১ অক্টোবর, ২০২৬ এ ৩:১১ PM
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিসীমানার অদৃশ্য প্রাচীর: পাসপোর্টের ক্ষমতা, বৈশ্বিক বৈষম্য ও লাল-সবুজের ভূরাজনীতি

সীমানার অদৃশ্য প্রাচীর: পাসপোর্টের ক্ষমতা, বৈশ্বিক বৈষম্য ও লাল-সবুজের ভূরাজনীতি
"প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে পৃথিবী ছিল মানুষের। মানুষ যেখানে খুশি যেতে পারত, যেখানে খুশি থাকতে পারত—কোনো অনুমতিপত্র বা পাসপোর্টের প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু যুদ্ধের পর রাষ্ট্রগুলো মানুষকে এক একটি ক্ষুদ্র খাঁচায় বন্দি করল, তার কপালে সেঁটে দিল জাতীয়তার সিলমোহর। পাসপোর্ট কোনো মুক্তির সনদ নয়; এটি হলো রাষ্ট্র নামক এক অদৃশ্য কারাগারের বন্দিদের চলাচলের সাময়িক প্যারোল।"
— স্টেফান জোভাইগ (দ্য ওয়ার্ল্ড অব ইয়েস্টারডে)
প্রলোগ: একটি ক্ষুদ্র পুস্তিকা ও পৃথিবীর অদৃশ্য কাঁটাতার
হাতে থাকা ১২৫ মিলিমিটার বাই ৮৮ মিলিমিটারের একটি ছোট কাগুজে পুস্তিকা। ওপরের অংশে স্বর্ণালী হরফে খোদাই করা রাষ্ট্রের নাম, মাঝে জাতীয় প্রতীক এবং নিচে একটি ক্ষুদ্র আয়তাকার ইলেকট্রনিক চিপের চিহ্ন। আপাতদৃষ্টিতে এটি নিছকই বিদেশ ভ্রমণের অনুমতিপত্র। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কঠোর বাস্তবতায় এই সামান্য পুস্তিকাটিই নির্ধারণ করে দেয় পৃথিবীর ৮০০ কোটি মানুষের ভাগ্য, স্বাধীনতা এবং মর্যাদার সীমানা।
কারও পকেটে থাকা নীল বা মেরুন রঙের একটি পাসপোর্ট তাকে বিশ্বের ১৯০টিরও বেশি দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কোনো ভিসা ছাড়াই রাজা-বাদশাহর মতো প্রবেশাধিকার দেয়; অভিবাসন কর্মকর্তা তার সামনে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে মাথা নত করে বলেন, "ওয়েলকাম!" আবার একই সময়ে তৃতীয় বিশ্বের কোনো নাগরিকের পকেটে থাকা সবুজ বা সাধারণ পাসপোর্টটি তাকে পরিণত করে সন্দেহের প্রথম পাত্রে। তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখা হয় অভিবাসনের দীর্ঘ লাইনে, তল্লাশি করা হয় জুতো থেকে শুরু করে অন্তর্বাস পর্যন্ত, আর মাসের পর মাস দূতাবাসগুলোর বারান্দায় জমা দিতে হয় ব্যাংক ব্যালেন্স, সম্পত্তির হিসাব ও বংশলতিকার অজস্র দলিল।
পাসপোর্ট কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি হলো আধুনিক যুগের সবচেয়ে নির্মম 'বর্ডার অ্যাপার্থাইড' বা সীমান্ত বর্ণবাদের এক জীবন্ত হাতিয়ার।
১৬ শতকের ফরাসি রাজপ্রাসাদ থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি—পাসপোর্টের এই রক্তক্ষয়ী ও ক্ষমতার ইতিহাস কীভাবে মানুষের মুক্ত বিচরণকে শৃঙ্খলিত করল? কীভাবে এই ক্ষুদ্র পুস্তিকার ভেতর লুকিয়ে রইল রাজকীয় অহংকার, কোটিপতিদের নাগরিকত্ব কেনাবেচার রমরমা বাণিজ্য এবং ১৯ জুলাই ২০২৬-এ বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে পাসপোর্টের পাতায় পাতায় খোদাই হলো রক্তস্নাত 'জুলাই গণঅভ্যুত্থান'?
অধ্যায় ১: পারস্য থেকে প্যারিস: নিরাপত্তার সনদ যখন নজরদারির শিকল
শব্দতত্ত্বের গভীরে তাকালে দেখা যায়, 'পাসপোর্ট' (Passport) শব্দটির জন্মের পেছনে রয়েছে সমুদ্র আর নগরের প্রাচীর অতিক্রমের এক দ্বিমুখী ইতিহাস। একাংশের মতে, ইংরেজি 'Pass' (অতিক্রম করা) এবং 'Port' (সমুদ্রবন্দর) থেকে এর উৎপত্তি। তবে ঐতিহাসিকদের বড় অংশ মনে করেন, শব্দটির প্রকৃত শিকড় প্রোথিত ফরাসি ভাষায়—'Passer' (অতিক্রম করা) এবং 'Porte' (শহরের প্রধান ফটক বা তোরণ)। মধ্যযুগের ফ্রান্সে রাজা একাদশ লুই যখন পঞ্চদশ শতাব্দীতে প্রাচীরঘেরা সুরক্ষিত শহরের প্রধান ফটক অতিক্রম করার জন্য তাঁর প্রজাদের এক বিশেষ ছাড়পত্র দিতেন, তখন তাকে বলা হতো 'পাস পোর্তে' (Passe-Porte)।
তবে ইতিহাসের প্রাচীনতম লিখিত পাসপোর্টের সন্ধান মেলে আরও বহু পূর্বে—খ্রিস্টপূর্ব ৪৪৫ অব্দে। হিব্রু বাইবেলের 'নেহেমিয়া পুস্তকে' উল্লেখ রয়েছে, পারস্যের সম্রাট আর্তাক্সারক্সেস (Artaxerxes I) তাঁর বিশ্বস্ত কর্মকর্তা নেহেমিয়াকে জেরুজালেমের ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাচীর পুনর্নির্মাণের জন্য পাঠান। সম্রাট জানতেন, পথিমধ্যে ফোরাত নদীর ওপারে থাকা বিভিন্ন প্রদেশের গভর্নররা নেহেমিয়াকে বাধা দিতে পারে। তাই তিনি প্রদেশের শাসকদের উদ্দেশে রাজকীয় সিলমোহরযুক্ত চিঠি লিখে দিলেন, যাতে পথিমধ্যে নেহেমিয়াকে নিরাপদে যেতে দেওয়া হয়। প্রাচীন দুনিয়ায় এটিই ছিল পাসপোর্টের প্রথম ঐতিহাসিক প্রামাণ্য দলিল।
প্রাচীন চীনেও মানুষের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করতে প্রায় একই ধরনের ব্যবস্থা চালু ছিল। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে হান সাম্রাজ্যে বাঁশের ফালি বা কাঠের টুকরোতে নাগরিকের বয়স, উচ্চতা, গায়ের রঙ ও শারীরিক চিহ্নের বিশদ বিবরণ খোদাই করে ট্রাভেল পারমিট হিসেবে ব্যবহার করা হতো। ইসলামী খেলাফতের যুগে কর পরিশোধের প্রমাণপত্র হিসেবে দেওয়া হতো 'বারাআ' (Bara'ah), যা দিয়ে বাণিজ্য কাফেলার নিরাপত্তা নিশ্চিত হতো। আর ১৪১৪ সালে ইংল্যান্ডের রাজা পঞ্চম হেনরি তাঁর পার্লামেন্টে প্রথম 'সেফ কন্ডাক্ট' আইন পাস করে বিদেশি ব্যবসায়ীদের জন্য নিরাপদ যাতায়াতের রাষ্ট্রীয় দলিল চালু করেন।
কিন্তু এই সব প্রাচীন দলিলের সাথে আধুনিক পাসপোর্টের একটি মৌলিক পার্থক্য ছিল। তখন পাসপোর্ট ছিল নিরাপত্তার অঙ্গীকার, কোনো নাগরিককে তাঁর দেশত্যাগে বাধ্যবাধকতার শিকল নয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত ইউরোপ বা আমেরিকায় চলাচলের জন্য কোনো মানুষের কোনো পাসপোর্টের প্রয়োজন ছিল না। মানুষ ট্রেনের টিকিট কেটে প্যারিস থেকে সেন্ট পিটার্সবার্গ চলে যেত, সমুদ্রজাহাজে চেপে লন্ডনের শ্রমিক চলে যেত নিউ ইয়র্কে।
সবকিছু পাল্টে দিল ১৯১৪ সালের প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে গুপ্তচরবৃত্তি ঠেকানো এবং শত্রুভাবাপন্ন নাগরিকদের চিহ্নিত করতে যুদ্ধরত দেশগুলো হঠাৎ পাসপোর্ট বাধ্যতামূলক করল। যুদ্ধ শেষ হলো, কিন্তু রাষ্ট্রগুলো তাদের হাতের এই পরম ক্ষমতা আর ছাড়ল না। ১৯২০ সালে লিগ অব নেশনস (League of Nations)-এর উদ্যোগে আয়োজিত প্যারিস সম্মেলনে পাসপোর্টের আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড নির্ধারিত হলো—৩২ পাতার একটি কার্ডবোর্ড পুস্তিকা। এরপর ১৯২৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুক্ত করল ব্যক্তির মুখের ছবি। আর এভাবেই মুক্ত পৃথিবীর মানুষের ওপর স্থায়ীভাবে নেমে এল রাষ্ট্রের আমলাতান্ত্রিক নজরদারির লৌহকপাট।
অধ্যায় ২: তিনজনের পৃথিবী বনাম ৮০০ কোটি প্রজা: পাসপোর্টহীন সম্রাট ও বৈশ্বিক বৈষম্য
আজ পৃথিবীর জনসংখ্যা ৮০০ কোটিরও বেশি। এই ৮০০ কোটি মানুষের মধ্যে কি এমন কেউ আছেন, যাঁর পাসপোর্ট ছাড়া কোনো দেশের বিমানবন্দরে নামার ক্ষমতা আছে?
হ্যাঁ, আছেন। কিন্তু তাঁদের সংখ্যা মাত্র তিনজন!
গোটা পৃথিবীতে মাত্র তিনজন ব্যক্তি কোনো ধরনের পাসপোর্ট ছাড়াই পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে ভ্রমণ করার আন্তর্জাতিক সার্বভৌম অধিকার ভোগ করেন। এঁদের প্রথমজন হলেন যুক্তরাজ্যের মহামান্য রাজা (বর্তমানে রাজা তৃতীয় চার্লস)। এর পেছনের সাংবিধানিক কারণটি অত্যন্ত চমকপ্রদ। যুক্তরাজ্যে যত পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়, তার প্রথম পাতাতেই লেখা থাকে—"His Britannic Majesty's Secretary of State requests and requires in the name of His Majesty all those whom it may concern to allow the bearer to pass freely without let or hindrance..." অর্থাৎ, যুক্তরাজ্যের পাসপোর্ট ইস্যু করা হয় স্বয়ং রাজার নামে। যিনি নিজে পাসপোর্ট ইস্যুকারী কর্তৃপক্ষ, তাঁর নিজের কোনো পাসপোর্টের প্রয়োজন হতে পারে না!
বাকি দুজন ব্যক্তি হলেন দূরপ্রাচ্যের সূর্যোদয়ের দেশ জাপানের সম্রাট (Emperor) এবং সম্রাজ্ঞী (Empress)। জাপানের আইনে রাষ্ট্রপ্রধান ও তাঁর সহধর্মিণীকে এমন এক অতিপ্রাকৃতিক কূটনৈতিক মর্যাদা দেওয়া হয়েছে যে, তাঁরা যখন বিদেশে যান, তাঁদের জন্য কোনো পাসপোর্ট তৈরি হয় না; তাঁদের জন্য কেবল জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিশেষ কূটনৈতিক প্রজ্ঞাপন পাঠানো হয়।
কিন্তু এই তিনজন ছাড়া বাকি ৮০০ কোটি মানুষের জন্য পাসপোর্ট হলো এক অলঙ্ঘ্য দেয়াল। সেই দেয়ালের রূপ নির্ধারণ করে আন্তর্জাতিক পাসপোর্ট ইনডেক্স—যেমন হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্স (Henley & Partners) এবং আর্টন ক্যাপিটাল (Arton Capital)।
সিঙ্গাপুর বা জাপানের একটি পাসপোর্ট পকেটে থাকলে একজন মানুষ পৃথিবীর ১৯২টি দেশে কোনো ভিসা ছাড়া বা অন-অ্যারাইভাল ভিসায় অনায়াসে প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু ঠিক বিপরীত দিকে অবস্থান করা যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান, সিরিয়া বা অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা উন্নয়নশীল দেশগুলোর পাসপোর্ট যেন এক অভিশাপ। সেখানে মানুষের প্রতিভা, যোগ্যতা বা মানবিক মর্যাদার কোনো মূল্য নেই; তার পরিচয় আটকে যায় পাসপোর্টের র্যাঙ্কিংয়ের তলানিতে। এটি কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নয়, এটি আধুনিক আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য—যেখানে জন্মের ভূগোলের ভিত্তিতে মানুষের স্বাধীনতার পরিধি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়।
অধ্যায় ৩: লাল, নীল ও সবুজ: রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ শ্রেণিভেদ ও ক্ষমতার দেওয়াল
পাসপোর্ট কেবল আন্তর্জাতিক বৈষম্যের প্রতীক নয়, এটি রাষ্ট্রের নিজের নাগরিকদের মধ্যেও এক অদৃশ্য সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভাজনরেখা তৈরি করে। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই নাগরিকের সামাজিক মর্যাদা ও সরকারি পদের ওপর ভিত্তি করে পাসপোর্টের রঙের রূপভেদ দেখা যায়। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।
বাংলাদেশে পাসপোর্টের রঙ মূলত তিনটি—সবুজ, নীল এবং লাল।
১. সবুজ পাসপোর্ট (সাধারণ নাগরিক):
দেশের ১৮ কোটি সাধারণ মানুষ—যাদের ঘাম ও শ্রমে রাষ্ট্র বাঁচে, সেই সাধারণ ছাত্র, শিক্ষক, দিনমজুর, ব্যবসায়ী ও বেসরকারি চাকরিজীবীদের দেওয়া হয় এই সবুজ রঙের সাধারণ পাসপোর্ট। এই পাসপোর্টধারী মানুষটির বিদেশযাত্রার প্রতিটি পদক্ষেপে প্রয়োজন হয় ভিসার জটিল অনুমোদন, ব্যাংক ব্যালেন্সের নথিপত্র এবং দীর্ঘ অপেক্ষার ক্লান্তি।
২. নীল পাসপোর্ট (অফিসিয়াল বা সরকারি কর্মকর্তা):
সরকারি কর্মকর্তা, সামরিক বাহিনীর সদস্য কিংবা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা যখন সরকারি কাজে বা রাষ্ট্রীয় প্রেষণে বিদেশে যান, তখন তাঁদের জন্য ইস্যু করা হয় বিশেষ নীল পাসপোর্ট। এই পাসপোর্ট পেতে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে বিশেষ 'গভর্নমেন্ট অর্ডার' বা জিও (GO) প্রয়োজন হয়। নীল পাসপোর্টধারীরা পৃথিবীর প্রায় ২৭টি দেশে কোনো ভিসা ছাড়াই সরাসরি ভ্রমণ করার বিশেষ সুবিধা পান।
৩. লাল পাসপোর্ট (কূটনৈতিক ও ক্ষমতার চরম বলয়):
রাষ্ট্রের ক্ষমতার শীর্ষবিন্দুতে অবস্থানরত ব্যক্তিদের জন্য সংরক্ষিত থাকে লাল রঙের কূটনৈতিক (Diplomatic) পাসপোর্ট। ২০১৩ সালের ১৩ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বহিরাগমন-১ শাখা থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রাষ্ট্রপ্রধান, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্যবর্গ, সংসদ সদস্য এবং তাঁদের স্বামী বা স্ত্রীসহ নির্দিষ্ট ২৮টি শ্রেণির ব্যক্তি এই পাসপোর্ট পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হন।
লাল পাসপোর্ট কেবল একটি ভ্রমণ নথি নয়; এটি হলো ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী আইনি দায়মুক্তি (Diplomatic Immunity)-র প্রতীক। লাল পাসপোর্টধারীদের জন্য কোনো দেশে যেতে ভিসার প্রয়োজন হয় না বললেই চলে; অধিকাংশ দেশ তাঁদের জন্য অন-অ্যারাইভাল ভিসা কিংবা সম্পূর্ণ ভিসা-মুক্ত সুবিধা প্রদান করে। বিমানবন্দরগুলোতে তাঁদের জন্য থাকে বিশেষ ভিআইপি লাউঞ্জ, তাঁদের কোনো ব্যাগেজ স্ক্যানিং বা তল্লাশির মুখোমুখি হতে হয় না। একই ভূখণ্ডের নাগরিক হয়েও ক্ষমতার দূরত্ব কীভাবে লাল আর সবুজের ব্যবধানে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, পাসপোর্ট তার সবচেয়ে নিখুঁত দলিল।
অধ্যায় ৪: ডলারের নাগরিকত্ব বনাম ভূমধ্যসাগরের সমাধি: বাণিজ্যের পণ্য যখন পরিচয়
পুঁজিবাদী বিশ্বে যখন সবকিছুই পণ্য, তখন মানুষের জাতীয় পরিচয় ও পাসপোর্ট কেন পণ্য হবে না? বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে ইউরোপ ও ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে শুরু হয় 'গোল্ডেন পাসপোর্ট' (Golden Passport) বা 'সিটিজেনশিপ বাই ইনভেস্টমেন্ট' (CBI) নামের এক অদ্ভুত ও বিতর্কিত বাণিজ্য।
মাল্টা, সাইপ্রাস, ভানুয়াতু কিংবা সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিসের মতো ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক ধনকুবেরদের জন্য খুলে দেয় নাগরিকত্বের হাট। নিয়ম অত্যন্ত সোজা—কয়েক লাখ ইউরো বা মার্কিন ডলার ব্যাংকে জমা দাও অথবা স্থানীয় আবাসন খাতে রিয়েল এস্টেট কেনা দেখাও, কোনো দিন সেই দেশে পা না রেখেই ঘরে বসে কুরিয়ার সার্ভিসে পেয়ে যাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীল বা ক্যারিবীয় পাসপোর্ট!
এই গোল্ডেন পাসপোর্টের সুযোগ নিয়ে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কর ফাঁকিবাজ, দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ, মাফিয়া ডন এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার শিকার রাশিয়ান অলিগার্করা নিজেদের কালো টাকা সাদা করেছে এবং রাতারাতি পশ্চিমের 'সম্মানিত নাগরিক' বনে গেছে। তাদের জন্য কোনো সীমান্ত পাহারা নেই, কোনো ইমিগ্রেশনের জিজ্ঞাসাবাদ নেই; ডলারের ঝনঝনানি তাদের পাসপোর্টের পথ সুগম করে দিয়েছে।
অথচ ঠিক একই সময়ে, একই ইউরোপের সীমান্তে কী ঘটছে?
লিবিয়া বা তিউনিসিয়ার উপকূলে জীর্ণ কাঠের নৌকায় চেপে শত শত ক্ষুধার্ত আফ্রিকান ও এশীয় তরুণ উত্তাল ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করছে। তাদের পকেটে কোনো দামি গোল্ডেন পাসপোর্ট নেই, আছে কেবল তাদের জন্মভূমির নড়বড়ে সবুজ বা কালো পাসপোর্ট। ইউরোপের কোস্টগার্ড তাদের নৌকা লক্ষ্য করে জলকামান ছোড়ে, পুশব্যাক করে সমুদ্রে ডুবিয়ে মারে। প্রতি বছর হাজার হাজার অচেনা লাশ ভেসে ওঠে ভূমধ্যসাগরের তীরে—যাদের একমাত্র অপরাধ ছিল, তারা ভুল দেশের পাসপোর্ট নিয়ে জন্মেছিল।
পাসপোর্টের এই বৈশ্বিক অর্থনীতি প্রমাণ করে—বিশ্বায়ন সবার জন্য সমান নয়। মূলধনের জন্য পৃথিবীর সীমানা উন্মুক্ত, কিন্তু মেহনতি মানুষের শরীরের জন্য সীমানায় পোঁতা রয়েছে কাঁটাতার আর মাইনফিল্ড।
অধ্যায় ৫: ১৯ জুলাই ২০২৬ ও নতুন পাতার ইতিহাস: বাংলাদেশের ই-পাসপোর্টে জুলাই অভ্যুত্থান
বাংলাদেশের পাসপোর্টের ইতিহাস এই ভূখণ্ডের রাজনৈতিক উত্থান-পতনের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। ১৯২০ সালের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক 'ইন্ডিয়ান পাসপোর্ট অ্যাক্ট', এরপর ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পাকিস্তানের পাসপোর্ট, আর ১৯৭১ সালে রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জনের পর ১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম হস্তলিখিত ম্যানুয়াল পাসপোর্টের সূচনা।
সময়ের বিবর্তনে প্রযুক্তির রূপান্তর ঘটেছে। আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (ICAO)-র নিয়ম অনুযায়ী হাতে লেখা পাসপোর্ট বাতিল করে ২০১০ সালের ১ এপ্রিল বাংলাদেশ প্রবর্তন করে মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (MRP)। এরপর ২০২০ সালের ২২ জানুয়ারি বিশ্বের ১১৯তম দেশ এবং সার্কের ৫ম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ প্রবেশ করে সর্বাধুনিক বায়োমেট্রিক ই-পাসপোর্টের যুগে।
কিন্তু ২০২৬ সালে এসে বাংলাদেশের পাসপোর্টের ইতিহাসে যুক্ত হলো এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক ও জাতীয় রূপান্তর।
২০২৬ সালের ১৯ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেশের সর্বাধুনিক ই-পাসপোর্টের বুকলেটে বিদ্যমান ছবি ও ঐতিহাসিক স্মারকগুলোর বিন্যাসে ব্যাপক সংস্কার ও পুনর্বিন্যাস আনে। এই নতুন বিন্যাসে কেবল দেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিই প্রতিফলিত হয়নি, বরং অন্তর্ভুক্ত হয়েছে সদ্য ঘটে যাওয়া ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ও গণজাগরণের স্মৃতি।
ই-পাসপোর্টের নতুন পুনর্বিন্যাসের মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ:
- প্রচ্ছদ ও ডেটা পেজ: ফ্রন্ট ইনসাইড কভারে স্থান পেয়েছে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ এবং ব্যাক ইনসাইড কভারে জাতীয় সংসদ ভবন। কিন্তু সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক বার্তাটি লেখা রয়েছে ৩ নম্বর ক্রমিকে ডেটা পেজের নিচের অংশে—"This Passport is Valid for All Countries of the World Except Israel" (এই পাসপোর্টটি ইসরায়েল ব্যতীত পৃথিবীর সমস্ত দেশের জন্য প্রযোজ্য)। বহুল আলোচিত এই বাক্যটি পুনরায় স্পষ্টভাবে পুনর্বহাল করে বাংলাদেশ তার ফিলিস্তিনপন্থী আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অবস্থানকে দৃঢ়ভাবে পুনর্ব্যক্ত করেছে।
- পৃষ্ঠা ৩০-৩১: 'জুলাই গণঅভ্যুত্থান ২০২৪':
পাসপোর্ট বুকলেটের সবচেয়ে চমকপ্রদ ও ঐতিহাসিক অন্তর্ভুক্তি হলো ৩০ ও ৩১ নম্বর পৃষ্ঠায় স্থান পাওয়া "জুলাই গণঅভ্যুত্থান ২০২৪"-এর চিত্র। কোনো দেশের পাসপোর্টের ভিসা পাতায় সাধারণত প্রাচীন ভাস্কর্য, ঐতিহাসিক স্থাপত্য বা প্রাকৃতিক দৃশ্য রাখা হয়। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার রক্তস্নাত বিপ্লব—যা স্বৈরাচারী শাসনকে উৎখাত করে নতুন বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছিল—তাকে রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক পরিচয়পত্রে চিরস্থায়ী রূপ দেওয়া এক সাহসী ও ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। এখন থেকে পৃথিবীর যেকোনো দেশের অভিবাসন কর্মকর্তা যখন কোনো বাংলাদেশির পাসপোর্টে সিল মারবেন, তখন ৩০-৩১ নম্বর পৃষ্ঠায় তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠবে জুলাইয়ের রাজপথে বুক পেতে দেওয়া শহীদদের আত্মত্যাগ।
- অন্যান্য জাতীয় ঐতিহ্যের মেলবন্ধন:
বুকলেটের অন্যান্য পাতায় সুষমভাবে সাজানো হয়েছে দেশের প্রকৃতি ও সংস্কৃতি—২-৩ পৃষ্ঠায় জাতীয় ফুল শাপলা, ৪-৫ পৃষ্ঠায় রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, ৮-৯ পৃষ্ঠায় শহীদ মিনার, ১৮-১৯ পৃষ্ঠায় শিখা অনির্বাণ, ২২-২৩ পৃষ্ঠায় কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত, ২৬-২৭ পৃষ্ঠায় ইলিশ মাছ, ৪৬-৪৭ পৃষ্ঠায় ষাটগম্বুজ মসজিদ এবং ৫৬-৫৭ পৃষ্ঠায় শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের কালজয়ী চিত্রকর্ম 'সংগ্রাম'।
ই-পাসপোর্টের এই নতুন রূপ কেবল একটি পরিচয়পত্র নয়; এটি বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক পরিচয় ও সার্বভৌম অঙ্গীকারের জীবন্ত স্মারক।
আমরা কী শিখলাম? (কৌশলগত ও রাজনৈতিক শিক্ষা)
১. পাসপোর্ট নাগরিকের অধিকার নয়, রাষ্ট্রের শর্তাধীন ছাড়পত্র:
সংবিধানে চলাচলের স্বাধীনতার কথা বলা থাকলেও আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় পাসপোর্ট হলো রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রদত্ত একটি সুবিধামাত্র। রাষ্ট্র চাইলে যেকোনো মুহূর্তে রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় কোনো নাগরিকের পাসপোর্ট বাতিল বা জব্দ করে তাকে কার্যত নিজ দেশে গৃহবন্দি করতে পারে।
২. 'সীমান্ত বর্ণবাদ' (Border Apartheid) আধুনিক সভ্যতার সবচেয়ে বড় ভণ্ডামি:
যে পশ্চিমা বিশ্ব মানবাধিকার ও মুক্তবাজার অর্থনীতির কথা বলে, তারাই আবার উন্নয়নশীল দেশের নাগরিকদের জন্য সীমান্তের দেওয়াল সবচেয়ে উঁচু করে রাখে। পাসপোর্ট ইনডেক্স আসলে বিশ্বের অর্থনৈতিক ও বর্ণবাদী বৈষম্যের একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ।
৩. জাতীয় পরিচয়পত্রের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য সার্বভৌমত্বের প্রতীক:
আধুনিক ই-পাসপোর্টের মাইক্রোচিপ, ক্রিপ্টোগ্রাফিক অ্যালগরিদম ও জলছাপ কেবল সাধারণ প্রযুক্তি নয়; এটি জাতীয় পরিচয় জালিয়াতি রোধ এবং দেশের সার্বভৌম সীমান্ত সুরক্ষার প্রধান প্রতিরক্ষা বলয়।
৪. কূটনৈতিক ক্ষমতার দৃশ্যমান বৈপরীত্য:
লাল ও সবুজ পাসপোর্টের মধ্যকার সুযোগ-সুবিধার আকাশ-পাতাল ব্যবধান প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র কীভাবে তার সাধারণ করদাতা নাগরিকদের চেয়ে শাসক শ্রেণিকে আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা ও দায়মুক্তি দিয়ে রেখেছে।
৫. ইতিহাসের জীবন্ত স্মারক হিসেবে রাষ্ট্রীয় নথিপত্র:
পাসপোর্টের মতো আন্তর্জাতিক নথিতে 'জুলাই গণঅভ্যুত্থান ২০২৪'-এর অন্তর্ভুক্তি প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র তার ইতিহাসের বড় বড় বাঁকগুলোকে কেবল পাঠ্যপুস্তকে নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও তুলে ধরতে সক্ষম।
উপসংহার: কাগুজে খাঁচার বন্দি মানুষ
মানুষ জন্ম নেয় মুক্ত বিহঙ্গের মতো। মেঘের কোনো পাসপোর্ট লাগে না, সাইবেরিয়া থেকে উড়ে আসা পরিযায়ী পাখির জন্য কোনো দেশের আকাশসীমা নিষিদ্ধ নয়, নদী যখন সীমানা পেরিয়ে আরেক দেশে বয়ে যায় তখন তাকে কোনো বর্ডার গার্ডের গুলির মুখে পড়তে হয় না। কেবল সৃষ্টির সেরা জীব মানুষই আজ নিজের তৈরি মানচিত্র আর পাসপোর্টের ক্ষুদ্র কাগজের কাছে বন্দি।
হাতের সবুজ ই-পাসপোর্টটি হয়তো একজন বাংলাদেশিকে পৃথিবীর কোনো এক অজানা দেশে পৌঁছানোর সুযোগ দেবে, হয়তো তাকে স্বপ্ন দেখার রসদ জোগাবে। কিন্তু একই সাথে এটি তাকে মনে করিয়ে দেবে—এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে মানুষ এখনও স্বাধীন নয়; সে কেবল এক ভৌগোলিক খাঁচা থেকে আরেক ভৌগোলিক খাঁচায় প্রবেশ করার জন্য রাষ্ট্রের অনুমতির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা এক করুণ যাত্রী।
নিজেকে যাচাই করুন