৮ নভেম্বর, ২০২৬ এ ৬:০০ AM
কানআন থেকে গাজাপর্ব ১৮: ম্যাকাবীয় বিদ্রোহ এবং হাসমোনীয় রাজবংশের সংক্ষিপ্ত শাসন

পর্ব ১৮: ম্যাকাবীয় বিদ্রোহ এবং হাসমোনীয় রাজবংশের সংক্ষিপ্ত শাসন
"বিজয় নির্ভর করে সৈন্যদলের বিশাল সংখ্যার ওপর নয়, বরং আসমান থেকে আসা শক্তির ওপর; তারা আমাদের ও আমাদের পরিবারকে ধ্বংস করতে ঔদ্ধত্য ও অনাচারে অন্ধ হয়ে ছুটে এসেছে, কিন্তু আমরা লড়ছি আমাদের পবিত্র বিধান ও আত্মার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য।"
— ১ ম্যাকাবিজ ৩:১৯-২১ (বেথ হোরোনের যুদ্ধের পূর্বে জুডাস ম্যাকাবিয়াসের ঐতিহাসিক ভাষণ)
খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকের সূচনালগ্নে পশ্চিম এশিয়ার ভূরাজনীতি এক অভাবনীয় অর্থনৈতিক ও সামরিক সংকটের মুখে পতিত হয়। খ্রিষ্টপূর্ব ১৮৮ অব্দে অ্যাপামিয়ার চুক্তির মাধ্যমে রোমান প্রজাতন্ত্রের কাছে পরাজিত হয়ে সেলুসিড সাম্রাজ্য এক বিশাল অংকের যুদ্ধক্ষতিপূরণ পরিশোধ করতে বাধ্য হয়েছিল। প্রতি বছর রোমকে নির্ধারিত রৌপ্যমুদ্রা প্রদানের এই চাপ মেটাতে সেলুসিড রাজকোষ যখন প্রায় শূন্য হয়ে পড়েছিল, তখন সম্রাটদের দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় তাদের সাম্রাজ্যের অধীনস্থ প্রাচ্যের প্রাচীন ও সম্পদশালী মন্দিরগুলোর ওপর। খ্রিষ্টপূর্ব ১৭৫ অব্দে ক্ষমতা দখলকারী সেলুসিড সম্রাট চতুর্থ অ্যান্টিওকাস এপিফানেস এই আর্থিক সংকটের মুখে কেবল রাজস্ব আদায়ের কৌশল বদলাননি, বরং তিনি তাঁর সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে এক আগ্রাসী ও উগ্র হেলেনাইজেশন বা সাংস্কৃতিক একমুখীকরণ নীতি গ্রহণ করেন। প্রাচীন প্রাচ্যের বহুবিচিত্র ধর্মীয় ও জাতিগত ঐতিহ্যকে গ্রিক বহুদেবতাবাদী সংস্কৃতির কাঠামোর মধ্যে জোরপূর্বক একীভূত করার এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা ফিলিস্তিনের মাটিতে এক অভূতপূর্ব বিস্ফোরণের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল।
এই সংকটের তীব্রতা বহুগুণ বৃদ্ধি পায় খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকের যিহূদিয়ার অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের সুবিধাবাদ ও তীব্র আত্মঘাতী দ্বন্দ্বের কারণে। জেরুজালেমের বায়তুল মুকাদ্দাস বা দ্বিতীয় মন্দিরের ঐতিহ্যবাহী জাদোকাইট বংশীয় মহাযাজক তৃতীয় অনিয়াসের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে তাঁরই সহোদর ভাই জেসন বিপুল পরিমাণ উৎকোচ দিয়ে রাজকীয় অনুমোদন লাভ করেন। জেসন সেলুসিড সম্রাটের মনোরঞ্জনের উদ্দেশ্যে জেরুজালেমকে একটি গ্রিক পলিসে রূপান্তরিত করেন, যার নতুন নামকরণ করা হয় অ্যান্টিওক ইন জেরুজালেম। পবিত্র মন্দিরের ঠিক পাদদেশেই প্রতিষ্ঠা করা হয় গ্রিক জিমনেসিয়াম, যেখানে তরুণ যাজকেরা শারীরিক কসরত ও গ্রিক ফ্যাশনের মোহে পড়ে মন্দিরের ধর্মীয় দায়িত্ব অবহেলা করতে শুরু করেন। এর কিছুদিন পর মেনেলাস নামের আরেক চরমপন্থী সুবিধাবাদী আরও বেশি অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে জেসনকে ক্ষমতাচ্যুত করেন এবং রাজকীয় দেনা পরিশোধের জন্য মন্দিরের পবিত্র স্বর্ণপাত্র লুট করেন। জেরুজালেমের এই অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা, দুর্নীতি এবং আধ্যাত্মিক স্খলন এমন এক অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছিল যা খুব দ্রুতই এক সশস্ত্র গণবিদ্রোহের রূপ নিতে বাধ্য হয়।
অধ্যায় ১: সেলুসিড দমননীতি, মোদিনের স্ফুলিঙ্গ ও গেরিলা প্রতিরোধের সূচনা
খ্রিষ্টপূর্ব ১৬৮ অব্দে এক অভাবনীয় আন্তর্জাতিক অপমান সম্রাট চতুর্থ অ্যান্টিওকাসের ক্রোধকে উন্মত্ততায় রূপ দেয়। মিশরে টলেমীয়দের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় সামরিক অভিযান চলাকালে রোমান দূত গাইয়াস পপিলিয়াস লিনাস আলেক্সান্দ্রিয়ার উপকূলে অ্যান্টিওকাসের চারপাশে বালির ওপর একটি বৃত্ত এঁকে দেন এবং বৃত্ত থেকে বের হওয়ার আগেই মিশর ত্যাগের শর্তে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের চরমপত্র দেন। রোমের ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তির সামনে মাথা নত করে অপমানিত অ্যান্টিওকাস যখন সৈন্য নিয়ে পিছু হটছিলেন, তখন তিনি সংবাদ পান যে জেরুজালেমে তাঁর পুতুল মহাযাজক মেনেলাসের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী বিদ্রোহ শুরু হয়েছে। ক্ষিপ্ত সম্রাট কালবিলম্ব না করে জেরুজালেমে প্রবেশ করেন এবং নির্মম হত্যাকাণ্ড চালান। হাজার হাজার সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হয়, বহু নারীকে দাস হিসেবে বন্দি করা হয় এবং মন্দিরের অবশিষ্ট সম্পদ লুণ্ঠন করা হয়। মন্দিরের দক্ষিণ প্রাচীরের বিপরীতে নির্মাণ করা হয় আকরা নামের একটি সুবিশাল সুরক্ষিত দুর্গ, যেখানে গ্রিকপন্থী সেনা ও বিশ্বাসঘাতক হেলেনাইজারদের স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি গড়ে তোলা হয়।
খ্রিষ্টপূর্ব ১৬৭ অব্দের বসন্তে অ্যান্টিওকাস এপিফানেস প্রাচীন ইতিহাসের অন্যতম কুখ্যাত ধর্মীয় নিপীড়নমূলক রাজকীয় ফরমান জারি করেন। এই আদেশে ইহুদিদের তাওরাতের অনুশাসন পালনকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। শিশুদের ঐতিহ্যবাহী খতনা নিষিদ্ধ করা হয় এবং যেসব মা গোপনে খতনা করিয়েছিলেন তাদের সন্তানদের গলা টিপে হত্যা করে মায়েদের শহরের প্রাচীর থেকে ঝুলিয়ে ফাঁসি দেওয়া হয়। সাবাথ বা শনিবারের বিশ্রাম দিবস পালন, হালাল খাদ্যবিধি মেনে চলা এবং তাওরাতের পাণ্ডুলিপি রাখা মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধে পরিণত হয়। পাওয়া মাত্রই ধর্মগ্রন্থ পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হতো এবং জনগণকে জোরপূর্বক শূকরের মাংস খেতে বাধ্য করা হতো। খ্রিষ্টপূর্ব ১৬৭ অব্দের ডিসেম্বর মাসে (হিব্রু কিশলেভ মাসের ২৫ তারিখ) বায়তুল মুকাদ্দাসের পবিত্র হোমবেদির ওপর গ্রিক দেবতা অলিম্পিয়ান জিউসের একটি মূর্তি স্থাপন করা হয় এবং সেখানে শূকর বলি দিয়ে মন্দিরকে চরমভাবে অপবিত্র করা হয়, যা ইতিহাসে অপবিত্রতার চরম পরাকাষ্ঠা বা অ্যাবোমিনেশন অব ডেসোলেশন নামে পরিচিত।
এই উন্মত্ত ধর্মীয় নিপীড়ন কেবল জেরুজালেমে সীমাবদ্ধ ছিল না, সেলুসিড রাজকর্মচারীরা প্রতিটি গ্রামে গিয়ে স্থানীয় অধিবাসীদের গ্রিক দেবতাদের উদ্দেশ্যে মূর্তিপূজা করতে বাধ্য করতে শুরু করে। এমনি এক পরিস্থিতিতে খ্রিষ্টপূর্ব ১৬৭ অব্দে জেরুজালেমের উত্তর পশ্চিমে অবস্থিত মোদিন নামের একটি পাহাড়ি গ্রামে ঘটে যায় ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেওয়া সেই স্ফুলিঙ্গ। গ্রামের স্থানীয় প্রবীণ যাজক মাত্তাহিয়াস, যিনি হাসমোনীয় পরিবারের সন্তান ছিলেন, তাঁর পাঁচ পুত্রকে নিয়ে সেখানে বাস করছিলেন। সেলুসিড রাজকর্মচারী আপেলিস যখন মোদিনের বাজারে এক অস্থায়ী বেদি তৈরি করে মাত্তাহিয়াসকে রাজকীয় পুরস্কারের লোভ দেখিয়ে প্রথম বলিদান করার আদেশ দেয়, তখন বৃদ্ধ মাত্তাহিয়াস বজ্রকণ্ঠে তা প্রত্যাখ্যান করেন।
ঠিক সেই মুহূর্তে যখন এক সুবিধাবাদী ইহুদি ভয়ে রাজকীয় বেদিটির দিকে এগিয়ে এসে মূর্তিপূজার উদ্দেশ্যে বলি দিতে উদ্যত হয়, তখন ধর্মীয় ক্ষোভে উদ্বেলিত মাত্তাহিয়াস নিজের তলোয়ার বের করে সেই ধর্মত্যাগী ব্যক্তিকে বেদির ওপরই হত্যা করেন। একই সাথে তিনি সেলুসিড কর্মকর্তা আপেলিসকেও আঘাত করে হত্যা করেন এবং অবৈধ বেদিটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেন। এরপর মাত্তাহিয়াস চিৎকার করে আহ্বান জানান যে যারা পূর্বপুরুষদের চুক্তি ও পবিত্র আইনের প্রতি অনুগত, তারা যেন তাঁর সাথে পর্বতে চলে আসে। মাত্তাহিয়াস ও তাঁর পাঁচ পুত্র অর্থাৎ জন, শিমোন, জুডাস, ইলিয়াজার এবং জোনাথনকে নিয়ে তাদের সমস্ত সহায়সম্পত্তি ফেলে রেখে যিহূদিয়ার দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে পালিয়ে যান। সেখানে তাদের সাথে এসে মিলিত হয় হাসিদিম বা ধর্মনিষ্ঠ দলের কয়েক হাজার নিবেদিতপ্রাণ সাধক ও প্রতিরোধকামী সাধারণ কৃষক। শুরু হয় পাহাড়ি ঘাঁটি থেকে পরিচালিত আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম প্রথম সুসংগঠিত গেরিলা যুদ্ধ। খ্রিষ্টপূর্ব ১৬৬ অব্দে মৃত্যুর পূর্বে বৃদ্ধ মাত্তাহিয়াস তাঁর তৃতীয় পুত্র জুডাসকে এই গেরিলা বাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে মনোনীত করে যান।
অধ্যায় ২: জুডাস ম্যাকাবিয়াসের সমরকৌশল ও বায়তুল মুকাদ্দাস পুনরুদ্ধার: হানুকার জন্ম
জুডাসের অসাধারণ রণকৌশল, ক্ষিপ্রতা ও শত্রুর ওপর হাতুড়ির মতো প্রচণ্ড আঘাত হানার ক্ষমতার কারণে তাঁকে ম্যাকাবিয়াস উপাধিতে ভূষিত করা হয়, আরামীয় ও হিব্রু ভাষায় যার অর্থ হাতুড়ি। জুডাস উপলব্ধি করেছিলেন যে একটি প্রশিক্ষিত নিয়মিত রাজকীয় মেসিডোনীয় ফ্যালানক্সের বিরুদ্ধে উন্মুক্ত প্রান্তরে সমুখযুদ্ধে জয়লাভ করা অসম্ভব। তাই তিনি বেছে নেন পাহাড়ি গিরিপথ, রাতের আঁধারে অতর্কিত আক্রমণ এবং অপ্রচলিত গেরিলা কৌশল। খ্রিষ্টপূর্ব ১৬৬ অব্দে লেবোনামের গিরিপথে পরিচালিত প্রথম অভিযানেই জুডাস সামেরিয়ার সেলুসিড সেনাপতি অ্যাপোলোনিয়াসকে পরাস্ত ও হত্যা করেন। এরপর অ্যাপোলোনিয়াসের ব্যক্তিগত বিখ্যাত তলোয়ারটি জুডাস নিজের অস্ত্র হিসেবে গ্রহণ করেন এবং জীবনের শেষ যুদ্ধ পর্যন্ত সেই তলোয়ার দিয়েই নেতৃত্ব দেন। একই বছর বেথ হোরোনের সংকীর্ণ গিরিপথে সিরিয়ার সেলুসিড সেনাপতি সেরনের নেতৃত্বাধীন একটি বিশাল সেনাদলকে জুডাস এক আকস্মিক পাহাড়ি হামলায় চূর্ণবিচূর্ণ করে দেন।
খ্রিষ্টপূর্ব ১৬৫ অব্দে সংঘটিত এমাউসের যুদ্ধ ছিল জুডাস ম্যাকাবিয়াসের সামরিক প্রতিভার উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত। সেলুসিড সাম্রাজ্যের দুই অভিজ্ঞ সেনাপতি নাইকানর ও গর্গিয়াস বিশ হাজারেরও বেশি সুসজ্জিত সৈন্য নিয়ে জুডাসকে অবরুদ্ধ করতে পাহাড়ের পাদদেশে শিবির স্থাপন করে। মধ্যরাতে গর্গিয়াস যখন তাঁর বাছাই করা বাহিনী নিয়ে জুডাসের পাহাড়ি ঘাঁটি ধ্বংস করতে যান, তখন জুডাস তাঁর শিবির সম্পূর্ণ খালি রেখে এক গোপন পাহাড়ি পথ দিয়ে নিচে নেমে আসেন। ভোরবেলা তিনি অপ্রস্তুত সেলুসিড প্রধান শিবিরে অতর্কিত আক্রমণ চালান এবং হাজার হাজার শত্রু সৈন্যকে ছত্রভঙ্গ করে তাদের বিপুল অস্ত্র ও রসদ দখল করেন। এরপর খ্রিষ্টপূর্ব ১৬৪ অব্দে বেথ জুরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জুডাস সেলুসিড সাম্রাজ্যের অভিভাবক ও রিজেন্ট লাইসিয়াসের নেতৃত্বাধীন বিশাল রাজকীয় বাহিনীকে পিছু হটতে বাধ্য করেন।
এই ধারাবাহিক বিজয়ের ফলে জেরুজালেমে প্রবেশের পথ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত হয়। খ্রিষ্টপূর্ব ১৬৪ অব্দের ডিসেম্বর মাসে জুডাস তাঁর বিজয়ী বাহিনীকে নিয়ে জেরুজালেমে প্রবেশ করেন। আকরা দুর্গে অবরুদ্ধ গ্রিক সেনাদের নজরবন্দি রেখে ম্যাকাবীয় যোদ্ধারা বায়তুল মুকাদ্দাসের চত্বরে প্রবেশ করেন। সেখানে অপবিত্র বেদি ও পোড়া ধ্বংসাবশেষ দেখে যোদ্ধারা কান্নায় ভেঙে পড়েন। জুডাস অবিলম্বে মন্দির চত্বর পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন। অপবিত্র জিউসের বেদি ভেঙে তার পাথরগুলো আলাদা করে রাখা হয়, সম্পূর্ণ নতুন অবিচ্ছিন্ন পাথর দিয়ে নতুন হোমবেদি নির্মাণ করা হয় এবং মন্দিরের স্বর্ণের বাতিদান বা মেনোরাহ পুনর্স্থাপন করা হয়। হিব্রু কিশলেভ মাসের ২৫ তারিখে, ঠিক যেদিন তিন বছর আগে মন্দিরটি অপবিত্র করা হয়েছিল, সেদিন নতুন বেদিতে আনুষ্ঠানিকভাবে পবিত্র প্রদীপ প্রজ্বলন ও বলিদান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়। টানা আট দিনব্যাপী এই ঐতিহাসিক আত্মোৎসর্গ ও বিজয়ের স্মরণে প্রতিষ্ঠিত হয় হানুকা বা আলোর উৎসব, যা আজ পর্যন্ত ইহুদি ঐতিহ্যে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে পালিত হয়ে আসছে।
| ঐতিহাসিক সংঘাত ও যুদ্ধ | কালপর্ব | নেতৃত্বদানকারী পক্ষসমূহ | কৌশলগত রণকৌশল | দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিণতি |
|---|---|---|---|---|
| মোদিনের বিদ্রোহের স্ফুলিঙ্গ | খ্রিষ্টপূর্ব ১৬৭ অব্দ | মাত্তাহিয়াস বনাম সেলুসিড কর্মকর্তা আপেলিস | আকস্মিক প্রতিরোধ ও মূর্তিপূজার বেদি ধ্বংস | যিহূদিয়ার পার্বত্য অঞ্চলে সংগঠিত গেরিলা যুদ্ধের সূচনা |
| বেথ হোরোনের যুদ্ধ | খ্রিষ্টপূর্ব ১৬৬ অব্দ | জুডাস ম্যাকাবিয়াস বনাম সেনাপতি সেরন | সংকীর্ণ পাহাড়ি গিরিপথে অতর্কিত আক্রমণ | সেলুসিড ফ্যালানক্সের প্রথম বড় পরাজয় ও মনোবল বৃদ্ধি |
| এমাউসের ঐতিহাসিক যুদ্ধ | খ্রিষ্টপূর্ব ১৬৫ অব্দ | জুডাস বনাম নাইকানর ও গর্গিয়াস | মধ্যরাতে খালি শিবির রেখে শত্রুঘাঁটিতে পাল্টা আঘাত | বিশাল রাজকীয় রসদ দখল ও সেলুসিড কর্তৃত্বের ভিত্তি কাঁপানো |
| বেথ জুরের যুদ্ধ ও সন্ধি | খ্রিষ্টপূর্ব ১৬৪ অব্দ | জুডাস ম্যাকাবিয়াস বনাম রিজেন্ট লাইসিয়াস | পার্বত্য ফাঁদ ও প্রবল সম্মুখ গেরিলা সংঘাত | সেলুসিড পিছু হটা এবং জেরুজালেমে প্রবেশের পথ উন্মুক্ত |
| বায়তুল মুকাদ্দাস পুনর্নিবেদন | খ্রিষ্টপূর্ব ১৬৪ অব্দ | ম্যাকাবীয় বাহিনী (মন্দির পরিষ্কারকরণ) | অপবিত্র বেদি অপসারণ ও মেনোরাহ প্রজ্বলন | ধর্মীয় স্বাধীনতার পুনর্জন্ম ও বার্ষিক হানুকা উৎসবের প্রতিষ্ঠা |
| এলাসার চূড়ান্ত যুদ্ধ | খ্রিষ্টপূর্ব ১৬০ অব্দ | জুডাস ম্যাকাবিয়াস বনাম সেনাপতি বাক্কাইডেস | মাত্র আটশত যোদ্ধা নিয়ে অসম রক্তক্ষয়ী লড়াই | জুডাসের বীরোচিত শাহাদাত ও জোনাথনের হাতে নেতৃত্বের ভার |
মন্দির পুনরুদ্ধারের পর সংঘাত থেমে থাকেনি। সুদূর পারস্যে খ্রিষ্টপূর্ব ১৬৪ অব্দে সম্রাট চতুর্থ অ্যান্টিওকাস এপিফানেসের আকস্মিক মৃত্যু ঘটলে সেলুসিড সাম্রাজ্যে উত্তরাধিকার নিয়ে গভীর বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। খ্রিষ্টপূর্ব ১৬২ অব্দে বেথ জাকারিয়ার যুদ্ধে মেসিডোনীয় যুদ্ধ হাতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে জুডাসের ভাই ইলিয়াজার এক বিশাল রাজকীয় হাতির নিচে চাপা পড়ে আত্মাহুতি দেন। এরপর খ্রিষ্টপূর্ব ১৬১ অব্দে আদাসার যুদ্ধে জুডাস সেলুসিড জেনারেল নাইকানরকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত ও হত্যা করেন। সামরিক নিরাপত্তার খাতিরে জুডাস এই বছরই রোমান সিনেটের সাথে এক আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক মৈত্রী চুক্তি সম্পাদন করেন, যা ছিল ফিলিস্তিনে রোমের প্রথম আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক পদার্পণ। কিন্তু খ্রিষ্টপূর্ব ১৬০ অব্দে এলাসার অসম যুদ্ধে সেলুসিড সেনাপতি বাক্কাইডেসের বিশ হাজার সেনার বিরুদ্ধে মাত্র আটশত সঙ্গী নিয়ে লড়াই করতে গিয়ে জুডাস ম্যাকাবিয়াস বীরের মতো রণক্ষেত্রেই প্রাণ বিসর্জন দেন।
অধ্যায় ৩: কূটনীতি থেকে রাজতন্ত্র: জোনাথন, শিমোন ও হাসমোনীয় স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা
জুডাস ম্যাকাবিয়াসের মৃত্যুর পর প্রতিরোধের পতাকা তুলে নেন তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতা জোনাথন আপফুস। জোনাথন ছিলেন একজন অসাধারণ সামরিক কৌশলী ও ধূর্ত কূটনীতিক। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে কেবল অস্ত্রের শক্তিতে একটি বিশাল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী বিজয় অসম্ভব। এই সময় সেলুসিড সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে সিংহাসনের দাবিদারদের মধ্যে মারাত্মক গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। প্রথম ডিমেট্রিয়াস এবং সিংহাসন দাবিদার আলেকজান্ডার বালাস উভয়ই তাদের পক্ষে ইহুদি সমর্থন লাভের জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠেন। জোনাথন এই রাজকীয় কোন্দলকে দক্ষতার সাথে কাজে লাগান। খ্রিষ্টপূর্ব ১৫২ অব্দে আলেকজান্ডার বালাস জোনাথনকে সেলুসিড সাম্রাজ্যের আনুষ্ঠানিক মিত্র হিসেবে স্বীকৃতি দেন এবং তাকে বায়তুল মুকাদ্দাসের মহাযাজক হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেন। এভাবে জোনাথনের হাত ধরে শুরু হয় হাসমোনীয় বংশের যাজকীয় কর্তৃত্বের নতুন যুগ, যা প্রাচীন জাদোকাইট বংশের কয়েক শতাব্দীর একচেটিয়া অধিকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে দেয়।
খ্রিষ্টপূর্ব ১৪২ অব্দে এক কূটনৈতিক ফাঁদে ফেলে সেলুসিড সেনাপতি ট্রাইফো জোনাথনকে বন্দি ও হত্যা করলে মাত্তাহিয়াসের সর্বশেষ জীবিত পুত্র শিমোন থাসি আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। শিমোন হাসমোনীয় সংগ্রামের সবচেয়ে চূড়ান্ত রাজনৈতিক লক্ষ্যটি অর্জন করতে সক্ষম হন। খ্রিষ্টপূর্ব ১৪২ অব্দে তিনি তৎকালীন সেলুসিড রাজা দ্বিতীয় ডিমেট্রিয়াসের সাথে সফল আলোচনা সম্পন্ন করে যিহূদিয়ার জন্য সম্পূর্ণ রাজকীয় কর অব্যাহতি এবং স্বায়ত্তশাসন আদায় করেন। একই সাথে শিমোন জেরুজালেমের বুকে দুই দশক ধরে চেপে থাকা কুখ্যাত আকরা দুর্গের গ্রিক সেনাবাহিনীকে অনাহারে অবরুদ্ধ করে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করেন এবং দুর্গটি সমূলে নির্মূল করেন। এর মধ্য দিয়ে প্রায় চার শতাব্দী পর ফিলিস্তিনের মাটিতে পুনরায় একটি পূর্ণ স্বাধীন ও করমুক্ত রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ঘটে। খ্রিষ্টপূর্ব ১৪০ অব্দে জেরুজালেমে অনুষ্ঠিত এক মহা সমাবেশে সমস্ত পুরোহিত ও সাধারণ নাগরিকেরা শিমোনকে রাজকীয় নেতা বা প্রিন্স (নাসি) এবং বংশানুক্রমিক মহাযাজক হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে।
খ্রিষ্টপূর্ব ১৩৪ অব্দে শিমোন তাঁরই এক ক্ষমতালোভী জামাতা কর্তৃক নিহত হলে তাঁর পুত্র প্রথম জন হিয়ারকানাস সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং খ্রিষ্টপূর্ব ১০৪ অব্দ পর্যন্ত দীর্ঘ তিন দশক রাজত্ব করেন। জন হিয়ারকানাসের আমল ছিল হাসমোনীয় সাম্রাজ্যের ভৌগোলিক সম্প্রসারণের স্বর্ণযুগ। তিনি সেলুসিডদের ক্রমবর্ধমান দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে দক্ষিণ ফিলিস্তিনের ইদুমেয়া বা প্রাচীন এদোম অঞ্চল দখল করেন এবং সেখানকার সমস্ত অধিবাসীকে জোরপূর্বক ইহুদি ধর্মে ধর্মান্তরিত করেন। এই ধর্মান্তরিত ইদুমেয়ানদের মধ্য থেকেই পরবর্তীতে রোমান সাম্রাজ্যের যুগে কুখ্যাত হেরোদ দ্য গ্রেটের পরিবারের উত্থান ঘটেছিল। এছাড়া হিয়ারকানাস উত্তরাঞ্চলীয় সামেরিয়া আক্রমণ করে ঐতিহাসিক শেখেম শহর দখল করেন এবং মাউন্ট গেরিজিমের চূড়ায় অবস্থিত সামেরীয়দের সুপ্রাচীন প্রতিদ্বন্দ্বী মন্দিরটি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেন, যা দুই সম্প্রদায়ের মধ্যকার ঐতিহাসিক ফাটলকে চিরতরে পুনরুজ্জীবিত করেছিল।
খ্রিষ্টপূর্ব ১০৪ অব্দে জন হিয়ারকানাসের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র প্রথম অ্যারিস্টোবুলাস মাত্র এক বছরের জন্য শাসন করলেও তিনি একটি চরম বিতর্কিত ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। অ্যারিস্টোবুলাস নিজেকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজা বা ব্যাসিলিয়াস হিসেবে ঘোষণা করেন। এটি ছিল ইহুদি ধর্মীয় অনুশাসনের এক মৌলিক লঙ্ঘন, কারণ ঐতিহ্যবাহী বিশ্বাস অনুযায়ী রাজার পদ কেবল দাউদ বা ডেভিডীয় বংশের জন্য নির্ধারিত ছিল এবং হাসমোনীয়রা ছিল মূলত লেবীয় যাজক বংশ। অ্যারিস্টোবুলাস উত্তর ফিলিস্তিনের গালিল অঞ্চল অধিকার করে সেখানকার স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেও জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করেন। কিন্তু ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানোর সাথে সাথেই হাসমোনীয় পরিবার তাদের প্রতিষ্ঠাতাদের আদি ধর্মীয় আদর্শ ও পবিত্রতা হারিয়ে ফেলে এক দুর্নীতিগ্রস্ত, অত্যাচারী ও স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রে পরিণত হতে শুরু করে।
অধ্যায় ৪: অভ্যন্তরীণ বিভাজন, ধর্মীয় রূপান্তর ও রোমান হস্তক্ষেপে হাসমোনীয় পতন
হাসমোনীয় রাজবংশের অবক্ষয় ও নিষ্ঠুরতার চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটে প্রথম আলেকজান্ডার জান্নিয়াসের দীর্ঘ শাসনামলে (খ্রিষ্টপূর্ব ১০৩ থেকে ৭৬ অব্দ)। জান্নিয়াস ছিলেন এক নির্মম যোদ্ধা রাজা যিনি প্রায় পুরো ফিলিস্তিন, উপকূলীয় হেলেনীয় নগরী এবং জর্ডানের পূর্বাঞ্চলীয় ভূখণ্ড জয় করে তাঁর রাজ্যের সীমানা প্রায় প্রাচীন সোলায়মানি রাজ্যের সমতুল্য করেন। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত উচ্ছৃঙ্খলতা, গ্রিক বিলাসিতা এবং যাজকীয় পবিত্রতা অবমাননা সাধারণ ধর্মপ্রাণ জনগণের মনে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার করে। একবার সুক্কোত উৎসব চলাকালে বায়তুল মুকাদ্দাসের বেদিতে পানি ঢালার আনুষ্ঠানিকতায় ঐতিহ্যবাহী নিয়ম লঙ্ঘন করায় ক্ষুব্ধ জনতা তাঁর দিকে সিট্রন লেবু নিক্ষেপ করে প্রতিবাদ জানায়। উন্মত্ত জান্নিয়াস তাঁর ভাড়াটে সৈন্যবাহিনীকে জনতার ওপর লেলিয়ে দেন এবং মাত্র একদিনে মন্দিরের চত্বরেই ছয় হাজার নিরস্ত্র পুণ্যার্থীকে হত্যা করেন।
এই নৃশংসতার ফলে শুরু হয় দীর্ঘ ছয় বছরব্যাপী রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ। এই গৃহযুদ্ধে ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষ সেলুসিড রাজাদের পর্যন্ত সাহায্য প্রার্থনা করতে বাধ্য হয়। শেষ পর্যন্ত জান্নিয়াস এই বিদ্রোহ নির্মমভাবে দমন করেন। জেরুজালেমে ফিরে তিনি ইতিহাসের অন্যতম বর্বরোচিত প্রতিশোধ গ্রহণ করেন। তিনি আটশত নেতৃস্থানীয় বন্দি ফরীশীকে প্রকাশ্যে ক্রুশবিদ্ধ করেন এবং তারা যখন ক্রুশে ঝুলছিল, তখন তাদের চোখের সামনে তাদের স্ত্রী ও সন্তানদের গলা কেটে হত্যা করা হয়, আর জান্নিয়াস তাঁর উপপত্নীদের নিয়ে বসে সেই বীভৎস দৃশ্য উপভোগ করে মদ্যপান করছিলেন। এই চরম অমানবিকতা প্রমাণ করে যে যে হাসমোনীয় রাজবংশ গ্রিক সাম্রাজ্যিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে পবিত্র প্রতিরোধ হিসেবে শুরু হয়েছিল, মাত্র কয়েক প্রজন্মের ব্যবধানে তারাই তাদের পূর্বের গ্রিক নিপীড়কদের চেয়েও বহুগুণ বেশি রক্তপিপাসু ও স্বৈরাচারী শাসকে রূপান্তরিত হয়েছিল।
হাসমোনীয় শাসনকালে এই চরম রাজনৈতিক ও নৈতিক সংকটের গর্ভ থেকেই ইহুদি সমাজের তিনটি প্রধান ঐতিহাসিক ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মতাদর্শের বিকাশ ঘটে। প্রথমটি ছিল ফরীশী বা ফারিসি দল, যারা ছিলেন সাধারণ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর পণ্ডিত ও তাওরাতের মৌখিক ব্যাখ্যার অনুসারী; তারা হাসমোনীয় রাজাদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দ্বৈত ক্ষমতার কঠোর বিরোধিতা করতেন। দ্বিতীয় দলটি ছিল সাদূকী বা স্যাডুসি সম্প্রদায়, যারা ছিলেন উচ্চবিত্ত যাজক, অভিজাত ও ভূস্বামী; তারা মন্দির পরিচালনা নিয়ন্ত্রণ করতেন এবং হাসমোনীয় রাজদরবারের সাথে আপস করে চলতেন। আর তৃতীয় দলটি ছিল এসেনীয় বা এসিন সম্প্রদায়, যারা জেরুজালেমের মন্দিরকে সম্পূর্ণ অপবিত্র ও হাসমোনীয় মহাযাজকদের অবৈধ মনে করে শহর ছেড়ে জুদাহের মরুভূমির দিকে চলে গিয়েছিলেন। এই এসেনীয়রাই মৃত সাগরের উপকূলে অবস্থিত কুমরান গুহায় নির্জন আধ্যাত্মিক সমাজ গড়ে তোলেন এবং তাদের সংরক্ষিত পাণ্ডুলিপিই পরবর্তীতে বিশ শতকে বিখ্যাত মৃত সাগর পাণ্ডুলিপি বা ডেড সি স্ক্রলস নামে আবিষ্কৃত হয়।
জান্নিয়াসের মৃত্যুর পর তাঁর বিজ্ঞ স্ত্রী রানি সালোম আলেকজান্দ্রা (খ্রিষ্টপূর্ব ৭৬ থেকে ৬৭ অব্দ) সিংহাসনে বসে ফরীশীদের সাথে সমঝোতা করে রাজ্যে এক ক্ষণস্থায়ী শান্তির পরিবেশ ফিরিয়ে আনেন। কিন্তু খ্রিষ্টপূর্ব ৬৭ অব্দে রানির মৃত্যুর পরপরই তাঁর দুই পুত্রের মধ্যে সিংহাসন নিয়ে এক চূড়ান্ত আত্মঘাতী যুদ্ধ শুরু হয়। জ্যেষ্ঠ পুত্র দ্বিতীয় হিয়ারকানাস ছিলেন দুর্বল ও শান্ত স্বভাবের, অন্যদিকে কনিষ্ঠ পুত্র দ্বিতীয় অ্যারিস্টোবুলাস ছিলেন উচ্চাভিলাষী যোদ্ধা। এই দুই ভাইয়ের সিংহাসন দখলের ভ্রাতৃঘাতী লড়াই ফিলিস্তিন ভূখণ্ডকে সরাসরি বিদেশি পরাশক্তির চারণভূমিতে পরিণত করে। হিয়ারকানাসের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন ইদুমেয়ান বংশের ধূর্ত কূটনীতিবিদ অ্যান্টিপেটার, যিনি ক্ষমতা কুক্ষিগত করার লক্ষ্যে তৎকালীন রোমান সেনাপতি পম্পেই দ্য গ্রেটের শরণাপন্ন হন। খ্রিষ্টপূর্ব ৬৩ অব্দে দুই ভাই যখন মধ্যস্থতার আশায় দামেস্কে জেনারেল পম্পেইয়ের দরবারে উপস্থিত হন, তখন রোম উপলব্ধি করে যে ফিলিস্তিন দখলের সুবর্ণ সুযোগ উপস্থিত হয়েছে। রোমান লিজিয়ন নিয়ে পম্পেই জেরুজালেম অবরোধ করেন এবং তিন মাসের রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পর বায়তুল মুকাদ্দাস অধিকার করেন। এভাবেই হাসমোনীয়দের স্বাধীন রাজবংশের চিরতরে অবসান ঘটে এবং ফিলিস্তিনের বুকে সূচনা হয় রোমান সাম্রাজ্যের দীর্ঘ ও কঠোর ঔপনিবেশিক শাসনের।
আমরা কী শিখলাম?
১. ধর্মীয় আত্মপরিচয় ও প্রতিরোধের শক্তি: সেলুসিড সম্রাট চতুর্থ অ্যান্টিওকাসের আগ্রাসী সাংস্কৃতিক দমননীতি প্রমাণ করেছিল যে সামরিক শক্তিতে বলীয়ান পরাশক্তিও যখন কোনো জাতির মৌলিক ধর্মীয় বিশ্বাস ও আত্মপরিচয় মুছে ফেলতে চায়, তখন তা অপ্রতিরোধ্য গণবিদ্রোহের জন্ম দেয়।
২. অভ্যন্তরীণ আপস ও স্খলনের পরিণতি: জেসন ও মেনেলাসের মতো সুবিধাবাদী নেতৃত্বের ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও মন্দিরের পবিত্রতা অবমাননাই বহিরাগত আগ্রাসনকে ডেকে এনেছিল, যা স্পষ্ট করে যে সমাজ ভেতর থেকে দুর্বল না হলে বাইরের শক্তি আধিপত্য বিস্তার করতে পারে না।
৩. উদ্দেশ্যের বিচ্যুতি ও ক্ষমতার অবক্ষয়: ম্যাকাবীয় আন্দোলন একটি নিঃস্বার্থ ও পবিত্র ধর্মীয় প্রতিরোধ হিসেবে শুরু হলেও কয়েক প্রজন্মের মধ্যে হাসমোনীয় শাসকেরা সেই আদর্শ হারিয়ে একটি স্বৈরাচারী, দুর্নীতিগ্রস্ত ও অহংকারী রাজতন্ত্রে পরিণত হয়েছিল।
৪. মতাদর্শিক মেরুকরণ ও সামাজিক বিভাজন: হাসমোনীয় যুগে ইহুদি সমাজে ফরীশী, সাদূকী ও এসেনীয়দের উত্থান দেখায় কীভাবে সংকটময় রাজনৈতিক বাস্তবতায় ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও সামাজিক অবস্থান ভিন্ন ভিন্ন আদর্শিক গোষ্ঠীর জন্ম দেয়।
৫. ভ্রাতৃঘাতী দ্বন্দ্ব ও সাম্রাজ্যিক পদানতকরণ: হাসমোনীয় রাজকুমারদের আত্মঘাতী সিংহাসনের লড়াই এবং বিদেশি পরাশক্তির সাহায্য চাওয়ার প্রবণতাই খ্রিষ্টপূর্ব ৬৩ অব্দে রোমান জেনারেল পম্পেইয়ের হাতে জেরুজালেমের স্বাধীনতা তুলে দিয়েছিল।
উপসংহার
ম্যাকাবীয় বিদ্রোহ থেকে হাসমোনীয় রাজবংশের পতন পর্যন্ত এক শতাব্দীর ইতিহাস ফিলিস্তিনের রাজনীতিতে একটি অত্যন্ত নাটকীয় ও শিক্ষণীয় কালপর্ব। খ্রিষ্টপূর্ব ১৬৭ অব্দে মোদিনের পাহাড়ে মাত্তাহিয়াস ও জুডাস ম্যাকাবিয়াসের যে স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠেছিল, তা সেলুসিড সাম্রাজ্যের মতো প্রবল পরাশক্তিকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল এবং বায়তুল মুকাদ্দাস পুনর্নিবেদনের মাধ্যমে ইহুদিদের জন্য নিয়ে এসেছিল এক পরম কাঙ্ক্ষিত ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মুক্তি। বায়তুল মুকাদ্দাসের মেনোরাহ প্রজ্বলনের সেই স্মৃতি আজও হানুকা উৎসবের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে বেঁচে আছে।
কিন্তু দুঃখজনক ঐতিহাসিক সত্য হলো, যে রক্তের বিনিময়ে হাসমোনীয় স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, ক্ষমতার মোহ ও আদর্শিক বিচ্যুতি সেই রক্তকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করে। কয়েক প্রজন্মের মধ্যেই সেই বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ পরিণত হয় একটি ধর্মনিরপেক্ষ, স্বৈরাচারী ও অন্তঃকলহে লিপ্ত রাজপরিবারে। খ্রিষ্টপূর্ব ৬৭ অব্দে দুই ভাইয়ের সিংহাসনের কাড়াকাড়ি ডেকে আনে রোমান ঈগলের শিকারি থাবাকে। পরবর্তী পর্বে উন্মোচিত হবে সেই যুগান্তকারী অধ্যায়, যেখানে রোমান সেনাপতি পম্পেই দ্য গ্রেট জেরুজালেমে প্রবেশ করে বায়তুল মুকাদ্দাসের মহাপবিত্র কক্ষে পদার্পণ করবেন এবং ফিলিস্তিন ভূখণ্ড চিরতরে অন্তর্ভুক্ত হবে রোমান সাম্রাজ্যের শাসনবলয়ে।
নিজেকে যাচাই করুন
এই লেখার কুইজ
খ্রিষ্টপূর্ব ১৭৫ অব্দে সেলুসিড সিংহাসনে আরোহণ করে কোন শাসক সমগ্র সাম্রাজ্যে জোরপূর্বক হেলেনীয় গ্রিক সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়া এবং তাওরাতের অনুশাসন নিষিদ্ধ করার ফরমান জারি করেছিলেন?
খ্রিষ্টপূর্ব ১৬৭ অব্দে মোদিন গ্রামের কোন স্থানীয় প্রবীণ যাজক সেলুসিড রাজকর্মচারীকে হত্যা ও পৌত্তলিক বেদি ধ্বংসের মাধ্যমে ঐতিহাসিক ম্যাকাবীয় প্রতিরোধের সূচনা করেছিলেন?
খ্রিষ্টপূর্ব ১৬৫ অব্দে এমাউসের ঐতিহাসিক যুদ্ধে জুডাস ম্যাকাবিয়াস সেলুসিড জেনারেল নাইকানর ও গর্গিয়াসের বিশাল বাহিনীকে পরাস্ত করতে কোন যুদ্ধকৌশল সফলভাবে প্রয়োগ করেছিলেন?
খ্রিষ্টপূর্ব ১৬৪ অব্দের কিশলেভ মাসের ২৫ তারিখে বায়তুল মুকাদ্দাস পুনরুদ্ধার, পবিত্র বেদি পুনর্নির্মাণ ও মেনোরাহ প্রদীপ প্রজ্বলনের স্মরণে ইহুদি ঐতিহ্যে কোন বার্ষিক উৎসব পালিত হয়?
খ্রিষ্টপূর্ব ১৫২ অব্দে সেলুসিড গৃহযুদ্ধের সুযোগ কাজে লাগিয়ে আলেকজান্ডার বালাসের সাথে কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে ম্যাকাবীয় ভাইদের মধ্যে কে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে বায়তুল মুকাদ্দাসের মহাযাজক পদ লাভ করেন?
খ্রিষ্টপূর্ব ১৪২ অব্দে সেলুসিডদের কাছ থেকে পূর্ণ কর অব্যাহতি লাভ এবং জেরুজালেমের আকরা দুর্গ ধ্বংস করে কোন হাসমোনীয় নেতা যিহূদিয়ার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছিলেন?
খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকের শেষভাগে হাসমোনীয় শাসক প্রথম জন হিয়ারকানাস দক্ষিণ ফিলিস্তিনের কোন অঞ্চলটি দখল করে সেখানকার সমগ্র অধিবাসীকে জোরপূর্বক ইহুদি ধর্মে ধর্মান্তরিত করেছিলেন?
খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতকে হাসমোনীয় রাজবংশের অভ্যন্তরীণ অবক্ষয় ও দুর্নীতির মুখে জেরুজালেমের মন্দিরকে অবৈধ ঘোষণা করে কোন সন্ন্যাসী দলটি মরুভূমিতে গিয়ে কুমরানে মৃত সাগর পাণ্ডুলিপি রচনা করেছিল?
এই বিষয়ের কুইজ চ্যালেঞ্জ
কানআন থেকে গাজা কুইজে যান