৬ নভেম্বর, ২০২৬ এ ৬:০০ AM
কানআন থেকে গাজাপর্ব ১৬: পারস্য সম্রাট সাইরাস দ্য গ্রেট, পারস্য শাসন ও ইহুদিদের প্রত্যাবাসন

পর্ব ১৬: পারস্য সম্রাট সাইরাস দ্য গ্রেট, পারস্য শাসন ও ইহুদিদের প্রত্যাবাসন
"স্বর্গীয় ঈশ্বর আমাকে পৃথিবীর সমস্ত রাজ্য দান করেছেন এবং তিনি আমাকে জুদাহর জেরুজালেমে তাঁর উদ্দেশ্যে একটি গৃহ নির্মাণ করার আদেশ দিয়েছেন। তোমাদের মধ্যে তাঁর সমস্ত প্রজাদের মধ্য থেকে যে কেউ আছে, তার ঈশ্বর তার সহবর্তী হোন; সে জেরুজালেমে গমন করুক।"
— সম্রাট দ্বিতীয় সাইরাসের ঐতিহাসিক রাজকীয় ফরমান (খ্রিষ্টপূর্ব ৫৩৮ অব্দ, এজরা ১:২-৩)
প্রাচীন ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ইতিহাসে খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ ছিল এক অভাবনীয় পুনর্জাগরণের কালপর্ব। ব্যাবিলনীয় সম্রাট বখতেনাসরের হাতে জেরুজালেমের পতন ও প্রথম বায়তুল মুকাদ্দাস ধ্বংসের পর যে ভূখণ্ড দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে জনশূন্য অবস্থায় পড়ে ছিল, তা এক নতুন পরাশক্তির আবির্ভাবে নতুন জীবনের সন্ধান পায়। পারস্যের হখামনিশী সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা মহান সম্রাট দ্বিতীয় সাইরাস (মহামতি কুরুশ) খ্রিষ্টপূর্ব ৫৩৯ অব্দে ব্যাবিলন সাম্রাজ্যের পতন ঘটান। আসিরীয় ও ব্যাবিলনীয় শাসকদের নির্মম দমনপীড়ন ও গণনির্বাসন নীতির বিপরীতে সম্রাট সাইরাস গ্রহণ করেন এক দূরদর্শী বহুসাংস্কৃতিক ও সহনশীল সাম্রাজ্যিক নীতি। খ্রিষ্টপূর্ব ৫৩৮ অব্দে জারিকৃত তাঁর ঐতিহাসিক রাজকীয় ফরমানের মাধ্যমে ব্যাবিলনে নির্বাসিত ইহুদিরা তাদের প্রিয় মাতৃভূমি ফিলিস্তিনে ফিরে আসার এবং পবিত্র বায়তুল মুকাদ্দাস পুনর্নির্মাণের অধিকার লাভ করে। এর মধ্য দিয়ে শুরু হয় বনি ইসরাইলের ঐতিহাসিক প্রত্যাবাসন এবং দ্বিতীয় মন্দির যুগের সূচনা, যা ফিলিস্তিনের সমাজ, প্রশাসন ও একত্ববাদী ধর্মীয় ঐতিহ্যকে এক নতুন রূপ দান করে।
অধ্যায় ১: নব্য-ব্যবিলনের পতন ও সম্রাট সাইরাসের ঐতিহাসিক ফরমান
খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর মধ্যভাগে মেসোপটেমিয়ার ক্ষমতার রাজনীতিতে এক চরম অভ্যন্তরীণ সংকট দানা বাঁধে। নব্য-ব্যবিলনীয় সাম্রাজ্যের সর্বশেষ শাসক সম্রাট নাবোনাইডাস (Nabonidus, খ্রিষ্টপূর্ব ৫৫৬ থেকে ৫৩৯ অব্দ) ব্যাবিলনের ঐতিহ্যবাহী জাতীয় দেবতা মারদুকের পুরোহিতদের সাথে সংঘাতে লিপ্ত হন। তিনি প্রাচীন চন্দ্র দেবতা সিনের উপাসনাকে অতিরিক্ত প্রাধান্য দেন এবং রাজধানী ছেড়ে আরব মরুভূমির তেমা মরূদ্যানে দীর্ঘ এক দশক স্বেচ্ছানির্বাসনে কাটান। এর ফলে ব্যাবিলনের প্রভাবশালী ধর্মযাজক শ্রেণি, অভিজাত সম্প্রদায় এবং সাধারণ প্রজাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। সাম্রাজ্যের শাসনক্ষমতা মূলত ন্যস্ত ছিল তাঁর ভোগবিলাসী পুত্র যুবরাজ বেলশৎসরের হাতে। ফলে অর্থনৈতিক স্থবিরতা এবং ধর্মীয় মেরুকরণের কারণে এককালের অপরাজেয় ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্য ভেতর থেকে চরমভাবে ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।
ঠিক এই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে পূর্ব দিগন্তে আবির্ভূত হন আনশানের পারসিক শাসক মহান সাইরাস। খ্রিষ্টপূর্ব ৫৫৯ অব্দে ক্ষমতায় এসে সাইরাস মিডিয়া ও আনাতোলিয়ার লিডিয়ান সাম্রাজ্য জয় করে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত সীমান্ত বিস্তার করেন। ইরান ও এশিয়া মাইনর একত্রিত করার পর সাইরাসের দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় ব্যাবিলনের ওপর।
খ্রিষ্টপূর্ব ৫৩৯ অব্দের শরৎকালে সাইরাসের পারসিক সেনাবাহিনী ইউফ্রেটিস নদী অতিক্রম করে। ওপিস (Opis) নগরীর যুদ্ধে ব্যাবিলনীয় বাহিনীকে পরাস্ত করার পর খ্রিষ্টপূর্ব ৫৩৯ অব্দের ১২ই অক্টোবর পারসিক সেনাপতি উগবারু (Gobryas) কোনো রক্তপাত ছাড়াই প্রাচীরবেষ্টিত ব্যাবিলন নগরীতে প্রবেশ করেন। ব্যাবিলনের পুরোহিত ও জনগণ সাইরাসকে তাদের মুক্তিদাতা হিসেবে স্বাগত জানায়। ২৯শে অক্টোবর সম্রাট সাইরাস স্বয়ং ব্যাবিলনে প্রবেশ করেন। সেখানে তিনি নিজেকে ব্যাবিলন, সুমের ও আক্কাদ তথা পৃথিবীর চার প্রান্তের সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করেন।
ব্যাবিলন জয়ের পরপরই সম্রাট সাইরাস তাঁর সাম্রাজ্যিক দর্শন ঘোষণা করেন, যা ১৮৭৯ সালে প্রাচীন ব্যাবিলনের ধ্বংসাবশেষে আবিষ্কৃত বিশ্বখ্যাত 'সাইরাস সিলিন্ডারে' (Cyrus Cylinder) খোদাই করা রয়েছে। পোড়ামাটির এই ফলকে আক্কাদীয় কিউনিফর্ম লিপিতে সম্রাট সাইরাস ঘোষণা করেন যে তিনি নির্বাসিত সমস্ত জনগোষ্ঠীর মুক্তি নিশ্চিত করেছেন, তাদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও ধ্বংসপ্রাপ্ত উপাসনালয় পুনর্নির্মাণের ব্যবস্থা করেছেন। এটি ছিল প্রাচীন ইতিহাসে এক বৈপ্লবিক নীতি যা পূর্বতন দমনপীড়নকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে।
এই সার্বজনীন সাম্রাজ্যিক নীতির প্রত্যক্ষ প্রয়োগ ঘটে ফিলিস্তিনের নির্বাসিত ইহুদি জনগোষ্ঠীর ওপর। খ্রিষ্টপূর্ব ৫৩৮ অব্দে সম্রাট সাইরাস এক বিশেষ রাজকীয় ফরমান জারি করেন, যা হিব্রু ও আরামীয় ভাষায় সংরক্ষিত ঐতিহাসিক নথিতে 'সাইরাসের ফরমান' (Edict of Cyrus) নামে পরিচিত। এই ফরমানে সাইরাস ঘোষণা করেন যে স্বর্গের ঈশ্বর তাঁকে পৃথিবীর রাজ্যগুলো দান করেছেন এবং জুদাহর জেরুজালেমে তাঁর উদ্দেশ্যে মন্দির নির্মাণের আদেশ দিয়েছেন। সম্রাট শুধু নির্বাসিত ইহুদিদের ফিলিস্তিনে প্রত্যাবাসনের অনুমতিই দেননি, বরং রাজকীয় কোষাগার থেকে মন্দির নির্মাণের ব্যয়ভার বহনের নির্দেশ দেন। একই সাথে সম্রাট বখতেনাসর কর্তৃক জেরুজালেমের প্রথম মন্দির থেকে লুণ্ঠন করে আনা ৫,৪০০টি মূল্যবান সোনা ও রূপার পবিত্র তৈজসপত্র জুদাহর যুবরাজ শেশবৎসরের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যর্পণ করা হয়।
অধ্যায় ২: প্রথম প্রত্যাবাসন ও দ্বিতীয় বায়তুল মুকাদ্দাস নির্মাণ (খ্রিষ্টপূর্ব ৫৩৮-৫১৬ অব্দ)
সম্রাট সাইরাসের ঐতিহাসিক ফরমান ঘোষণার পর খ্রিষ্টপূর্ব ৫৩৮ অব্দে ব্যাবিলন থেকে ফিলিস্তিনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে প্রত্যাবাসীদের প্রথম ঐতিহাসিক কাফেলা। এই কাফেলার নেতৃত্বে ছিলেন দাউদীয় বংশধর যুবরাজ যেরুব্বাবেল এবং প্রধান মহাপুরোহিত যিহোশূয় বিন যোৎসাদক। ঐতিহাসিক নথিপত্র অনুসারে প্রথম কাফেলায় সর্বমোট ৪২,৩৬০ জন নির্বাসিত ইহুদি তাদের পরিবারসহ অংশ নেয়। সাথে ছিল ৭,৩৩৭ জন দাস-দাসী ও দুইশত গায়ক। দীর্ঘ পাঁচ দশকের নির্বাসনের পর মরুভূমি পাড়ি দিয়ে কাফেলাটি ধ্বংসপ্রাপ্ত জুদাহ ভূখণ্ডে পৌঁছায়।
জেরুজালেম নগরী তখন ছিল আগাছায় ভরা এক জনমানবহীন পাথুরে ধ্বংসস্তূপ। প্রত্যাবাসীরা প্রথমে কোনো রাজপ্রাসাদ বা বিলাসবহুল বাড়ি তৈরির চেষ্টা করেনি; বরং খ্রিষ্টপূর্ব ৫৩৮ অব্দের শরৎকালে তারা প্রাচীন মোরিয়াহ পর্বতের পবিত্র ভূমিতে এসে প্রথম বায়তুল মুকাদ্দাসের মূল বেদির ধ্বংসাবশেষের ওপর একটি নতুন পাথুরে বেদি স্থাপন করে। সেখানে তারা কৃতজ্ঞচিত্তে দৈনিক হোমবলি এবং সুক্কোত বা কুটিরোৎসব উদযাপন করে। এরপর খ্রিষ্টপূর্ব ৫৩৬ অব্দে সম্রাট সাইরাসের রাজকোষ থেকে প্রাপ্ত অর্থ ও লেবানন থেকে ফিনিশীয় বন্দর জোপ্পা হয়ে আনা সুগন্ধি দেবদারু কাঠের সাহায্যে তারা দ্বিতীয় বায়তুল মুকাদ্দাস বা দ্বিতীয় মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের সেই দিনে এক অভূতপূর্ব আবেগঘন দৃশ্যের অবতারণা হয়; তরুণ প্রজন্ম যখন উল্লাসে ফেটে পড়ছিল, তখন যে প্রবীণরা তাঁদের শৈশবে সুলাইমান (আ.)-এর নির্মিত প্রথম মন্দিরের মহিমা প্রত্যক্ষ করেছিলেন, তাঁরা দ্বিতীয় মন্দিরের ক্ষুদ্র ও সাধারণ রূপ দেখে উচ্চৈঃস্বরে ক্রন্দন করেছিলেন।
কিন্তু মন্দির নির্মাণের এই উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায়ে তীব্র ভূরাজনৈতিক বাধার মুখে পড়ে। খ্রিষ্টপূর্ব ৭২২ অব্দে উত্তর রাজ্য পতনের পর আসিরীয়দের দ্বারা পুনর্বাসিত এবং স্থানীয়দের সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা শমরীয় সম্প্রদায় (Samaritans) এবং ফিলিস্তিনের অন্যান্য স্থানীয় অধিবাসীরা এই নির্মাণকাজে অংশ নিতে এগিয়ে আসে। তারা যেরুব্বাবেলের কাছে প্রস্তাব দেয়, "আমাদেরও তোমাদের সাথে নির্মাণ করতে দাও, কারণ আমরাও তোমাদের ঈশ্বরের উপাসনা করি।" কিন্তু যেরুব্বাবেল ও মহাপুরোহিত যিহোশূয় এই প্রস্তাব অত্যন্ত কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে বলেন, "আমাদের ঈশ্বরের মন্দির নির্মাণে তোমাদের কোনো অংশ নেই; সম্রাট সাইরাসের আদেশানুসারে আমরা একাই এটি নির্মাণ করব।"
এই অপমানে ক্ষুব্ধ হয়ে শমরীয়রা তীব্র বিরোধিতায় লিপ্ত হয়। তারা স্থানীয় পারসিক রাজকর্মচারীদের উৎকোচ দিয়ে বিভ্রান্ত করে এবং পারস্যের রাজদরবারে অভিযোগপত্র পাঠায় যে ইহুদিরা মন্দির নির্মাণের নামে আসলে এক বিদ্রোহী দুর্গ গড়ে তুলছে। ফলে সম্রাট সাইরাসের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র দ্বিতীয় ক্যাম্বিসিস (Cambyses II, খ্রিষ্টপূর্ব ৫৩০ থেকে ৫২২ অব্দ) এবং পরবর্তী স্বল্পকালীন শাসনামলে মন্দির নির্মাণের কাজ প্রায় দেড় দশক পুরোপুরি বন্ধ থাকে।
খ্রিষ্টপূর্ব ৫২২ অব্দে পারস্যের সিংহাসনে আরোহণ করেন দূরদর্শী সম্রাট মহান প্রথম দারিয়ুস (Darius I the Great, খ্রিষ্টপূর্ব ৫২২ থেকে ৪৮৬ অব্দ)। এই সময়ে জুদাহর হতাশ জনগোষ্ঠীর মাঝে আত্মিক জাগরণ তৈরি করেন দুই প্রখ্যাত ভাববাদী নবী হগয় (Haggai) এবং জাকারিয়া (Zechariah)। তাঁরা জনগণকে তীব্র ভাষায় সতর্ক করে বলেন যে নিজেদের কাঠের কারুকার্যখচিত ঘরে বসবাস করে আল্লাহর গৃহকে ধ্বংসস্তূপে ফেলে রাখার কারণেই সমাজে দুর্ভিক্ষ ও অমঙ্গল নেমে এসেছে। তাঁদের অনুপ্রেরণায় খ্রিষ্টপূর্ব ৫২০ অব্দে যেরুব্বাবেল ও যিহোশূয় পুনরায় মন্দির নির্মাণের কাজ শুরু করেন।
ইউফ্রেটিস নদীর পশ্চিমের পারসিক সাম্রাজ্যিক প্রদেশের গভর্নর তাত্তেনাই (Tattenai) জেরুজালেমে এসে এই অননুমোদিত নির্মাণের কারণ জানতে চান। ইহুদি নেতারা সম্রাট সাইরাসের প্রাচীন ফরমানের কথা উল্লেখ করলে গভর্নর তাত্তেনাই সম্রাট দারিয়ুসের কাছে সত্যতা যাচাইয়ের জন্য চিঠি পাঠান। সম্রাট দারিয়ুস সাম্রাজ্যের প্রাচীন রাজধানী একবটানার (Ecbatana / হামাদান) মহাফেজখানায় অনুসন্ধান চালানোর নির্দেশ দেন। সেখানে চামড়ার গোটানো নথিতে সম্রাট সাইরাসের মূল রাজকীয় ফরমানটি অক্ষত অবস্থায় খুঁজে পাওয়া যায়। ফরমান পাওয়ার পর ন্যায়পরায়ণ সম্রাট দারিয়ুস এক কঠোর নির্দেশ জারি করেন যে রাজকীয় তহবিল থেকে মন্দির নির্মাণের সমস্ত খরচ মেটাতে হবে এবং যে ব্যক্তি এই কাজে বাধা দেবে তাকে শূলে চড়িয়ে তার ঘর মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হবে।
সম্রাট দারিয়ুসের এই জোরালো সুরক্ষার ফলে খ্রিষ্টপূর্ব ৫১৬ অব্দের মার্চ মাসে (দারিয়ুসের ষষ্ঠ রাজত্ব বছরের আবদার মাসের তৃতীয় দিনে) দ্বিতীয় বায়তুল মুকাদ্দাস নির্মাণের কাজ সমাপ্ত হয়। খ্রিষ্টপূর্ব ৫৮৬ অব্দে প্রথম মন্দির ধ্বংসের ঠিক সত্তর বছর পর দ্বিতীয় মন্দিরের উদ্বোধন সম্পন্ন হয়, যা নবী ইরমিয়ার ৭০ বছরের ঐতিহাসিক ভবিষ্যদ্বাণীর এক অলৌকিক পূর্ণতা প্রমাণ করে।
| ঐতিহাসিক পর্যায় ও ঘটনা | সময়কাল | প্রধান চরিত্র ও শক্তি | ভূরাজনৈতিক ও ধর্মীয় ফলাফল |
|---|---|---|---|
| ব্যাবিলনের পতন ও সাইরাস সিলিন্ডার | খ্রিষ্টপূর্ব ৫৩৯ অব্দ | সম্রাট সাইরাস ও সেনাপতি উগবারু | নির্বাসিতদের মুক্তির ঘোষণা ও সহনশীল সাম্রাজ্যিক নীতির সূচনা |
| সাইরাসের ফরমান ও প্রথম প্রত্যাবাসন | খ্রিষ্টপূর্ব ৫৩৮ অব্দ | সম্রাট সাইরাস, যেরুব্বাবেল ও যিহোশূয় | ৪২,৩৬০ জন ইহুদির ফিলিস্তিনে ফেরা ও মন্দির সামগ্রী প্রত্যর্পণ |
| ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও নির্মাণে বাধা | খ্রিষ্টপূর্ব ৫৩৬-৫২০ অব্দ | শমরীয় সম্প্রদায় ও দ্বিতীয় ক্যাম্বিসিস | শমরীয়দের সাথে সংঘাত ও রাজদরবারে ষড়যন্ত্রে কাজ স্থগিত |
| দারিয়ুসের সনদ ও দ্বিতীয় মন্দির সমাপ্তি | খ্রিষ্টপূর্ব ৫২০-৫১৬ অব্দ | সম্রাট দারিয়ুস, নবী হগয় ও জাকারিয়া | একবটানার নথি উদ্ধার ও ঠিক ৭০ বছর পর দ্বিতীয় মন্দির উদ্বোধন |
অধ্যায় ৩: এজরা ও নহিমিয়ের সংস্কার: ধর্ম ও প্রাচীরের পুনর্গঠন
দ্বিতীয় বায়তুল মুকাদ্দাস নির্মিত হলেও জেরুজালেম নগরী তখনও ছিল প্রাচীরহীন, অরক্ষিত এবং পারিপার্শ্বিক শত্রুভাবাপন্ন প্রতিবেশীদের দ্বারা পরিবেষ্টিত। ধর্মীয় ও সামাজিক ক্ষেত্রেও সমাজে দেখা দিয়েছিল গভীর বিভ্রান্তি ও শৃঙ্খলাহীনতা। এই আত্মিক ও অবকাঠামোগত সংকট নিরসনে পঞ্চম শতাব্দীতে পারস্যের রাজদরবার থেকে প্রেরিত হন দুই অসাধারণ সংস্কারক ব্যক্তিত্ব এজরা এবং নহিমিয়।
খ্রিষ্টপূর্ব ৪৫৮ অব্দে পারস্যের সম্রাট প্রথম আর্তাক্সেরক্সেসের (Artaxerxes I, খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬৫ থেকে ৪২৪ অব্দ) সপ্তম রাজত্ব বছরে দ্বিতীয় প্রত্যাবাসন কাফেলার নেতৃত্ব দিয়ে জেরুজালেমে আসেন এজরা (Ezra the Scribe)। ইসলামি ঐতিহ্যে তিনি অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তিত্ব নবী উজাইর (আ.) হিসেবে সুপরিচিত। এজরা ছিলেন হারুন (আ.)-এর বংশধর একজন শীর্ষ মহাপুরোহিত এবং তাওরাতের এক প্রাজ্ঞ ও দক্ষ লিপিকার। সম্রাট আর্তাক্সেরক্সেস এজরাকে এক অভাবনীয় রাজকীয় ক্ষমতা প্রদান করেন। সম্রাটের ফরমান অনুযায়ী এজরাকে নির্দেশ দেওয়া হয় ইউফ্রেটিস নদীর পশ্চিমে বিচারক নিয়োগ করতে এবং আইন অমান্যকারীদের শাস্তিদানের ক্ষমতা দেওয়া হয়।
জেরুজালেমে এসে এজরা এক চরম সামাজিক ও ধর্মীয় স্খলন প্রত্যক্ষ করেন। তিনি দেখতে পান যে প্রত্যাবাসী ইহুদিরা, এমনকি তাদের পুরোহিত ও প্রধান নেতারা পার্শ্ববর্তী পৌত্তলিক কানআনীয়, মোয়াবীয়, আম্মোনীয় ও আশদোদীয় নারীদের বিয়ে করে ধর্মীয় ও জাতিগত স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলছে। এই ঘটনায় গভীরভাবে মর্মাহত হয়ে এজরা প্রকাশ্যে তাঁর পোশাক ছিঁড়ে দাড়ি-চুল উপড়ে বায়তুল মুকাদ্দাসের সামনে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আল্লাহর কাছে ক্রন্দন করতে থাকেন। তাঁর এই অনুশোচনা সমগ্র সমাজে এক প্রচণ্ড নাড়া দেয়। খ্রিষ্টপূর্ব ৪৫৮ অব্দের প্রবল শীতের বৃষ্টির মাঝে নগর চত্বরে এক ঐতিহাসিক মহাসম্মেলন আহ্বান করা হয়। সেখানে এজরা তাওরাতের অনুশাসন অনুযায়ী সমস্ত পৌত্তলিক সম্পর্ক ছিন্ন করার এবং ধর্মীয় শুদ্ধতা রক্ষার শপথ গ্রহণ করান। এজরা সাধারণ মানুষের মাঝে তাওরাতের লিখিত বাণী নিয়মিত পাঠ ও ব্যাখ্যার এক নতুন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীকালে 'মহা পরিষদ' (Great Assembly) এবং রাব্বিনিক ইহুদিধর্মের প্রধান বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তিমূলে পরিণত হয়।
এজরার ধর্মীয় সংস্কারের পর জেরুজালেমের বাহ্যিক সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে আবির্ভাব ঘটে অপর ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব নহিমিয়ের (Nehemiah)। খ্রিষ্টপূর্ব ৪৪৫ অব্দে নহিমিয় পারস্যের রাজকীয় রাজধানী শুশান দুর্গে (Susa) সম্রাট প্রথম আর্তাক্সেরক্সেসের রাজকীয় পানপাত্রবাহক (Royal Cupbearer) হিসেবে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও বিশ্বস্ত দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। ফিলিস্তিন থেকে আসা ভাই হানানির মুখে জেরুজালেমের প্রাচীর ভগ্ন ও ফটকগুলো আগুনে পোড়া থাকার সংবাদ শুনে নহিমিয় কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং রোজা রেখে প্রার্থনা করেন। সম্রাটের সামনে বিষণ্ণ মুখে উপস্থিত হলে রাজা আর্তাক্সেরক্সেস তাঁর দুঃখের কারণ জানতে চান। সাহসের সাথে নহিমিয় তাঁর পূর্বপুরুষদের সমাধিনগরীর প্রাচীর পুনর্নির্মাণের অনুমতি প্রার্থনা করেন।
সম্রাট আর্তাক্সেরক্সেস নহিমিয়ের আবেদন মঞ্জুর করেন এবং তাঁকে যিহূদ প্রদেশের রাজকীয় গভর্নর নিযুক্ত করেন। সম্রাটের রাজকীয় অশ্বারোহী প্রহরী এবং বন বিভাগের প্রধানের কাছ থেকে মূল্যবান কাঠ সংগ্রহের ছাড়পত্র নিয়ে খ্রিষ্টপূর্ব ৪৪৫ অব্দে নহিমিয় জেরুজালেমে পদার্পণ করেন। নগরীতে পৌঁছেই তিনি রাতের অন্ধকারে মাত্র কয়েকজন বিশ্বস্ত সঙ্গী নিয়ে ঘোড়ার পিঠে চড়ে চুপিচুপি ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাচীর ও তোরণগুলো পরিদর্শন করেন।
নহিমিয়ের এই প্রাচীর পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ চারপাশের শক্তিশালী সাম্রাজ্যিক কর্মকর্তাদের ক্ষিপ্ত করে তোলে। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন শমরিয়ার প্রভাবশালী গভর্নর সানবাল্লাত (Sanballat the Horonite), আম্মোনের গভর্নর তোবিয়াহ (Tobiah the Ammonite) এবং আরবের দক্ষিণাঞ্চলের শক্তিশালী বেদুইন নেতা গেশেম (Geshem the Arab)। এই আঞ্চলিক শাসকরা কোনোভাবেই একটি সুরক্ষিত ও শক্তিশালী জেরুজালেমের পুনরুত্থান মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না। তারা নহিমিয়কে পারস্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের মিথ্যা অপবাদ দেয়, হত্যার ষড়যন্ত্র করে এবং আক্রমণের হুমকি দেয়।
কিন্তু গভর্নর নহিমিয় ছিলেন এক অনন্যসাধারণ সামরিক ও প্রশাসনিক সংগঠক। তিনি সমগ্র প্রাচীরকে বিভিন্ন অংশে বিভক্ত করে প্রতিটি পরিবারের ওপর তাদের নিজ নিজ বাড়ির সামনের অংশ তৈরির দায়িত্ব দেন। শত্রুর অতর্কিত আক্রমণ প্রতিহত করতে তিনি এক ঐতিহাসিক প্রতিরক্ষা কৌশল গ্রহণ করেন; তিনি নির্দেশ দেন যে শ্রমিকরা এক হাতে অস্ত্র ধারণ করবে এবং অন্য হাতে নির্মাণকাজ চালাবে। তাঁর অবিচল নেতৃত্ব ও জনগণের অক্লান্ত পরিশ্রমে মাত্র বায়ান্ন (৫২) দিনের অবিশ্বাস্য স্বল্প সময়ে জেরুজালেমের সুবিশাল প্রাচীর ও তোরণ পুনর্নির্মাণ সম্পন্ন হয়। প্রাচীর সুরক্ষার পাশাপাশি নহিমিয় অভ্যন্তরীণ সামাজিক অবিচার দূর করেন, দরিদ্র কৃষকদের বন্ধক রাখা জমি ও দ্রাক্ষাক্ষেত সুদখোর ধনীদের হাত থেকে মুক্ত করেন এবং সাব্বাথ বা বিশ্রামবারের পবিত্রতা আইনগতভাবে প্রয়োগ করেন।
অধ্যায় ৪: পারস্য সাম্রাজ্যের অধীনে ফিলিস্তিনের ভূরাজনীতি ও 'যিহূদ মেদিনাতা'
আকিমেনিড পারস্য সাম্রাজ্যের সুসংগঠিত প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে ফিলিস্তিন ভূখণ্ড এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা লাভ করে, যা ইতিহাসে 'পারসিক শান্তি' বা প্যাক্স পারসিকা (Pax Persica) নামে পরিচিত। সম্রাট মহান দারিয়ুস সমগ্র বিশাল সাম্রাজ্যকে কুড়িটি প্রধান প্রশাসনিক বিভাগে বা সত্রপিতে (Satrapies) বিভক্ত করেছিলেন। এই প্রশাসনিক বিন্যাসে ফিলিস্তিন অন্তর্ভুক্ত ছিল পঞ্চম সত্রপি 'এবার-নারী' (Eber-Nari)-র অধীনে। আরামীয় ও আক্কাদীয় ভাষায় এবার-নারী শব্দের অর্থ ছিল 'নদীর ওপার', যা নির্দেশ করত ইউফ্রেটিস নদীর পশ্চিম তীর থেকে শুরু করে ভূমধ্যসাগরের উপকূল, সমগ্র সিরিয়া, লেবানন, ফিলিস্তিন এবং সাইপ্রাস দ্বীপ পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল অঞ্চলকে।
এই বিশাল সত্রপির অভ্যন্তরে জেরুজালেম এবং তার আশপাশের পাহাড়ি অঞ্চলকে একটি বিশেষ স্বায়ত্তশাসিত ধর্মীয় প্রদেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল, যার সরকারি আরামীয় নাম ছিল 'যিহূদ মেদিনাতা' (Yehud Medinata বা যিহূদ প্রদেশ)। যিহূদ মেদিনাতা সরাসরি জেরুজালেমের প্রধান মহাপুরোহিত এবং পারস্যের মনোনীত স্থানীয় ইহুদি গভর্নরদের দ্বারা পরিচালিত হতো। পারস্য সাম্রাজ্য তাদের এই দূরবর্তী সীমান্ত প্রদেশে কোনো অতিরিক্ত সামরিক বাহিনী চাপিয়ে দেয়নি; বরং তারা স্থানীয় ধর্মীয় আইন তথা তাওরাতের কর্তৃত্বকে সাম্রাজ্যিক আইনের মর্যাদা প্রদান করে।
প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় যিহূদ মেদিনাতার এই স্বায়ত্তশাসনের চমৎকার নিদর্শন পাওয়া গেছে। জেরুজালেম, রামাত রাহেল ও এন-গেদিতে খননকালে প্রচুর রূপার ক্ষুদ্র মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে, যা 'যিহূদ মুদ্রা' (Yehud Coins) নামে পরিচিত। প্রাচীন আরামীয় ও প্রাচীন হিব্রু হরফে 'ওয়াই-এইচ-ডি' (YHD) উৎকীর্ণ এই মুদ্রাগুলো প্রমাণ করে যে পারস্য সাম্রাজ্য যিহূদ প্রদেশকে নিজস্ব মুদ্রা তৈরি এবং অভ্যন্তরীণ কর আদায়ের স্বায়ত্তশাসন দিয়েছিল। এছাড়া শত শত মাটির পাত্রের হাতলে পাওয়া গেছে রাজকীয় সিলমোহরের ছাপ, যা নির্দেশ করে যে এখানকার জলপাই তেল, দ্রাক্ষারস ও শস্যের ওপর সংগৃহীত করের একটি অংশ স্থানীয় মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণে এবং বাকি অংশ সাম্রাজ্যিক কোষাগারে জমা হতো।
পারস্য সাম্রাজ্যের এই যুগের যোগাযোগব্যবস্থা ছিল প্রাচীন বিশ্বের বিস্ময়। সম্রাটদের নির্মিত সুবিশাল 'রাজকীয় সড়ক' (Royal Road) এবং সার্বক্ষণিক দ্রুতগামী ঘোড়সওয়ার ডাকব্যবস্থা বা 'চাপারখানা' সমগ্র সাম্রাজ্যের সাথে ফিলিস্তিনের বন্দর ও বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোকে যুক্ত করেছিল। ফিনিশীয় বন্দর দিয়ে সামুদ্রিক বাণিজ্য যেমন প্রসারিত হয়েছিল, তেমনি পূর্বের ব্যাবিলনিয়া ও শুশানের সাথে ফিলিস্তিনের স্থলপথের যোগাযোগ নির্বিঘ্ন হয়। ফলে প্রায় দুই শতাব্দী ধরে কোনো বিধ্বংসী যুদ্ধ না হওয়ায় স্থানীয় কৃষিব্যবস্থা ও জনবসতি নতুন করে বিকশিত হয়।
ইসলামি ইতিহাস ও ধর্মতাত্ত্বিক আলোচনায় পারস্য সম্রাট সাইরাসের চরিত্র এক অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ স্থানে অধিষ্ঠিত। আধুনিক কালের বহু প্রখ্যাত মুসলিম পণ্ডিত, বিশেষ করে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ তাঁর কালজয়ী তাফসির 'তরজুমানুল কুরআন'-এ এবং আল্লামা সাইয়েদ মুহাম্মদ হুসাইন তাবাতাবাঈ তাঁর 'তাফসির আল-মিজান'-এ ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের ভিত্তিতে জোরালোভাবে অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে পবিত্র কুরআনের সূরা আল-কাহফে উল্লেখিত ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ 'যুলকারনাইন' (দুই শিংওয়ালা বিজেতা) মূলত পারস্য সম্রাট মহামতি সাইরাস বা কুরুশ। সাইরাসের একেশ্বরবাদী দৃষ্টিভঙ্গি, পূর্ব ও পশ্চিমের দেশজয়ে তাঁর ইনসাফপূর্ণ আচরণ, বিজিত প্রজাদের প্রতি ক্ষমার নীতি এবং পাসারগাদে থেকে প্রাপ্ত তাঁর ভাস্কর্যে মাথার দুই শিংবিশিষ্ট মুকুটের সাথে কুরআনিক বর্ণনার হুবহু সাদৃশ্য রয়েছে।
তাছাড়া পবিত্র কুরআনের সূরা আল-ইসরায় বনি ইসরাইলের প্রথম বিপর্যয়ের পর আল্লাহ তাআলা যে অনুগ্রহের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, তা এই পারসিক যুগের সাথেই গভীরভাবে সম্পর্কিত। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: "তারপর আমি পুনরায় তাদের ওপর তোমাদের প্রাধান্য ফিরিয়ে দিলাম, এবং তোমাদের ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে সাহায্য করলাম এবং তোমাদেরকে জনবলে শ্রেষ্ঠতর করলাম" (১৭:৬)। ব্যাবিলনীয় দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙে সম্রাট সাইরাসের হাত ধরে জেরুজালেমে প্রত্যাবর্তন এবং দ্বিতীয় বায়তুল মুকাদ্দাস পুনর্নির্মাণ ছিল আল্লাহর সেই প্রতিশ্রুত ঐতিহাসিক অনুগ্রহের জীবন্ত বাস্তবায়ন।
সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করলে দেখা যায় যে পারস্য শাসন ফিলিস্তিনের ইতিহাসে এক সুদূরপ্রসারী রূপান্তরের যুগ। এই যুগের মধ্য দিয়েই হিব্রু জাতি একটি রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় কাঠামো থেকে রূপান্তরিত হয়ে একটি সুসংহত একেশ্বরবাদী ধর্মীয় সমাজে পরিণত হয়। মন্দির ও তাওরাত কেন্দ্রিক এই আত্মপরিচয় তাদের এমন এক আধ্যাত্মিক শক্তি দান করেছিল, যা পরবর্তী হেলেনীয় ও রোমান যুগের প্রলয়ঙ্করী সাংস্কৃতিক ও সামরিক ঝড় মোকাবিলা করতে তাদের প্রস্তুত করে তোলে। খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩২ অব্দে মহামতি আলেকজান্ডারের অপ্রতিরোধ্য গ্রিক বাহিনীর আগমনের পূর্ব পর্যন্ত ফিলিস্তিন ভূখণ্ড এই পারসিক শান্তির ছায়াতলে তাদের আত্মিক অস্তিত্বকে চিরস্থায়ী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছিল।
আমরা কী শিখলাম?
১. সহনশীলতা ও সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের শক্তি: আসিরীয় ও ব্যাবিলনীয় দমননীতির বিপরীতে সম্রাট সাইরাসের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও পরমতসহিষ্ণুতার নীতি প্রমাণ করে যে ইনসাফ ও উদারতাই সাম্রাজ্যের দীর্ঘস্থায়ী শান্তির ভিত্তি।
২. ঐশ্বরিক বাণীর সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক বাস্তবায়ন: নবী ইরমিয়ার সত্তর বছরের নির্বাসনকাল সমাপ্তির ভবিষ্যদ্বাণী এবং পবিত্র কুরআনের সূরা আল-ইসরায় বনি ইসরাইলের পুনরুত্থানের ঘোষণা পারস্যের প্রত্যাবাসনের মধ্য দিয়ে অক্ষরে অক্ষরে পূর্ণ হয়।
৩. প্রতিকূলতার মুখে অবিচল নেতৃত্ব: যেরুব্বাবেল, এজরা ও নহিমিয়ের নিঃস্বার্থ ও সাহসী নেতৃত্ব প্রমাণ করে যে অভ্যন্তরীণ নীতিহীনতা এবং বাহ্যিক চরম বাধার মুখেও সততা ও দৃঢ়তা থাকলে একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব।
৪. কিতাব ও আইনের মাধ্যমে জাতির পুনর্গঠন: এজরার হাত ধরে তাওরাতের পাঠ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তার দেখায় যে কোনো জাতির ভৌগোলিক সীমানার চেয়ে তার আইন, শিক্ষা ও নৈতিক মূল্যবোধের সংরক্ষণ অনেক বেশি শক্তিশালী আত্মরক্ষা।
৫. ভৌগোলিক বাফার অঞ্চলের শান্তি ও সমৃদ্ধির শর্ত: একটি অঞ্চলের শান্তি কেবল স্থানীয় শক্তির ওপর নির্ভর করে না; বৃহত্তর সাম্রাজ্যিক শাসকদের সুশাসন, বাণিজ্য নিরাপত্তা ও ধর্মীয় স্বায়ত্তশাসনের নীতি ফিলিস্তিনকে দীর্ঘ দুই শতকের সমৃদ্ধি উপহার দিয়েছিল।
উপসংহার
খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষভাগে সম্রাট সাইরাস দ্য গ্রেটের হাত ধরে ব্যাবিলনীয় নির্বাসনের অবসান এবং ইহুদিদের জেরুজালেমে প্রত্যাবাসন প্রাচীন ফিলিস্তিনের ইতিহাসের এক নতুন স্বর্ণোজ্জ্বল দিগন্ত উন্মোচন করে। প্রায় অর্ধ শতাব্দীর ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে যেরুব্বাবেল ও যিহোশূয়ের নেতৃত্বে নির্মিত দ্বিতীয় বায়তুল মুকাদ্দাস এবং নহিমিয়ের নেতৃত্বে পুনর্নির্মিত জেরুজালেমের সুবিশাল প্রাচীর প্রমাণ করে যে একটি জাতির আত্মিক সংকল্প ধ্বংসের ছাই থেকেও পুনরায় জেগে উঠতে পারে। মহান সম্রাট সাইরাস এবং প্রথম দারিয়ুসের রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠিত 'প্যাক্স পারসিকা' ফিলিস্তিনের মাটিতে নিয়ে এসেছিল বিরল দুই শতাব্দীর রাজনৈতিক স্থিতি ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি।
পারস্য সাম্রাজ্যের এই সুশৃঙ্খল শাসনের অধীনেই প্রাচীন হিব্রু সমাজ তাদের জাতীয় রাজতন্ত্রের মোহ ত্যাগ করে তাওরাত ও মহাপুরোহিত কেন্দ্রিক এক নতুন ধর্মীয় সমাজ হিসেবে নিজেদের সুসংগঠিত করে। এই অভ্যন্তরীণ আত্মিক প্রস্তুতি তাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল, কারণ বিশ্ব ইতিহাসের ক্ষমতার রঙ্গমঞ্চে তখন অপেক্ষা করছিল আরেক নতুন প্রলয়ঙ্করী ঝড়। পশ্চিমের দিগন্তে তখন গর্জে উঠছিল মেসিডোনিয়ার তরুণ দিগ্বিজয়ী আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের সামরিক বাহিনী। কীভাবে হেলেনীয় সংস্কৃতির সেই অভাবনীয় প্লাবন ফিলিস্তিনের সনাতন সমাজ ও ধর্মবিশ্বাসকে এক তীব্র বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামরিক সংঘাতের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল, তা উন্মোচিত হবে এই ঐতিহাসিক সিরিজের পরবর্তী পর্বে।
নিজেকে যাচাই করুন
এই লেখার কুইজ
খ্রিষ্টপূর্ব ৫৩৯ অব্দে ব্যাবিলন বিজয়ের পর কোন পারস্য সম্রাট নির্বাসিত ইহুদিদের ফিলিস্তিনে প্রত্যাবাসন ও বায়তুল মুকাদ্দাস পুনর্নির্মাণের ফরমান জারি করেন?
১৮৭৯ সালে ব্যাবিলনের ধ্বংসাবশেষে আবিষ্কৃত সম্রাট সাইরাসের কোন বিখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক দলিলে নির্বাসিতদের মুক্তির ঘোষণা লিপিবদ্ধ রয়েছে?
খ্রিষ্টপূর্ব ৫৩৮ অব্দে প্রথম প্রত্যাবাসন কাফেলায় দাউদীয় রাজবংশের কোন বংশধর প্রধান রাজনৈতিক নেতা হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন?
খ্রিষ্টপূর্ব ৫১৬ অব্দে দ্বিতীয় বায়তুল মুকাদ্দাস নির্মাণ সমাপ্তির মধ্য দিয়ে প্রথম মন্দির ধ্বংসের পর ঠিক কত বছরের ব্যবধান পূর্ণ হয়?
খ্রিষ্টপূর্ব ৪৪৫ অব্দে শুশান দুর্গে পারস্য সম্রাট প্রথম আর্তাক্সেরক্সেসের কোন মর্যাদাপূর্ণ রাজকীয় পদে নহিমিয় নিযুক্ত ছিলেন?
খ্রিষ্টপূর্ব ৪৪৫ অব্দে গভর্নর নহিমিয়ের নেতৃত্বে জেরুজালেমের সুবিশাল সুরক্ষা প্রাচীর ও তোরণ কত দিনের মধ্যে পুনর্নির্মিত হয়েছিল?
পারস্য সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় ফিলিস্তিন ও জেরুজালেম কোন বৃহৎ সত্রপি বা বিভাগের অন্তর্ভুক্ত ছিল?
আধুনিক বহু মুসলিম পণ্ডিত ও তাফসিরবিদ পবিত্র কুরআনের সূরা আল-কাহফে উল্লেখিত ন্যায়পরায়ণ কোন চরিত্রের সাথে সম্রাট সাইরাসের সাদৃশ্য নির্দেশ করেছেন?
এই বিষয়ের কুইজ চ্যালেঞ্জ
কানআন থেকে গাজা কুইজে যান