহিত করা হতো। এসব চিকিৎসালয়ের মূল নীতি ছিল ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকল রোগীর জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও খাদ্য নিশ্চিত করা। স্বাধীন সুলতানি বাংলার রাজধানী পাণ্ডুয়া ও গৌড়ে এই ধরনের চিকিৎসালয় রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা এবং ওয়াকফ সম্পত্তির আয়ে পরিচালিত হতো। চিকিৎসালয়গুলোর সাথে রোগমুক্তির জন্য বিশেষ রন্ধনশালা এবং ভেষজ দাওয়াখানা সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকত।
বাংলায় প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসাসেবার প্রসারে বিখ্যাত সুফি সাধক হযরত শেখ নূর কুতুবুল আলমের অবদান ছিল অবিস্মরণীয়। পঞ্চদশ শতাব্দীর শুরুতে পাণ্ডুয়ার এই মহান সাধক তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিশাল খানকাহ্ ও মাদ্রাসার পাশাপাশি একটি সুসংগঠিত লঙ্গরখানা ও শিফাখানা পরিচালনা করতেন। ঐতিহাসিক সূত্রে বর্ণিত আছে যে তিনি নিজেই দরিদ্র ও কুষ্ঠ রোগীদের সেবা করতেন এবং ক্ষত পরিষ্কার করে ওষুধ দিতেন। পরবর্তীকালে সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহ এই শিফাখানার ব্যয় নির্বাহের জন্য বহু গ্রামের রাজস্ব সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক বাইশ হাজারি ওয়াকফ স্টেট নিবেদিত করেছিলেন।
দারুশ শিফায় চিকিৎসার ক্ষেত্রে চারটি সুনির্দিষ্ট ধাপে রোগীর পরিচর্যা করা হতো, যা আধুনিক প্রটোকলের সমতুল্য ছিল। প্রথম ধাপে খাদ্যাভ্যাস ও পথ্য নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে রোগ নিরাময়ের চেষ্টা চলত, যেখানে বার্লি, সাগু ও ডালিমের রস প্রদান করা হতো। দ্বিতীয় ধাপে জীবনরীতিমূলক থেরাপি যেমন শিঙ্গা লাগানো বা হিজামা, শরীরের বিশেষ স্থানে তেল মালিশ এবং ওষধি বাষ্পীয় গোসল প্রয়োগ করা হতো। এতে নিরাময় না হলে তৃতীয় ধাপে শক্তিশালী ভেষজ ওষুধ এবং অতি জটিল প্রয়োজনে চতুর্থ ধাপে অভিজ্ঞ শল্যবিদ দ্বারা অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করা হতো।
চিকিৎসালয়গুলোতে রোগীদের শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি তাদের মানসিক শান্তির দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া হতো। ভবনগুলো এমনভাবে নির্মাণ করা হতো যেন সেখানে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচল করতে পারে এবং শান্ত পরিবেশ বজায় থাকে। চিকিৎসালয়ের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে সুগন্ধি ফুলের গাছ ও ওষধি বাগান রাখা হতো, যা রোগীদের মানসিক অবসাদ দূর করত। হাকিমগণ সার্বক্ষণিক রোগীদের পর্যবেক্ষণ করতেন এবং সুস্থ হওয়ার পর বিনামূল্যে কয়েকদিনের পথ্য ও ভেষজ ওষুধ সাথে দিতেন।
অধ্যায় ৩: হাকিমদের ভেষজ দাওয়াই ও বাংলার ওষধি উদ্ভিদের রসায়ন
মধ্যযুগীয় বাংলার হাকিমদের সর্বশ্রেষ্ঠ সাফল্য ছিল ইউনানি দর্শনের সাথে বাংলার সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক ভেষজ সম্পদের এক অপূর্ব সমন্বয় সাধন। পারস্য বা আরবের শুষ্ক আবহাওয়ায় যেসব ওষধি উদ্ভিদ জন্মাত, নদীমাতৃক বাংলার অতিবৃষ্টি ও আর্দ্র আবহাওয়ায় সেগুলো স্বাভাবিকভাবেই সহজলভ্য ছিল না। ফলে বাংলার হাকিমগণ এখানকার উর্বর মাটিতে উৎপন্ন লতাগুল্ম নিয়ে নিবিড় গবেষণা ও প্রয়োগ শুরু করেন। তাঁরা সুন্দরবন ও বরেন্দ্র অঞ্চলের অরণ্য থেকে বিভিন্ন শিকড়, বাকল ও পাতার গুণাগুণ পরীক্ষা করে দাওয়াই তৈরি করেন।
ইউনানি চিকিৎসায় ব্যবহৃত ভেষজ উপাদানকে প্রধানত দুটি শ্রেণিতে ভাগ করা হতো, যথা একক ভেষজ বা মুফরাদ এবং যৌগিক ওষুধ বা মুরাক্কাব। একক ভেষজের মধ্যে বাংলার চিরতা, নিমপাতা, তুলসী, কালমেঘ, বাসক, অর্জুন ছাল, আমলকী, হরিতকী ও বহেরা ছিল অত্যন্ত ফলপ্রসূ। বিশেষ করে আমলকী, হরিতকী ও বহেরার সমন্বয়ে তৈরি ঐতিহ্যবাহী ত্রিফলা পেটের পীড়া দূর করতে ও রক্ত পরিশোধনে সর্বজনীন পথ্য হিসেবে ব্যবহৃত হতো। অন্যদিকে কালোজিরা বা হাব্বাতুস সাওদাকে শারীরিক প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির মহৌষধ হিসেবে নিয়মিত ভেষজ ব্যবস্থাপত্রে রাখা হতো।
যৌগিক ওষুধ তৈরির জন্য প্রতিটি চিকিৎসালয়ের নিজস্ব গবেষণাগার ও কারখানা থাকত, যাকে দাওয়াখানা বলা হতো। সেখানে হাকিমদের তত্ত্বাবধানে অভিজ্ঞ সহকারীরা বিশেষ পদ্ধতিতে জাওয়ারিশ, মাজুন, খামিরা, গুলকন্দ ও আরক তৈরি করতেন। জাওয়ারিশ ছিল পেটের হজমশক্তি বৃদ্ধির জন্য তৈরি এক ধরনের ওষধি হালুয়া, যা প্রধানত আদা, দারুচিনি, লবঙ্গ ও পিপুল সহযোগে প্রস্তুত হতো। আরক ছিল বিশেষ পাতন যন্ত্রের মাধ্যমে তৈরি ভেষজ সুগন্ধি নির্যাস, যেমন গোলাপের আরক, যা দুর্বল চিত্ত ও হৃদযন্ত্রের সতেজতা ফিরিয়ে আনত।
জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি রোগের ক্ষেত্রে উদ্ভিজ্জ উপাদানের পাশাপাশি পরিশোধিত ধাতব ভস্ম বা কুশতা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ব্যবহার করা হতো। সোনা, রূপা কিংবা মুক্তার সূক্ষ্ম চূর্ণ নির্দিষ্ট লতাপাতার রসে শত বার ঘষে ও বিশেষ মাটির পাত্রে পুড়িয়ে কুশতা তৈরি করা হতো। এই কুশতা রোগীর শরীরের ক্ষয়রোধ করতে এবং দুর্বল শরীরে প্রাণশক্তি সঞ্চারে কার্যকর ভূমিকা রাখত বলে প্রাচীন বর্ণনায় পাওয়া যায়। একই সাথে সাধারণ সর্দিকাশি ও শ্বাসকষ্টের জন্য তুলসী ও বাসক পাতার রস খাঁটি মধুর সাথে মিশিয়ে এক ধরণের প্রাকৃতিক সিরাপ বা লাউক তৈরি করা হতো।
অধ্যায় ৪: মহামারি প্রতিরোধ, গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা ও ঐতিহ্যের রূপান্তর
মধ্যযুগীয় বাংলায় বর্ষার স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া এবং বন্যার কারণে প্রায় প্রতি বছরই কলেরা ও ম্যালেরিয়া মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকত। এই জনস্বাস্থ্য বিপর্যয় রোধে হাকিমগণ কেবল একক চিকিৎসায় সীমাবদ্ধ না থেকে সামাজিক প্রতিষেধক ব্যবস্থা গ্রহণে নেতৃত্ব দিতেন। তাঁরা কুয়োর পানি ফুটিয়ে পান করার নির্দেশ দিতেন, ঘরে ঘরে নিমপাতা ও লোবানের ধোঁয়া দিতেন এবং জনাকীর্ণ পরিবেশ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিতেন। সুলতানি প্রশাসনও মহামারি এলাকায় দ্রুত ভ্রাম্যমাণ হাকিম দল পাঠাত এবং বিনামূল্যে খাদ্য ও ভেষজ সামগ্রী সরবরাহ করত।
রাজধানী শহরের বড় দারুশ শিফার বাইরে সুদূর পল্লী অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার ভিত্তি ছিল স্থানীয় কবিরাজ এবং শহর থেকে প্রশিক্ষিত হাকিমদের নিবিড় নেটওয়ার্ক। প্রতিটি গ্রামীণ হাট ও বাণিজ্য কেন্দ্রে ওষধি লতাপাতা বিক্রেতা পসারি এবং সুগন্ধি ও ভেষজ তেল প্রস্তুতকারী আত্তারদের দোকান থাকত। সাধারণ মানুষ জ্বর, পেটের অসুখ কিংবা আঘাত পেলে এই সহজলভ্য ভেষজ দাওয়াইয়ের ওপরই সম্পূর্ণ নির্ভর করত। ফলে চিকিৎসাসেবা কোনো ব্যয়বহুল বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত না হয়ে সমাজের সাধারণ মানুষের দোড়গোড়ায় এক সহজপ্রাপ্য সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল।
সুলতানি আমলের অবসান এবং পরবর্তীকালে বাংলায় মুঘল শাসনের সূচনার পরও চিকিৎসাব্যবস্থার এই সমন্বিত ধারা স্বমহিমায় টিকে ছিল। কিন্তু অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্ষমতা দখলের পর ঐতিহ্যবাহী এই স্বাস্থ্যব্যবস্থা চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। ব্রিটিশরা পশ্চিমা চিকিৎসা পদ্ধতিকে প্রাধান্য দিয়ে দেশীয় চিকিৎসালয়গুলোর ওয়াকফ সম্পত্তি ও অর্থনৈতিক সংস্থান সংকুচিত করে ফেলে। তা সত্ত্বেও বাংলার মাটি ও মানুষের বিশ্বাসের গভীরে এই ভেষজ দাওয়াইয়ের কার্যকারিতা এত দৃঢ় ছিল যে তা আজও বিকল্প চিকিৎসায় সগৌরবে বেঁচে রয়েছে।
মধ্যযুগীয় চিকিৎসালয়ে ব্যবহৃত প্রধান ভেষজ দাওয়াইয়ের তুলনামূলক বিবরণ
| ভেষজ দাওয়াইয়ের নাম | প্রধান প্রাকৃতিক উপাদান | প্রস্তুত প্রণালী ও রূপ | নিরাময়যোগ্য রোগ ও শারীরিক উপকারিতা |
|---|---|---|---|
| জাওয়ারিশ (Jawarish) | শুকনো আদা, দারুচিনি, লবঙ্গ ও খাঁটি মধু | চূর্ণ ভেষজ মধুর সাথে জ্বাল দিয়ে ঘন পেস্ট তৈরি | হজমশক্তি বৃদ্ধি, পেটের গ্যাস ও বদহজম দূরীকরণ |
| আরক (Arq) | গোলাপের পাপড়ি, পুদিনা পাতা ও কেওড়া | বিশেষ পাত্রে বাষ্পীভূত করে পাতন প্রক্রিয়ায় সংগৃহীত জল | হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি ও মানসিক ক্লান্তি দূরীকরণ |
| মাজুন (Majun) | বাদাম, পেস্তা, জাফরান ও বিভিন্ন ওষধি বীজ | ওষধি উপাদান পিষে মিষ্টি সিরাপে সংমিশ্রিত হালুয়া | স্নায়বিক দুর্বলতা দূরীকরণ ও শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি |
| লাউক (Laooq) | বাসক পাতা, তুলসীর রস ও খাঁটি মধু | লতাপাতার নির্যাস মধুর সাথে মিশিয়ে তৈরি চাটনি বা সিরাপ | দীর্ঘস্থায়ী সর্দিকাশি, ফুসফুসের কফ ও শ্বাসকষ্ট নিরাময় |
| ত্রিফলা ক্বাথ (Triphala) | আমলকী, হরিতকী ও বহেরার শুকনো ফল | শুকনো ফলের সমাহার পানিতে ফুটিয়ে তৈরি তরল ক্বাথ | পেটের বিষাক্ত পদার্থ অপসারণ ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূরীকরণ |
| খামিরা (Khamira) | মৃগনাভি, জাফরান ও রৌপ্যপত্র সমাহার | দীর্ঘ সময় ঘষে ও ফারমেন্ট করে তৈরি নরম প্রলেপ | মস্তিষ্কের শক্তি বৃদ্ধি ও বিষণ্নতা দূরীকরণে সহায়ক |
তিব্ব-ই-ইউনানি চিকিৎসা পদ্ধতি ও চিকিৎসালয় কাঠামোর ধারাবাহিক প্রবাহচিত্র
আমরা কী শিখলাম?
১. মধ্যযুগীয় বাংলায় ইলিয়াস শাহী ও গণেশ-পরবর্তী সুলতানগণ চিকিৎসাবিজ্ঞানকে সুশাসনের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করেছিলেন।
২. তিব্ব-ই-ইউনানি চিকিৎসা দর্শন মানবদেহের চারটি প্রধান শারীরিক তরল বা আখলাতের ভারসাম্যের ওপর ভিত্তি করে রোগের মূল কারণ নির্ণয় করত।
৩. রাজধানী পাণ্ডুয়া, গৌড় ও সোনারগাঁওয়ে প্রতিষ্ঠিত দারুশ শিফা বা চিকিৎসালয়গুলো ওয়াকফ অর্থায়নে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকল মানুষের জন্য বিনামূল্যে উন্মুক্ত ছিল।
৪. হযরত শেখ নূর কুতুবুল আলমের মতো মহান আধ্যাত্মিক সাধকগণ নিজের হাতে কুষ্ঠ ও অসুস্থ রোগীদের সেবা করে চিকিৎসাসেবার এক অনন্য মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
৫. বাংলার হাকিমগণ মধ্যপ্রাচ্যের ইউনানি পদ্ধতির সাথে সুন্দরবন ও বরেন্দ্র অঞ্চলের স্থানীয় ভেষজ উদ্ভিদের সমন্বয় ঘটিয়ে এক সমৃদ্ধ দেশীয় ফার্মাকোপিয়া গড়ে তোলেন।
৬. মধ্যযুগীয় চিকিৎসালয়গুলোতে পথ্য নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে ভেষজ ওষুধ ও প্রয়োজনে শল্যচিকিৎসা পর্যন্ত অত্যন্ত আধুনিক ও সুশৃঙ্খল ধাপে রোগীর পরিচর্যা করা হতো।
উপসংহার
মধ্যযুগীয় স্বাধীন সুলতানি বাংলার চিকিৎসালয় ও হাকিমদের ভেষজ দাওয়াই আমাদের চিকিৎসা ইতিহাসের এক অত্যন্ত গৌরবময় ও আলোকিত অধ্যায়। তৎকালীন মুসলিম শাসক এবং আলেম সমাজের উদার দৃষ্টিভঙ্গি চিকিৎসাবিদ্যাকে কেবল একটি পেশা হিসেবে নয়, বরং আর্তমানবতার নিঃস্বার্থ সেবা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। দারুশ শিফাগুলোতে ধর্মের ভেদাভেদ ভুলে সকল সম্প্রদায়ের মানুষকে বিনামূল্যে ওষুধ ও খাবার দেওয়ার এই ব্যবস্থা মধ্যযুগের সমাজচেতনার এক অনন্য নিদর্শন। স্থানীয় আয়ুর্বেদিক জ্ঞান এবং তিব্ব-ই-ইউনানির সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা এই চিকিৎসাধারা প্রমাণ করে যে জ্ঞান কখনোই কোনো নির্দিষ্ট ভূগোলে সীমাবদ্ধ থাকে না।
ঔপনিবেশিক শাসনের আঘাতে মধ্যযুগীয় এই ওয়াকফভিত্তিক দাতব্য স্বাস্থ্যব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এর বৈজ্ঞানিক সারবস্তু কখনো হারিয়ে যায়নি। আজকের আধুনিক যুগেও মানুষ যখন রাসায়নিক ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখে পুনরায় প্রাকৃতিক ভেষজ চিকিৎসার দিকে ঝুঁকছে, তখন সুলতানি বাংলার এই ঐতিহ্য নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। আমাদের মাটির গাছগাছালি, শিকড়-বাকল এবং ঐতিহ্যবাহী ওষধি জ্ঞানের আধুনিক বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন বর্তমান স্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় মূল্যবান পথ দেখাতে পারে। পূর্বপুরুষদের উদ্ভাবিত এই সমৃদ্ধ লোকায়ত ও ইউনানি ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং তার সঠিক সংরক্ষণই হতে পারে আমাদের আত্মপরিচয়ের এক অমূল্য প্রেরণা।
নিজেকে যাচাই করুন