৭ নভেম্বর, ২০২৬ এ ৬:০০ AM
কানআন থেকে গাজাপর্ব ১৭: আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের আগমন এবং হেলেনীয় সংস্কৃতির বিস্তার

পর্ব ১৭: আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের আগমন এবং হেলেনীয় সংস্কৃতির বিস্তার
"আমি এই মানুষটিকে নয়, বরং সেই পরম সত্তাকেই সম্মান জানিয়েছি যাঁর পবিত্র মহাযাজক হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠিত; কারণ মেসিডোনিয়ায় থাকার সময় গভীর ধ্যানে আমি এই ধরনের পোশাক পরিহিত এক আত্মিক পথপ্রদর্শককে প্রত্যক্ষ করেছিলাম, যিনি আমাকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে পারস্যের পরাক্রম ভেঙে এশিয়ার প্রবেশদ্বার উন্মুক্ত হবে।"
— ফ্ল্যাভিয়াস জোসেফাস, 'অ্যান্টিকুইটিজ অব দ্য জিউস' (জেরুজালেমের মহাযাজক ইয়াদুয়ার সাথে আলেকজান্ডারের ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে)
খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩৩ অব্দের শরৎকালে সিলিসিয়ার পার্বত্য রণাঙ্গন ইসুসের প্রান্তরে প্রাচীন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সামরিক ভারসাম্যে এক অপরিবর্তনীয় ফাটল সৃষ্টি হয়। মেসিডোনিয়ার তেইশ বছর বয়সী তরুণ সম্রাট আলেকজান্ডারের ক্ষিপ্র রণকৌশল ও মেসিডোনীয় ফ্যালানক্সের অপ্রতিরোধ্য আঘাতে পারস্যের আকিমেনিড সম্রাট তৃতীয় দারায়ুস রণক্ষেত্র ত্যাগ করতে বাধ্য হন। এই বিজয় কেবল একটি সাম্রাজ্যের পরাজয় ছিল না, বরং তা সমগ্র পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলকে মেসিডোনীয় বাহিনীর সরাসরি পদানত করার পথ উন্মুক্ত করে। ইসুসের পর দারায়ুসকে মেসোপটেমিয়ার অভ্যন্তরে ধাওয়া করার প্রলোভন থাকলেও আলেকজান্ডার এক গভীর সামরিক দূরদর্শিতার পরিচয় দেন। তিনি জানতেন, এজিয়ান ও ভূমধ্যসাগরে পারস্যের শক্তিশালী নৌবহর তখনও অক্ষত ছিল এবং তাদের রসদ আসত মূলত ফিনিশীয় ও ফিলিস্তিন উপকূলের বন্দরগুলো থেকে। তাই পারস্যের নৌবহরকে সমুদ্র থেকে বিচ্ছিন্ন করে স্থলপথেই নিষ্ক্রিয় করার লক্ষ্যে আলেকজান্ডার তাৎক্ষণিকভাবে মেসোপটেমিয়া না গিয়ে দক্ষিণমুখী ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল ধরে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
পারস্য সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক কাঠামোয় এ অঞ্চলের নাম ছিল নদী ওপারে প্রদেশ বা এবার নারি, যার অংশ হিসেবে জুদাহ বা ইয়াহুদ দুই শতাব্দী ধরে এক ধরনের স্থিতিশীল পারস্যীয় শান্তিকাল উপভোগ করছিল। স্থানীয় মহাযাজকদের ধর্মীয় স্বায়ত্তশাসন ও রাজস্ব ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত এই ক্ষুদ্র পাহাড়ি ভূখণ্ডটি আকস্মিকভাবেই গ্রিক সামরিক ঝড়ের মুখে পড়ে। খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩২ অব্দে আলেকজান্ডারের ফিলিস্তিনে প্রবেশ কেবল রাজবংশের পরিবর্তন ছিল না, এটি ছিল এমন এক নতুন সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক যুগের সূচনা যাকে ইতিহাসবিদেরা হেলেনীয় বা হেলেনিস্টিক যুগ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এই যুগের অভিঘাতে ফিলিস্তিনের প্রাচীন সেমেটিক সমাজ, ধর্মীয় রীতিনীতি, অর্থনৈতিক বাণিজ্যপথ এবং নগরবিন্যাস আমূল পরিবর্তিত হয়ে যায়, যা পরবর্তী তিন শতাব্দীর ভূরাজনীতিকে নতুন মাত্রায় রূপ দান করেছিল।
অধ্যায় ১: ইসুসের যুদ্ধ ও ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল অভিযান: টায়ার ও গাজার পতন
আলেকজান্ডারের দক্ষিণমুখী অভিযানের পেছনে কাজ করছিল নিখুঁত ভূকৌশলগত পরিকল্পনা। পারস্যের সাম্রাজ্যিক নৌবাহিনীর মূল ভিত্তি ছিল ফিনিশীয় নাবিক ও তাদের সমৃদ্ধ উপকূলীয় বন্দরগুলো। বাইব্লোস, সিডন এবং আরওয়াদ বিনা প্রতিরোধে মেসিডোনীয় আধিপত্য মেনে নিলেও বিখ্যাত দ্বীপশহর টায়ার আলেকজান্ডারের শর্ত মানতে অস্বীকৃতি জানায়। টায়ারের নাগরিকেরা আলেকজান্ডারকে তাদের মূল দ্বীপশহরে প্রবেশ করে প্রাচীন দেবতা মেলকার্টের মন্দিরে বলিদান করতে বাধা দেয়, কারণ এটি ছিল তাদের সার্বভৌমত্ব বিসর্জনের সমতুল্য। এর পরিণতিতে খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩২ অব্দের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত স্থায়ী হয় সামরিক ইতিহাসের অন্যতম নিষ্ঠুর ও প্রযুক্তিগতভাবে জটিল অবরোধ। প্রধান ভূখণ্ড থেকে প্রায় এক কিলোমিটার সাগরের গভীরে অবস্থিত এই অপ্রভেদ্য দ্বীপদুর্গকে পদানত করতে আলেকজান্ডার এক সুবিশাল কৃত্রিম স্থলসেতু নির্মাণ করেন। ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাচীন টায়ারের পাথর ও লেবাননের পর্বত থেকে সংগৃহীত সিডার কাঠ দিয়ে সাগরের তলদেশ ভরাট করে এই পথ তৈরি করা হয়। দীর্ঘ সাত মাসের রক্তক্ষয়ী লড়াই ও অবরোধ যন্ত্রের অবিরাম আঘাতের পর টায়ারের পতন ঘটে। ক্ষুব্ধ আলেকজান্ডার নগরের আট হাজার সৈন্যকে হত্যা করেন এবং প্রায় ত্রিশ হাজার অধিবাসীকে ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করে দেন।
টায়ারের এই ভয়াবহ পরিণতি সমগ্র লেভান্ট উপকূল জুড়ে গভীর আতঙ্কের সৃষ্টি করে। উপকূলবর্তী বেশিরভাগ নগরপ্রশাসন বিনা বাক্যব্যয়ে আনুগত্য প্রকাশ করলেও ফিলিস্তিনের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত প্রাচীন ফিলিস্তিয়া অঞ্চলের প্রধান দুর্গনগরী গাজা এক ভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করে। ভূকৌশলগতভাবে গাজার গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। এটি ছিল সিনাই মরুভূমির প্রবেশদ্বার এবং মিশরে প্রবেশের একমাত্র সুরক্ষিত সামরিক করিডোর। একই সাথে প্রাচীন আরব উপদ্বীপ থেকে আগত সুগন্ধি ও ধূপের প্রধান বাণিজ্যিক পথ এই গাজা বন্দরের মাধ্যমেই ভূমধ্যসাগরীয় বাজারে রপ্তানি হতো। ফলে গাজার দখল না নিয়ে মিশরের দিকে অগ্রসর হওয়া আলেকজান্ডারের জন্য ছিল এক মারাত্মক নিরাপত্তা ঝুঁকি।
গাজা দুর্গের প্রতিরক্ষার দায়িত্বে ছিলেন বাতিস নামের একজন অত্যন্ত বিশ্বস্ত খোজা সেনাপতি, যিনি পারস্য সম্রাটের প্রতি আজীবন আনুগত্যের শপথ নিয়েছিলেন। বাতিস জানতেন যে আলেকজান্ডারের অবরোধ কতটা ধ্বংসাত্মক হতে পারে, তবুও তিনি নতি স্বীকার করতে রাজি হননি। তিনি বহু মাসের রসদ মজুদ করেছিলেন এবং বিপুল সংখ্যক আরব ও বেদুইন ভাড়াটে সৈন্য নিয়োগ করে শহরের প্রাচীরকে দুর্ভেদ্য করে তোলেন। খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩২ অব্দের সেপ্টেম্বর মাসে আলেকজান্ডার গাজা অবরোধ করেন। একটি উঁচু প্রাকৃতিক পাহাড়ের চূড়ায় নির্মিত এই শহরের প্রাচীর গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য মেসিডোনীয় প্রকৌশলীরা টায়ার থেকে আনা অবরোধ যন্ত্রগুলো ব্যবহার করেন। শহরের চারপাশে বিশাল মাটির ঢিবি নির্মাণ করে প্রাচীরের সমতলে ভারী ক্যাটাপল্ট স্থাপন করা হয়।
গাজার প্রতিরোধ ছিল অত্যন্ত কঠোর ও মরিয়া। একবার মেসিডোনীয় শিবিরে আক্রমণ চালিয়ে গাজার প্রতিরোধ যোদ্ধারা আলেকজান্ডারকে কাঁধে মারাত্মকভাবে আহত করতেও সক্ষম হয়। কিন্তু মেসিডোনীয় প্রকৌশল ও বিপুল সৈন্যসংখ্যার সামনে দুই মাসেরও বেশি সময় লড়াইয়ের পর গাজার দুর্গপ্রাচীর ভেঙে পড়ে। ক্ষিপ্ত মেসিডোনীয় বাহিনী নগরে প্রবেশ করে এক নারকীয় হত্যাকাণ্ড চালায়। গাজার প্রতিরোধকারী পুরুষেরা শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করে বীরের মতো মৃত্যুবরণ করেন। নগরীর সেনাপতি বাতিসকে জীবিত বন্দি করা হয় এবং কথিত আছে যে আলেকজান্ডার ট্রয় যুদ্ধের বীর একিলিসের অনুকরণে তাকে রথের পেছনে বেঁধে শহরের চারপাশে টেনে নির্মমভাবে হত্যা করেন। গাজার নারী ও শিশুদের ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করা হয় এবং আলেকজান্ডার এই শূন্য শহরে আশেপাশের যাযাবর বেদুইনদের পুনর্বাসন করে এটিকে একটি শক্তিশালী মেসিডোনীয় সামরিক ফাঁড়িতে রূপান্তরিত করেন। গাজার পতনের মধ্য দিয়ে মেসিডোনীয় বাহিনীর জন্য মিশরে প্রবেশের পথ সম্পূর্ণ নিষ্কণ্টক হয়।
অধ্যায় ২: জেরুজালেমে মেসিডোনীয় পদার্পণ ও সামেরিয়ার বিদ্রোহ: কৌশলগত বশ্যতা বনাম প্রতিরোধ
উপকূলবর্তী সমভূমি যখন গ্রিক যুদ্ধের আগুনে দগ্ধ হচ্ছিল, তখন যিহূদিয়ার পার্বত্য অঞ্চলের কেন্দ্রস্থল জেরুজালেমে চলছিল এক চরম উৎকণ্ঠা ও হিসাবনিকাশ। আকিমেনিড পারস্যের শাসনামলে পারস্য সম্রাটদের প্রতি আনুগত্যের বিনিময়ে বায়তুল মুকাদ্দাস বা দ্বিতীয় মন্দিরের মহাযাজকীয় শাসনব্যবস্থা অভ্যন্তরীণ স্বায়ত্তশাসন উপভোগ করছিল। টায়ার অবরোধ চলাকালে আলেকজান্ডার যখন জেরুজালেমের তৎকালীন মহাযাজক ইয়াদুয়াকে মেসিডোনীয় বাহিনীর জন্য খাদ্য ও রসদ সরবরাহ করতে এবং পারস্যের পক্ষ ত্যাগ করতে নির্দেশ দেন, তখন মহাযাজক এক চরম দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েন। তিনি তৃতীয় দারায়ুসের প্রতি প্রদত্ত শপথের কথা উল্লেখ করে তাৎক্ষণিকভাবে মেসিডোনীয় আনুগত্য স্বীকার করতে অস্বীকার করেছিলেন। ফলে টায়ার ও গাজার পতনের পর আলেকজান্ডারের পরবর্তী লক্ষ্য যে জেরুজালেম হতে পারে, এই আশঙ্কায় গোটা ইহুদি সমাজে তীব্র ত্রাস ছড়িয়ে পড়েছিল।
প্রথম শতকের রোমান ইহুদি ইতিহাসবিদ ফ্ল্যাভিয়াস জোসেফাস তার গ্রন্থে এই সংকটময় মুহূর্তে আলেকজান্ডার ও জেরুজালেমের মধ্যে ঘটে যাওয়া এক নাটকীয় ঘটনার বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন। জোসেফাসের বর্ণনা অনুযায়ী, গাজা জয়ের পর আলেকজান্ডার যখন সৈন্যবাহিনী নিয়ে জেরুজালেমের দিকে অগ্রসর হন, তখন মহাযাজক ইয়াদুয়া কোনো সামরিক প্রতিরোধের পথ বেছে নেননি। তিনি ঐশ্বরিক নির্দেশের ভরসায় রাজকীয় বেগুনি ও রক্তবর্ণ পোশাক পরিধান করেন, মাথায় স্বর্ণের ফলকযুক্ত পাগড়ি পরেন যেখানে স্রষ্টার পবিত্র নাম খোদাই করা ছিল, এবং সাদা পোশাকে সজ্জিত যাজক ও নগরবাসীদের একটি সুবৃহৎ শোভাযাত্রা নিয়ে সাফা বা স্কোপাস পর্বতের শিখরে মেসিডোনীয় সেনাপতিকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত হন।
জোসেফাস লিখেছেন যে এই দৃশ্য দেখে আলেকজান্ডার একাকী এগিয়ে এসে মহাযাজকের মাথার স্বর্ণফলকে খোদাই করা নামের প্রতি নতজানু হয়ে সম্মান জানান। মেসিডোনীয় সেনাপতি পারমিনিয়ন যখন বিস্মিত হয়ে সম্রাটের এই অপ্রত্যাশিত আচরণের কারণ জানতে চান, তখন আলেকজান্ডার প্রকাশ করেন যে তিনি গ্রিসের মেসিডোনিয়ায় থাকার সময় এক স্বপ্নে অবিকল এই পোশাকে এক আত্মিক অবয়ব দেখেছিলেন, যিনি তাকে পারস্য বিজয়ের আশ্বাস দিয়েছিলেন। আধুনিক ইতিহাসবিদেরা এই কাহিনীর অলৌকিক ও নাট্যধর্মী অংশকে পরবর্তীকালের ঐতিহ্য হিসেবে বিবেচনা করলেও এর অন্তর্নিহিত রাজনৈতিক সত্যটি অস্বীকার করেন না। সত্যটি হলো, জেরুজালেমের নেতৃত্ব বাস্তববাদী কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তারা উপলব্ধি করেছিল যে মেসিডোনীয় পরাক্রমকে সামরিকভাবে ঠেকানো অসম্ভব। ইয়াদুয়ার এই রক্তপাতহীন আত্মসমর্পণের বিনিময়ে আলেকজান্ডার জেরুজালেমবাসীকে তাদের পূর্বপুরুষদের ধর্মীয় অনুশাসন ও তাওরাতের বিধান মেনে চলার পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করেন এবং প্রতি সাত বছর পর শমিতা বা কৃষি বিশ্রামের বছর তাদের রাজকীয় কর পরিশোধ থেকে অব্যাহতি দেন।
জেরুজালেমের এই বাস্তবসম্মত কূটনীতির সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা গিয়েছিল নিকটবর্তী উত্তরাঞ্চলীয় সামেরিয়ায়। পারস্যের অধীনে সামেরিয়া ছিল একটি পৃথক প্রশাসনিক প্রদেশ এবং তাদের গভর্নর সানবাল্লাত আলেকজান্ডারের সাথে সমঝোতা করে গেরিজিম পর্বতে তাদের নিজস্ব মন্দির নির্মাণের রাজকীয় অনুমতিও আদায় করে নিয়েছিলেন। কিন্তু খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩১ অব্দে আলেকজান্ডার যখন মিশরে নতুন নগরী আলেকজান্দ্রিয়া প্রতিষ্ঠা ও সিওয়া মরূদ্যানের অভিযান শেষে মেসোপটেমিয়ার পথে ফিরে যাচ্ছিলেন, তখন সামেরিয়ার অধিবাসীরা হঠাৎ এক মারাত্মক বিদ্রোহে জড়িয়ে পড়ে। তারা মেসিডোনীয় অঞ্চলের নবনিযুক্ত গভর্নর আন্দ্রোমাকাসকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করে।
এই চরম ধৃষ্টতার সংবাদ শুনে আলেকজান্ডার প্রচণ্ড ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে সৈন্য নিয়ে সামেরিয়ায় ফিরে আসেন এবং নির্মমভাবে এই বিদ্রোহ দমন করেন। হত্যাকাণ্ডে জড়িত বিদ্রোহীদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হয় এবং ঐতিহাসিক সামেরিয়া শহরটি ধ্বংস করে সেখানে মেসিডোনীয় গ্রিক সৈনিক ও উপনিবেশকারীদের একটি সামরিক বসতি স্থাপন করা হয়। বেঁচে থাকা সামেরীয় জনগোষ্ঠীকে প্রাচীন শেখেম শহরে বিতাড়িত করা হয়। এই ঘটনাটি জেরুজালেম ও সামেরিয়ার পারস্পরিক ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বকে আরও বহু গুণ তিক্ত করে তোলে। একদিকে জেরুজালেম তার রাজনৈতিক চাতুর্যের কারণে ধ্বংসের হাত থেকে বেঁচে স্বায়ত্তশাসন রক্ষা করে, অন্যদিকে সামেরিয়া একটি গ্রিক সামরিক উপনিবেশে পরিণত হয়ে তার সাবেক মর্যাদা হারায়।
| ঐতিহাসিক শক্তি ও সাম্রাজ্য | ফিলিস্তিনে আধিপত্যকাল | শাসনতান্ত্রিক ও রাজস্ব নীতি | ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অবস্থান | দীর্ঘমেয়াদী ভূরাজনৈতিক প্রভাব |
|---|---|---|---|---|
| পারস্য সাম্রাজ্য (আকিমেনিড) | খ্রিষ্টপূর্ব ৫৩৯ থেকে ৩৩২ অব্দ | প্রাদেশিক সত্রপ ব্যবস্থা ও নিয়মিত কর | স্থানীয় ধর্মে সহনশীলতা ও বায়তুল মুকাদ্দাস পুনর্বাসন | প্রাচ্য কেন্দ্রিক শান্তিকাল ও ইহুদি পুনঃপ্রতিষ্ঠা |
| মেসিডোনীয় যুগ (আলেকজান্ডার) | খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩২ থেকে ৩২৩ অব্দ | সরাসরি সামরিক নিয়ন্ত্রণ ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন | পূর্বপুরুষদের বিধান ও শমিতা কর মওকুফ | ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্যের অন্তর্ভুক্তি ও গ্রিক পদার্পণ |
| টলেমীয় রাজবংশ (আলেকজান্দ্রিয়া) | খ্রিষ্টপূর্ব ৩০১ থেকে ২০০ অব্দ | দক্ষ আমলাতান্ত্রিক ও ইজারাভিত্তিক কর ব্যবস্থা | ধর্মীয় স্বায়ত্তশাসন ও সেপতুয়াজিন্ট অনুবাদে সহায়তা | উপকূলীয় হেলেনীয় নগর ও তোবিয়া পরিবারের উত্থান |
| সেলুসিড সাম্রাজ্য (অ্যান্টিওক) | খ্রিষ্টপূর্ব ২০০ থেকে ১৬৪ অব্দ | কেন্দ্রীয় প্রত্যক্ষ শাসন ও আগ্রাসী হেলেনাইজেশন | জোরপূর্বক গ্রিক সংস্কৃতি চাপানো ও মন্দির অপবিত্রকরণ | তীব্র প্রতিরোধ, ম্যাকাবীয় বিদ্রোহ ও হাসমোনীয় যুগ |
অধ্যায় ৩: আলেকজান্ডারের আকস্মিক প্রয়াণ ও দিয়াদোচিদের দ্বন্দ্ব: টলেমীয় ও সেলুসিডদের ফিলিস্তিন কাড়াকাড়ি
খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৩ অব্দের জুন মাসে সুদূর ব্যাবিলনের রাজপ্রাসাদে মাত্র বত্রিশ বছর বয়সে আলেকজান্ডারের আকস্মিক মৃত্যু প্রাচীন বিশ্বের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক বিশাল শূন্যতার জন্ম দেয়। কোনো প্রাপ্তবয়স্ক উত্তরাধিকারী না রেখে যাওয়ায় তাঁর বিশাল সাম্রাজ্যটি মেসিডোনীয় শীর্ষ সেনাপতিদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের রণাঙ্গনে পরিণত হয়। ইতিহাসের পাতায় দিয়াদোচি বা উত্তরাধিকারীদের যুদ্ধ নামে পরিচিত এই দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ ফিলিস্তিন ভূখণ্ডকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ফিলিস্তিন ও দক্ষিণ সিরিয়ার অঞ্চলটি, যা তৎকালীন গ্রিক রাজনীতিতে কোইলে সিরিয়া নামে পরিচিত ছিল, পরিণত হয় দুই মহাশক্তির প্রধান বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে।
আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পরপরই সাম্রাজ্যের বিভাজনে মিশরের সত্রপ বা গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন বুদ্ধিমান সেনাপতি প্রথম টলেমি সোতের। টলেমি উপলব্ধি করেছিলেন যে মিশরের ভৌগোলিক নিরাপত্তা কখনোই নিশ্চিত হতে পারে না যদি না সিনাই মরুভূমির প্রবেশদ্বার এবং ফিলিস্তিনের উপকূলীয় বন্দরগুলো আলেকজান্দ্রিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকে। অন্যদিকে মেসিডোনিয়ার মূল ভূখণ্ড ও এশিয়া মাইনরের ওপর কর্তৃত্ব স্থাপনকারী আরেক প্রতাপশালী সেনাপতি একচক্ষু অ্যান্টিগোনাস এবং তার পরাক্রমশালী পুত্র ডিমেট্রিয়াস পোলিওর্কেটিস সমগ্র লেভান্ট অঞ্চলের ওপর নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে চাইলেন।
খ্রিষ্টপূর্ব ৩১২ অব্দে প্রাচীন গাজার রণক্ষেত্রে সংঘটিত হয় দিয়াদোচি পর্বের অন্যতম ঐতিহাসিক সংঘাত, যা গাজার যুদ্ধ নামে পরিচিত। এই যুদ্ধে প্রথম টলেমি এবং ব্যাবিলনের ক্ষমতাচ্যুত শাসক সেলুকাস প্রথম নিকেটর যৌথভাবে ডিমেট্রিয়াসের সেনাবাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। এই ঐতিহাসিক বিজয়ের ফলে সেলুকাস ব্যাবিলনে ফিরে গিয়ে সেলুসিড সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন এবং টলেমি ফিলিস্তিনের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ সংহত করার সুযোগ পান। পরবর্তীতে খ্রিষ্টপূর্ব ৩০১ অব্দে ফ্রিজিয়ার ইপসুসের যুদ্ধে অ্যান্টিগোনাসের চূড়ান্ত পরাজয় ও মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আলেকজান্ডারের সাম্রাজ্যের পুনর্বিভাজন সম্পন্ন হয়।
ইপসুসের যুদ্ধের পর বিজয়ী জোটের চুক্তি অনুযায়ী দক্ষিণ সিরিয়া ও ফিলিস্তিন সেলুকাসের ভাগে পড়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রথম টলেমি পূর্বাহ্ণেই কোনো সৈন্য ক্ষয় না করে অগ্রসর হয়ে পুরো ফিলিস্তিন ভূখণ্ড দখল করে নেন এবং অঞ্চলটি সেলুকাসের হাতে সমর্পণ করতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানান। এই ঐতিহাসিক ভূরাজনৈতিক বিরোধের সূত্র ধরে পরবর্তী এক শতাব্দী ধরে আলেকজান্দ্রিয়া ও অ্যান্টিওকের মধ্যে মোট ছয়টি ধারাবাহিক রক্তক্ষয়ী সিরীয় যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ফিলিস্তিনের নিরীহ জনপদ ও কৃষিজমি বারবার এই দুই গ্রিক পরাশক্তির পদতলে পিষ্ট হতে থাকে।
খ্রিষ্টপূর্ব ৩০১ থেকে ২০০ অব্দ পর্যন্ত সমগ্র তৃতীয় শতাব্দী জুড়ে ফিলিস্তিন শেষ পর্যন্ত টলেমীয় সাম্রাজ্যের অধীনেই পরিচালিত হয়। আলেকজান্দ্রিয়ার টলেমীয় প্রশাসন ফিলিস্তিনে এক অত্যন্ত কঠোর ও সুশৃঙ্খল রাজস্ব ব্যবস্থা কায়েম করেছিল। প্রাচীন জেনন প্যাপিরাস থেকে জানা যায় যে টলেমীয় রাজকীয় কর্মকর্তারা ফিলিস্তিনের প্রতিটি গ্রাম ও শহরের কৃষি উৎপাদন, জলপাই তেল, শস্য এবং ক্রীতদাস বাণিজ্যের চুলচেরা হিসাব রাখতেন। তবে এই কঠোর অর্থনৈতিক শোষণের পাশাপাশি টলেমীয়রা অভ্যন্তরীণ ধর্মীয় জীবনে সরাসরি হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকত। জেরুজালেমের বায়তুল মুকাদ্দাসের মহাযাজককে তারা সমগ্র ইহুদি জনগোষ্ঠীর প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল, যার প্রধান দায়িত্ব ছিল সম্রাটের পাওনা রাজকীয় কর আদায় করে আলেকজান্দ্রিয়ার রাজকোষে প্রেরণ করা।
অধ্যায় ৪: হেলেনীয় সংস্কৃতির সাংস্কৃতিক বিস্তার ও সেপতুয়াজিন্ট: গ্রিক দর্শন বনাম একেশ্বরবাদী ঐতিহ্যের সংঘাত
টলেমীয় ও সেলুসিডদের রাজনৈতিক কর্তৃত্বের সমান্তরালে যে নীরব অথচ প্রবল সামাজিক রূপান্তর ঘটছিল, তা হলো হেলেনীয় সংস্কৃতির আগ্রাসী বিস্তার। হেলেনিজম কেবল গ্রিক ভাষা শিক্ষা বা পোশাকে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি ছিল জীবনদর্শন, নাগরিক কাঠামো, রাষ্ট্রচিন্তা এবং মানবকেন্দ্রিক মূল্যবোধের এক সর্বগ্রাসী মেলবন্ধন। ফিলিস্তিনের উপকূলবর্তী অঞ্চল ও জর্ডান উপত্যকায় একের পর এক প্রাচীন শহর গ্রিক আদলের পলিস বা স্বায়ত্তশাসিত নগররাষ্ট্রে রূপান্তরিত হতে থাকে। প্রাচীন আক্কো শহরের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় টলেমেস, বেথ শিয়ান রূপান্তরিত হয় স্কিথোপলিসে এবং পূর্ব জর্ডানের রাব্বাত আম্মোন পরিচিতি লাভ করে ফিলাডেলফিয়া নামে। এছাড়া গালিল ও জর্ডানের পূর্বাঞ্চলে গড়ে ওঠে ডেকাপোলিস বা দশ নগরীর এক শক্তিশালী হেলেনীয় কনফেডারেশন।
এই নগরগুলোতে স্থাপিত হয় গ্রিক অ্যাগোরা বা মুক্ত চত্বর, নাট্যশালা এবং সর্বোপরি জিমনেসিয়াম। গ্রিক জিমনেসিয়াম ছিল শারীরিক কসরত, দর্শনচর্চা ও নাগরিক আভিজাত্যের প্রধান কেন্দ্র। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানটিই সেমেটিক ঐতিহ্যবাহী সমাজের কাছে গভীর নৈতিক সংকটের জন্ম দেয়। জিমনেসিয়ামে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে শরীরচর্চা করা হতো এবং গ্রিক বহুঈশ্বরবাদী দেবদেবী যেমন হেরাক্লিস ও হার্মিসের নামে উৎসর্গকৃত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক ছিল। এটি তাওরাতের শালীনতাবোধ এবং সুন্নতে খতনার ধর্মীয় বিধানের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে। বহু তরুণ ইহুদি অভিজাত গ্রিক সমাজের প্রশংসা ও রাজনৈতিক পদমর্যাদা লাভের লোভে গোপনে জিমনেসিয়ামে যোগ দিতে থাকে এবং তাদের ধর্মীয় পরিচয় আড়াল করার চেষ্টা করে।
এই সাংস্কৃতিক টানাপোড়েন ফিলিস্তিনের সমাজকে অভ্যন্তরীণভাবে দুই ভাগে বিভক্ত করে ফেলে। একদিকে ছিল গ্রিক ভাবধারায় দীক্ষিত একদল সুবিধাবাদী ধনিক ও পুরোহিত অভিজাত শ্রেণী, যার উজ্জ্বল উদাহরণ ছিল বিখ্যাত তোবিয়া পরিবার। জর্ডান পারের এই ধনিক বংশের সন্তান জোসেফ বেন তোবিয়াহ টলেমীয় রাজদরবারের সুদক্ষ ইজারাদার হিসেবে সমগ্র ফিলিস্তিন ও সিরিয়ার কর আদায়ের একচেটিয়া অধিকার লাভ করেন। বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে তোবিয়া পরিবার গ্রিক বিলাসিতা, আলেকজান্দ্রিয়ার দরবারি কায়দাকানুন এবং হেলেনীয় জীবনধারাকে সানন্দে গ্রহণ করে। অন্যদিকে সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ কৃষক, ধর্মপ্রাণ আলেম ও সাধক গোষ্ঠী, যাদের ইতিহাসে হাসিদিম বা ধর্মনিষ্ঠ দল বলা হতো, তারা এই বহিরাগত গ্রিক সংস্কৃতিকে তাওরাতের পবিত্র বিধানের প্রতি এক চরম হুমকি ও বিজাতীয় পৌত্তলিকতার বিষবাষ্প হিসেবে গণ্য করত।
এই সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্বের মাঝেই তৃতীয় খ্রিষ্টপূর্বাব্দের মধ্যভাগে একটি যুগান্তকারী বৌদ্ধিক ঘটনার বিকাশ ঘটে, যা ছিল তাওরাতের গ্রিক অনুবাদ বা সেপতুয়াজিন্ট। মিশরের দ্বিতীয় টলেমি ফিলাডেলফাসের শাসনামলে আলেকজান্দ্রিয়ার সুবিখ্যাত রাজকীয় গ্রন্থাগারের প্রধানের আগ্রহে জেরুজালেম থেকে বাহাত্তর জন পণ্ডিতকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তৎকালীন মিশরে বিপুল সংখ্যক ইহুদি অভিবাসী গ্রিক ভাষাভাষী হিসেবে বেড়ে উঠছিল এবং হিব্রু ভাষার ওপর তাদের দখল কমে আসছিল। পণ্ডিতেরা তাওরাতের প্রথম পাঁচটি বই গ্রিক ভাষায় রূপান্তর করেন।
ল্যাটিন ভাষায় সত্তর সংখ্যা নির্দেশক এই সেপতুয়াজিন্ট অনুবাদটি ছিল মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত। এর ফলে সেমেটিক একেশ্বরবাদী ধর্মবিশ্বাস প্রথমবারের মতো একটি বৈশ্বিক দার্শনিক ভাষায় অনূদিত হলো। গ্রিক দর্শনের পারিভাষিক শব্দ যেমন লোগোস বা নোমোস ইত্যাদির মাধ্যমে তাওরাতের আধ্যাত্মিক সত্যকে ব্যক্ত করা সম্ভব হলো। এই অনুবাদ একদিকে আলেকজান্দ্রিয়ার বহুজাতিক পরিমণ্ডলে ধর্মীয় পরিচয় টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করল, অন্যদিকে গ্রিক বুদ্ধিজীবী মহলে হিব্রু ধর্মের পরিচয় তুলে ধরল। পরবর্তীকালে এই সেপতুয়াজিন্টই খ্রিস্টধর্মের প্রাথমিক ধর্মগ্রন্থের মূল ভিত্তি হিসেবে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হয়।
তবে সংস্কৃতির এই আপাত ভারসাম্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। খ্রিষ্টপূর্ব ২০০ অব্দে জর্ডান নদীর উৎসমুখে সংঘটিত প্যানিয়ামের যুদ্ধে সেলুসিড সম্রাট তৃতীয় অ্যান্টিওকাস মিশরীয় টলেমীয় সেনাবাহিনীকে চূড়ান্তভাবে পরাস্ত করে সমগ্র ফিলিস্তিনের ওপর সেলুসিড কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। যদিও তৃতীয় অ্যান্টিওকাস শুরুতে বায়তুল মুকাদ্দাসের অভ্যন্তরীণ অধিকারে হস্তক্ষেপ করেননি, কিন্তু সেলুসিডদের এই আগমন গ্রিক সংস্কৃতির বিস্তারকে এক সহিংস পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়। পরবর্তীতে তারই বংশধর চতুর্থ অ্যান্টিওকাস এপিফানেসের আমলে এই সাংস্কৃতিক রূপান্তরই এক ভয়াবহ ধর্মীয় নির্যাতনে রূপ নেয়, যা ফিলিস্তিনের মাটিতে ম্যাকাবীয়দের ঐতিহাসিক বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল।
আমরা কী শিখলাম?
১. ভূকৌশলগত সংযোগ ও উপকূলীয় নিয়ন্ত্রণ: আলেকজান্ডারের মেসিডোনীয় আগ্রাসন স্পষ্ট করেছিল যে ফিলিস্তিনের উপকূল ও বাণিজ্যপথের নিয়ন্ত্রণ ছাড়া এশিয়ার অভ্যন্তর বা মিশরে আধিপত্য বজায় রাখা অসম্ভব, যা গাজা ও টায়ারের রক্তক্ষয়ী অবরোধের মূল চালিকাশক্তি ছিল।
২. গ্রিক নগররাষ্ট্রের বিস্তৃতি ও নাগরিক কাঠামো: হেলেনীয় যুগে ফিলিস্তিনে পলিস বা গ্রিক আদলের স্বায়ত্তশাসিত নগর ও ডেকাপোলিস গড়ে ওঠে, যা প্রাচীন উপজাতীয় সমাজব্যবস্থাকে ভেঙে এক নতুন বহুসাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক নগরব্যবস্থার সূচনা করে।
৩. কোয়নে গ্রিকের বৈশ্বিক প্রসার ও সেপতুয়াজিন্ট অনুবাদ: টলেমীয় পৃষ্ঠপোষকতায় আলেকজান্দ্রিয়ায় তাওরাতের গ্রিক রূপান্তর সেমেটিক একেশ্বরবাদকে গ্রিক দার্শনিক ভাষার সাথে যুক্ত করে বিশ্ব ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব বৌদ্ধিক সেতুবন্ধন রচনা করে।
৪. সমাজকাঠামোয় শ্রেণিদ্বন্দ্ব ও সাংস্কৃতিক মেরুকরণ: হেলেনীয় সংস্কৃতির সংস্পর্শে ফিলিস্তিনের অভিজাত শ্রেণি জাগতিক সুবিধা ও বিলাসিতায় গ্রিক রীতিনীতি গ্রহণ করলেও সাধারণ মানুষ ও হাসিদিম সম্প্রদায় তাওরাতের মৌলিক বিধানে অবিচল থেকে এক গভীর অভ্যন্তরীণ বিভাজন সৃষ্টি করে।
৫. সাম্রাজ্যিক কাড়াকাড়ি ও সংঘাতের বিস্তার: আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর টলেমীয় ও সেলুসিড সাম্রাজ্যের মধ্যকার ছয়টি সিরীয় যুদ্ধ প্রমাণ করেছিল যে ফিলিস্তিন কোনো প্রান্তিক ভূখণ্ড নয়, বরং পরাশক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বে সর্বদা মধ্যবর্তী রক্তক্ষয়ী রণাঙ্গন।
উপসংহার
আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের ফিলিস্তিনে পদার্পণ ছিল প্রাচীন ভূমধ্যসাগরীয় জগতের জন্য এক ঐতিহাসিক যুগসন্ধিক্ষণ। পারস্যের আকিমেনিড সাম্রাজ্যের দুই শতাব্দীর প্রাচ্যদেশীয় স্থিতিশীলতা ভেঙে ফেলে মেসিডোনীয় বিজয় এই অঞ্চলকে স্থায়ীভাবে হেলেনীয় সাংস্কৃতিক বলয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করে। একদিকে নতুন নগরপত্তন, উন্নত বাণিজ্যপথ এবং তাওরাতের সেপতুয়াজিন্ট অনুবাদের মধ্য দিয়ে জ্ঞানের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছিল। অন্যদিকে গ্রিক বহুঈশ্বরবাদী জীবনদর্শন এবং সেমেটিক একেশ্বরবাদী বিশ্বাসের সংঘাত ফিলিস্তিনের সমাজব্যবস্থাকে গভীরভাবে বিভক্ত করে ফেলেছিল।
দিয়াদোচিদের রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্ব এবং টলেমীয় ও সেলুসিডদের মধ্যকার সাম্রাজ্যিক আধিপত্যের লড়াই ফিলিস্তিনকে পরিণত করেছিল একটি অবরুদ্ধ সমরক্ষেত্রে। খ্রিষ্টপূর্ব ২০০ অব্দে প্যানিয়ামের যুদ্ধের মধ্য দিয়ে টলেমীয় শাসনের অবসান ঘটে এবং ফিলিস্তিন সেলুসিডদের পদানত হয়। কিন্তু এই ক্ষমতার পালাবদল শান্তির বার্তা আনেনি। বরং সেলুসিড শাসকদের আগ্রাসী হেলেনাইজেশন নীতি এবং জেরুজালেমের পবিত্র বায়তুল মুকাদ্দাস অপবিত্র করার চক্রান্ত অচিরেই জন্ম দিতে যাচ্ছিল এক অভূতপূর্ব গণবিস্ফোরণের। পরবর্তী পর্বে উন্মোচিত হবে সেই নাটকীয় সংঘাতের ইতিহাস, যেখানে গ্রিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে গর্জে উঠবে ম্যাকাবীয়দের ঐতিহাসিক বিদ্রোহ এবং সূচনা হবে হাসমোনীয় রাজবংশের ক্ষণস্থায়ী শাসনের।
নিজেকে যাচাই করুন
এই লেখার কুইজ
খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩৩ অব্দে ইসুসের যুদ্ধে পারস্য সম্রাট তৃতীয় দারায়ুসকে পরাজিত করার পর আলেকজান্ডার তাৎক্ষণিকভাবে মেসোপটেমিয়ার অভ্যন্তরে না গিয়ে কেন ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল ধরে ফিলিস্তিনের দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন?
খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩২ অব্দে ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপশহর টায়ার আলেকজান্ডারের বশ্যতা অস্বীকার করলে তিনি নগরটি পদানত করতে কোন অভূতপূর্ব সামরিক কৌশল প্রয়োগ করেছিলেন?
খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩২ অব্দে আলেকজান্ডারের মিশর অভিযানের মুখে ফিলিস্তিনের কোন সুরক্ষিত দুর্গনগরী পারস্যের প্রতি অনুগত থেকে দুই মাসেরও বেশি সময় এক বীরত্বপূর্ণ ও মরিয়া প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল?
খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩১ অব্দে মিশরে আলেকজান্দ্রিয়া নগরী প্রতিষ্ঠা শেষে আলেকজান্ডার যখন ফিরে যাচ্ছিলেন, তখন ফিলিস্তিনের কোন অঞ্চলটি মেসিডোনীয় গভর্নর আন্দ্রোমাকাসকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল?
খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৩ অব্দে ব্যাবিলনে আলেকজান্ডারের আকস্মিক মৃত্যুর পর তাঁর সাম্রাজ্যের সেনাপতিদের মধ্যে যে দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছিল, ইতিহাসের পাতায় তা কী নামে পরিচিত?
খ্রিষ্টপূর্ব ৩১২ অব্দে প্রাচীন ফিলিস্তিনের মাটিতে সংঘটিত কোন বিখ্যাত যুদ্ধের বিজয়ের ফলে সেলুকাস প্রথম নিকেটর ব্যাবিলনে ফিরে গিয়ে সেলুসিড সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন?
খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে ফিলিস্তিনে হেলেনীয় যুগে সমাজের কোন প্রভাবশালী ধনিক গোষ্ঠী টলেমীয় রাজদরবারের সুদক্ষ কর ইজারাদার হিসেবে বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে গ্রিক বিলাসিতা ও সংস্কৃতি গ্রহণ করেছিল?
খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে মিশরের দ্বিতীয় টলেমি ফিলাডেলফাসের শাসনামলে আলেকজান্দ্রিয়ায় হিব্রু তাওরাতের যে ঐতিহাসিক গ্রিক রূপান্তর সম্পন্ন হয়, তা কোন নামে সমাদৃত?
এই বিষয়ের কুইজ চ্যালেঞ্জ
কানআন থেকে গাজা কুইজে যান