৫ নভেম্বর, ২০২৬ এ ৬:০০ AM
কানআন থেকে গাজাপর্ব ১৫: ব্যবিলনীয় সম্রাট বখতেনাসর (নেবুচাদনেজার), জেরুজালেম ধ্বংস ও প্রথম নির্বাসন

পর্ব ১৫: ব্যবিলনীয় সম্রাট বখতেনাসর (নেবুচাদনেজার), জেরুজালেম ধ্বংস ও প্রথম নির্বাসন
"অতএব যখন সেই দুই ওয়াদার প্রথমটির সময় উপস্থিত হলো, তখন আমি তোমাদের ওপর আমার পরাক্রান্ত বান্দাদের প্রেরণ করলাম, যারা প্রতিটি জনপদে প্রবেশ করে ধ্বংসযজ্ঞ চালাল; আর এই ওয়াদা পূর্ণ হওয়ারই ছিল।"
— পবিত্র কুরআন, সূরা আল-ইসরা (১৭:৫)
প্রাচীন ফিলিস্তিনের সুদীর্ঘ ইতিহাসে খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর প্রারম্ভ ছিল সবচেয়ে বেদনাদায়ক ও সুদূরপ্রসারী বিপর্যয়ের কালপর্ব। উত্তর রাজ্য ইসরায়েল আসিরীয়দের হাতে ধ্বংস হওয়ার দেড় শতাব্দী পর দক্ষিণ রাজ্য জুদাহ এবং তার পবিত্র রাজধানী জেরুজালেম মুখোমুখি হয় প্রাচীন বিশ্বের অন্যতম পরাক্রমশালী সামরিক শক্তির। মেসোপটেমিয়ার টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা নব্য-ব্যবিলনীয় সাম্রাজ্যের দুর্ধর্ষ শাসক সম্রাট দ্বিতীয় নেবুচাদনেজার, যাকে প্রাচ্যের ইতিহাসে বখতেনাসর নামে অভিহিত করা হয়, তাঁর বিধ্বংসী সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ফিলিস্তিনের প্রাচীন ভূরাজনীতিকে চিরতরে তছনছ করে দেন। খ্রিষ্টপূর্ব ৫৯৭ অব্দের প্রথম নির্বাসন থেকে শুরু করে খ্রিষ্টপূর্ব ৫৮৬ অব্দে হযরত সুলাইমান (আ.) কর্তৃক নির্মিত প্রথম বায়তুল মুকাদ্দাস বা পবিত্র মন্দিরের সম্পূর্ণ ধ্বংসসাধন পর্যন্ত এই বিপর্যয় ছিল প্রাচীন বনি ইসরাইলের জাতীয় ও ধর্মীয় অস্তিত্বের ওপর এক প্রলয়ঙ্করী আঘাত। এই রক্তক্ষয়ী ঘটনার মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনের মাটিতে স্বাধীন হিব্রু রাজতন্ত্রের চূড়ান্ত অবসান ঘটে এবং শুরু হয় বিশ্বখ্যাত ব্যবিলনীয় নির্বাসন। এটি ফিলিস্তিনের ইতিহাস, জনমিতি ও একেশ্বরবাদী ধর্মীয় ঐতিহ্যের গতিপথকে চিরতরে বদলে দেয়।
অধ্যায় ১: নব্য-ব্যবিলনীয় সাম্রাজ্যের উত্থান ও কারকেমিশের ঐতিহাসিক যুদ্ধ
খ্রিষ্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীর শেষভাগে প্রাচীন নিকট প্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে এক অভাবনীয় ও নাটকীয় পরিবর্তন সূচিত হয়। শতাব্দীপ্রাচীন অত্যাচারী নব্য-আসিরীয় সাম্রাজ্য তাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং মেসোপটেমিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে ক্যালডীয় নেতা নাবোপোলাসারের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা নতুন গণঅভ্যুত্থানের মুখে দ্রুত ভেঙে পড়তে শুরু করে। মিডিয়া ও ব্যাবিলনের যৌথ আক্রমণের মুখে খ্রিষ্টপূর্ব ৬১২ অব্দে আসিরীয় রাজধানী নিনেভের পতন ঘটে। আসিরিয়ার পতনে প্রাচ্যের ক্ষমতার যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণের জন্য নীল নদ উপত্যকা থেকে ছুটে আসে মিশরের ছাব্বিশতম রাজবংশের ফারাও দ্বিতীয় নেকো। মিশর চেয়েছিল ভেঙে পড়া আসিরিয়ার অবশিষ্টাংশকে বাফার হিসেবে টিকিয়ে রেখে সমগ্র লেভান্ট তথা সিরিয়া ও ফিলিস্তিনের ওপর নিজেদের নিরঙ্কুশ ভূরাজনৈতিক আধিপত্য কায়েম করতে।
এই বৈশ্বিক সংঘাতের মুখে দক্ষিণ রাজ্য জুদাহর সংস্কারক রাজা যোশিয়াহ (খ্রিষ্টপূর্ব ৬৪০ থেকে ৬০৯ অব্দ) এক চরম ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি মিশরের ফারাও দ্বিতীয় নেকোর উত্তরমুখী অগ্রগতি রুখতে খ্রিষ্টপূর্ব ৬০৯ অব্দে মেগিদোর গিরিপথে মিশরীয় বাহিনীকে বাধা দেন। প্রাচীন মেগিদোর এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জুদাহর ধার্মিক রাজা যোশিয়াহ তীরবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। যোশিয়াহর আকস্মিক মৃত্যুতে জুদাহর জাতীয় ও ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ে এবং রাজ্যটি মিশরের একটি পদানত করদ রাজ্যে পরিণত হয়। ফারাও নেকো যোশিয়াহর পুত্র যিহোয়াহাজকে মাত্র তিন মাস পর সিংহাসনচ্যুত ও বন্দি করে মিশরে নিয়ে যান এবং তাঁর ভাই এলিয়াকিমকে সিংহাসনে বসিয়ে তাঁর নাম রাখেন যিহোয়াকিম (খ্রিষ্টপূর্ব ৬০৯ থেকে ৫৯৮ অব্দ)।
কিন্তু মিশরের এই আঞ্চলিক আধিপত্য খুব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। খ্রিষ্টপূর্ব ৬০৫ অব্দে আধুনিক সিরিয়া-তুরস্ক সীমান্তে ইউফ্রেটিস নদীর তীরে সংঘটিত হয় প্রাচীন বিশ্বের অন্যতম নির্ণায়ক কারকেমিশের যুদ্ধ। ব্যাবিলনের প্রতিভাবান যুবরাজ দ্বিতীয় নেবুচাদনেজার এই ঐতিহাসিক যুদ্ধে সম্মিলিত মিশরীয় ও আসিরীয় বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাস্ত করেন। কারকেমিশের বিজয়ের মধ্য দিয়ে মেসোপটেমিয়া থেকে ভূমধ্যসাগরের উপকূল পর্যন্ত সমগ্র লেভান্টের ওপর নব্য-ব্যবিলনীয় সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। যুদ্ধজয়ের কিছুদিন পরই পিতা নাবোপোলাসারের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে নেবুচাদনেজার দ্রুত ব্যাবিলনে ফিরে গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজমুকুট পরিধান করেন।
খ্রিষ্টপূর্ব ৬০৫ অব্দের এই ঐতিহাসিক বিজয়ের পর ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে প্রবেশ করে ব্যাবিলনীয় বাহিনী। রাজা যিহোয়াকিম বাস্তবতার চাপে বাধ্য হয়ে মিশরের আনুগত্য ত্যাগ করেন এবং নেবুচাদনেজারের বশ্যতা স্বীকার করে নিয়মিত কর প্রদানে সম্মত হন। কিন্তু এই আনুগত্য ছিল অনিচ্ছুক ও ক্ষণস্থায়ী। খ্রিষ্টপূর্ব ৬০১ অব্দে নেবুচাদনেজার যখন মিশর সরাসরি আক্রমণের উদ্দেশ্যে অগ্রসর হন, তখন মিশরীয় সীমান্তের কাছে উভয় পরাশক্তির মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী কিন্তু অমীমাংসিত যুদ্ধ সংঘটিত হয়। উভয় পক্ষেই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং নেবুচাদনেজার তাঁর সৈন্যবাহিনী পুনর্গঠনের জন্য ব্যাবিলনে ফিরে যেতে বাধ্য হন।
ব্যাবিলনীয়দের এই সাময়িক পিছু হটাকে দুর্বলতা মনে করে চরম ভুল রাজনৈতিক হিসাব করেন জুদাহর রাজা যিহোয়াকিম। তিনি প্রাচীন ভাববাদী নবী ইরমিয়ার প্রজ্ঞাপূর্ণ ও বারবার দেওয়া সতর্কবাণী সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ব্যাবিলনে বার্ষিক কর পাঠানো বন্ধ করে দেন এবং পুনরায় মিশরের সাথে গোপন সামরিক জোটে লিপ্ত হন। লাচিশ ও আজাকাহর পাহাড়ি অঞ্চলে আবিষ্কৃত সমসাময়িক মাটির ফলক বা লাচিশ ওস্ট্রাকা থেকে জানা যায়, তৎকালীন জুদাহ সমাজ এক চরম সামরিক আতঙ্কের মধ্যে দিনাতিপাত করছিল। এই হঠকারী সিদ্ধান্তই দক্ষিণ রাজ্য জুদাহ ও তার পবিত্র রাজধানী জেরুজালেমের জন্য এক মহাবিপর্যয়ের দ্বার উন্মোচন করে।
অধ্যায় ২: খ্রিষ্টপূর্ব ৫৯৭ অব্দের প্রথম অবরোধ ও জেরুজালেম থেকে প্রথম নির্বাসন
যিহোয়াকিমের এই প্রকাশ্য বিদ্রোহের জবাবে সম্রাট দ্বিতীয় নেবুচাদনেজার খ্রিষ্টপূর্ব ৫৯৮ অব্দের শেষভাগে এক সুবিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে পুনরায় লেভান্ট অভিমুখে যাত্রা করেন। তাঁর সাথে যোগ দেয় ব্যাবিলনের অনুগত আরামীয়, মোয়াবীয় ও আম্মোনীয় সহায়ক বাহিনী। ব্যাবিলনীয় বাহিনী যখন যিহূদিয়া সমভূমিতে প্রবেশ করে জেরুজালেম ঘিরে ফেলে, ঠিক সেই চরম মুহূর্তে খ্রিষ্টপূর্ব ৫৯৮ অব্দের ডিসেম্বরে রাজা যিহোয়াকিম রহস্যজনকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর স্থলে মাত্র আঠারো বছর বয়সী তরুণ পুত্র যিহোয়াখিন অবরুদ্ধ জেরুজালেমের সিংহাসনে আরোহণ করেন।
খ্রিষ্টপূর্ব ৫৯৭ অব্দের প্রারম্ভে সম্রাট নেবুচাদনেজার স্বয়ং জেরুজালেমের প্রাচীরের সামনে উপস্থিত হন এবং অবরোধের তীব্রতা বহুগুণ বৃদ্ধি করেন। মাত্র তিন মাস দশ দিন রাজত্ব করার পর তরুণ রাজা যিহোয়াখিন বুঝতে পারেন যে ব্যাবিলনীয় সামরিক যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়া অসম্ভব এবং মিশর থেকেও কোনো সাহায্য আসার সম্ভাবনা নেই। ফলে খ্রিষ্টপূর্ব ৫৯৭ অব্দের ১৬ই মার্চ (ব্যাবিলনীয় বর্ষপঞ্জির দ্বিতীয় আদার) রাজা যিহোয়াখিন তাঁর রাজমাতা, রাজপরিবার, মন্ত্রী ও সেনাপতিদের সাথে নিয়ে আত্মসমর্পণ করেন। ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত ব্যাবিলনীয় বর্ষবৃত্তান্ত বা জেরুজালেম ক্রনিকলে (BM 21946) এই ঐতিহাসিক ঘটনার অবিকল বিবরণ লিপিবদ্ধ রয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে যে সম্রাট যিহূদা নগর অবরোধ করেন, রাজার আত্মসমর্পণ গ্রহণ করেন এবং নিজের ইচ্ছামতো নতুন এক রাজাকে সেখানে অধিষ্ঠিত করেন।
আত্মসমর্পণের পর নেবুচাদনেজার জুদাহর মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার উদ্দেশ্যে সংগঠিত করেন প্রথম ব্যাবিলনীয় নির্বাসন। তিনি বাইতুল মুকাদ্দাস ও রাজপ্রাসাদের বিপুল পরিমাণ মূল্যবান সোনা ও রুপার পাত্র লুণ্ঠন করে ব্যাবিলনে নিয়ে যান। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল মানবসম্পদের নির্বাসন। নেবুচাদনেজার রাজা যিহোয়াখিন ও তাঁর পরিবারের সাথে জুদাহর সাত হাজার দুর্ধর্ষ যোদ্ধা, এক হাজার দক্ষ কর্মকার ও কারিগর, ধর্মীয় পুরোহিত এবং রাজনৈতিক অভিজাতদের শৃঙ্খলিত করে ব্যাবিলনে নির্বাসিত করেন। এই নির্বাসিতদের মধ্যেই ছিলেন তরুণ ধর্মযাজক ও ভাববাদী নবী হিযকিয়েল, যিনি পরবর্তীকালে ব্যাবিলনের নির্বাসিত সমাজে এক প্রভাবশালী ভাববাদী হিসেবে আবির্ভূত হন। জুদাহর মাটিতে কেবল দরিদ্র কৃষক ও সাধারণ শ্রমজীবী মানুষকে ফেলে রাখা হয়, যাতে তারা কোনো সংগঠিত বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিতে না পারে। এই প্রথম নির্বাসনের মাধ্যমে দক্ষিণ রাজ্য জুদাহ তার শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিবৃত্তিক, ধর্মীয় ও কারিগরি নেতৃত্বকে চিরতরে হারায়। রাজধানীতে অবশিষ্ট যারা রইল, তারা ছিল মূলত বিভ্রান্ত, দিশেহারা ও রাজনৈতিকভাবে অনভিজ্ঞ। ব্যাবিলনে পৌঁছানোর পর তরুণ নবী হিযকিয়েল তাঁর স্বদেশবাসীকে সান্ত্বনা দেন এবং প্রবাসের মাটিতে তাঁদের ধর্মীয় চেতনা জাগ্রত রাখার আহ্বান জানান।
আধুনিক প্রত্নতত্ত্বে ব্যাবিলনের রাজকীয় মহাফেজখানায় আবিষ্কৃত হয়েছে 'ওয়াইডনার রেশন ট্যাবলেট' (Weidner Ration Tablets), যেখানে খোদাই করা আছে যে ব্যাবিলনের রাজদরবার থেকে বন্দি যিহোয়াখিন এবং তাঁর পুত্রদের নিয়মিত তেল ও শস্যের রাজকীয় ভাতা বরাদ্দ দেওয়া হতো। এটি বাইবেলের ঐতিহাসিক বর্ণনার এক অকাট্য প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ। এরপর নেবুচাদনেজার যিহোয়াখিনের একুশ বছর বয়সী পিতৃব্য মাত্তানিয়াহকে জুদাহর পুতুল রাজা হিসেবে মনোনীত করেন এবং তাঁর আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করিয়ে তাঁর নাম পরিবর্তন করে রাখেন সিদিকিয়াহ (খ্রিষ্টপূর্ব ৫৯৭ থেকে ৫৮৬ অব্দ)। সিদিকিয়াহ ছিলেন দাউদ (আ.)-এর রাজবংশের সর্বশেষ রাজা যিনি জেরুজালেমের সিংহাসনে আসীন হয়েছিলেন।
| ঐতিহাসিক ঘটনা ও অভিযান | সময়কাল | প্রধান সাম্রাজ্যিক ও স্থানীয় চরিত্র | কৌশলগত সিদ্ধান্ত ও ফলাফল |
|---|---|---|---|
| মেগিদোর যুদ্ধ ও যোশিয়াহর মৃত্যু | খ্রিষ্টপূর্ব ৬০৯ অব্দ | রাজা যোশিয়াহ ও ফারাও দ্বিতীয় নেকো | জুদাহর পরাজয় ও মিশরের অধীনস্থ করদ রাজ্যে রূপান্তর |
| কারকেমিশের নির্ণায়ক যুদ্ধ | খ্রিষ্টপূর্ব ৬০৫ অব্দ | যুবরাজ নেবুচাদনেজার ও মিশরীয় বাহিনী | ব্যাবিলনের ঐতিহাসিক জয় ও লেভান্টে নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা |
| জেরুজালেমের প্রথম অবরোধ ও নির্বাসন | খ্রিষ্টপূর্ব ৫৯৭ অব্দ | সম্রাট নেবুচাদনেজার ও রাজা যিহোয়াখিন | যিহোয়াখিনের আত্মসমর্পণ; রাজপরিবার ও কারিগরদের প্রথম নির্বাসন |
| দ্বিতীয় অবরোধ ও বায়তুল মুকাদ্দাস ধ্বংস | খ্রিষ্টপূর্ব ৫৮৮-৫৮৬ অব্দ | সম্রাট নেবুচাদনেজার, সিদিকিয়াহ ও নেবুজারাদান | জেরুজালেম ও প্রথম মন্দিরের সম্পূর্ণ ধ্বংস; সিদিকিয়াহর অন্ধত্ব ও বন্দিত্ব |
অধ্যায় ৩: সিদিকিয়াহর বিদ্রোহ, দীর্ঘ অবরোধ ও বায়তুল মুকাদ্দাস ধ্বংস (খ্রিষ্টপূর্ব ৫৮৬ অব্দ)
সিংহাসনে আরোহণ করে রাজা সিদিকিয়াহ এক চরম রাজনৈতিক দোলাচল ও দুর্বল নেতৃত্বের পরিচয় দেন। রাজ্যের অধিকাংশ অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ, সমরনায়ক ও দক্ষ কারিগর তখন ব্যাবিলনে নির্বাসিত। জেরুজালেমের রাজদরবারে তখন আধিপত্য বিস্তার করেছিল একদল তরুণ, উগ্র ও অতি-জাতীয়তাবাদী কর্মকর্তা, যারা যে কোনো মূল্যে ব্যাবিলনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পক্ষে ছিল। তাদের পেছনে ইন্দন জোগাচ্ছিল মিশরের ছাব্বিশতম রাজবংশের নতুন উচ্চাভিলাষী ফারাও ওহিবরে বা হফরা। মিশরের রাজদূতরা জেরুজালেমে এসে প্রলোভন দেখায় যে জুদাহ যদি বিদ্রোহ করে, তবে মিশরীয় রথ ও পদাতিক বাহিনী তাদের পূর্ণ সামরিক সুরক্ষা দেবে।
এই চরম সংকটকালে মহান ভাববাদী নবী ইরমিয়া আল্লাহর পক্ষ থেকে বারবার রাজা সিদিকিয়াহ এবং জেরুজালেমের প্রজাদের সতর্ক করে আসছিলেন। নবী ইরমিয়া স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছিলেন যে ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্য হলো বনি ইসরাইলের সীমাহীন পাপাচার, মূর্তিপূজা এবং সামাজিক অবিচারের শাস্তি হিসেবে প্রেরিত ঐশ্বরিক বিধান। তিনি রাজাকে জোরালোভাবে উপদেশ দেন যাতে তিনি ব্যাবিলনের বশ্যতা স্বীকার করে চলেন, কারণ বিদ্রোহ করলে নগরী ও পবিত্র মন্দির সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হবে। কিন্তু রাজদরবারের যুদ্ধবাজ অমাত্যরা নবী ইরমিয়াকে রাষ্ট্রদ্রোহী এবং ব্যাবিলনের গুপ্তচর হিসেবে আখ্যায়িত করে। তারা নবীকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে, কারাগারে নিক্ষেপ করে এবং অবশেষে শহরের রাজকীয় প্রহরীদের চত্বরের এক গভীর ও কর্দমাক্ত মাটির কূপে ফেলে দিয়ে অনাহারে হত্যার অপচেষ্টা চালায়।
উগ্র পারিষদদের চাপে এবং ফারাও হফরার ফাঁকা আশ্বাসে প্রলুব্ধ হয়ে রাজা সিদিকিয়াহ খ্রিষ্টপূর্ব ৫৮৯ অব্দের শেষভাগে নেবুচাদনেজারকে বার্ষিক কর দেওয়া বন্ধ করেন এবং ব্যাবিলনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। এই বিশ্বাসঘাতকতায় ক্ষিপ্ত হয়ে সম্রাট নেবুচাদনেজার তাঁর পুরো সাম্রাজ্যের সামরিক শক্তি একত্র করে খ্রিষ্টপূর্ব ৫৮৮ অব্দের জানুয়ারি মাসে জেরুজালেমের প্রাচীরের সামনে উপস্থিত হন। শুরু হয় প্রাচীন ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ ও নিষ্ঠুর দ্বিতীয় অবরোধ, যা আঠারো থেকে তিরিশ মাস ধরে অব্যাহত ছিল।
ব্যাবিলনীয় বাহিনী নগরীর চারপাশে উঁচু মাটির ঢিবি ও পরিখা তৈরি করে জেরুজালেমকে বাইরের পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। কিছুদিন পর ফারাও হফরার একটি মিশরীয় বাহিনী অগ্রসর হলে ব্যাবিলনীয়রা সাময়িকভাবে অবরোধ তুলে তাদের মোকাবিলা করতে যায় এবং মিশরীয়দের শোচনীয়ভাবে তাড়িয়ে দেয়। এরপর তারা দ্বিগুণ শক্তিতে ফিরে এসে জেরুজালেমকে অবরুদ্ধ করে। মাসের পর মাস ধরে চলা এই অবরোধের ফলে জেরুজালেমের ভেতরে দেখা দেয় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ও মহামারি। খাদ্যের অভাবে নগরবাসীর চরম দুর্দশার যে করুণ চিত্র নবী ইরমিয়ার বিলাপসংগীত গ্রন্থে বিধৃত হয়েছে, তা ইতিহাসের অন্যতম মর্মান্তিক পাঠ।
অবশেষে খ্রিষ্টপূর্ব ৫৮৬ অব্দের গ্রীষ্মকালে দীর্ঘ অবরোধে অনাহারে দুর্বল হয়ে পড়া জেরুজালেমের উত্তর প্রাচীর ব্যাবিলনীয় ব্যাটারিং র্যামের প্রবল আঘাতে ভেঙে পড়ে। প্রাচীর ভেঙে পড়ার সাথে সাথে রাজা সিদিকিয়াহ তাঁর দেহরক্ষীদের নিয়ে রাতের অন্ধকারে গোপনে রাজকীয় উদ্যানের ফটক দিয়ে জর্ডান উপত্যকা তথা জেরিকোর দিকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ব্যাবিলনীয় অশ্বারোহী বাহিনী জেরিকোর সমভূমিতে তাঁকে ধাওয়া করে বন্দি করে। সিদিকিয়াহকে সিরিয়ার রিবলাহ নামক স্থানে অবস্থিত নেবুচাদনেজারের প্রধান সামরিক সদরদপ্তরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সম্রাট নেবুচাদনেজার এক চরম নির্মম বিচারকার্য পরিচালনা করেন। সিদিকিয়াহর চোখের সামনে তাঁর সকল পুত্রকে জবাই করে হত্যা করা হয়; এরপর সিদিকিয়াহর দুটি চোখই অন্ধ করে দিয়ে তাঁকে ব্রোঞ্জের ভারী শৃঙ্খলে বেঁধে পদানত অবস্থায় ব্যাবিলনে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে অন্ধকার কারাকক্ষে তাঁর মৃত্যু ঘটে।
খ্রিষ্টপূর্ব ৫৮৬ অব্দের আগস্ট মাসে নেবুচাদনেজারের রাজকীয় দেহরক্ষী বাহিনীর প্রধান সেনাপতি নেবুজারাদান জেরুজালেমে প্রবেশ করেন। সম্রাটের নির্দেশে নেবুজারাদান এক পরিকল্পিত ধ্বংসযজ্ঞ পরিচালনা করেন। প্রায় চার শতক পূর্বে হযরত সুলাইমান (আ.) কর্তৃক নির্মিত প্রথম বায়তুল মুকাদ্দাস বা পবিত্র মন্দিরে অগ্নিসংযোগ করা হয়। রাজপ্রাসাদ, অভিজাতদের বাসভবন এবং নগরীর প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা পুড়িয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়। মন্দিরের বিখ্যাত ব্রোঞ্জের স্তম্ভদ্বয় ইয়াকিন ও বোয়াজ, সুবিশাল ব্রোঞ্জের জলাধার এবং সোনার তৈজসপত্র ভেঙে টুকরো টুকরো করে লুণ্ঠন করে ব্যাবিলনে নিয়ে যাওয়া হয়। জেরুজালেমের সুদৃঢ় প্রাচীর ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়, যার ফলে পবিত্র নগরীটি পরিণত হয় এক জনমানবহীন ভস্মস্তূপে। দ্বিতীয় রাজাবলি ও নবী ইরমিয়ার ঐতিহাসিক নথিপত্র অনুসারে, প্রধান মহাপুরোহিত সেরায়াহ এবং দ্বিতীয় পুরোহিত সফনিয়াহসহ নগরীর ষাট জন বিশিষ্ট নাগরিককে বন্দি করে রিবলাহে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সম্রাট নেবুচাদনেজারের আদেশে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এর ফলে জেরুজালেমের প্রশাসনিক ও আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। আধুনিক খননকাজে ডেভিড নগরীর পোড়া ঘর ও পোড়া সিলমোহর বা বুলা এই ভয়াবহ ধ্বংসের অকাট্য সাক্ষ্য দেয়।
অধ্যায় ৪: ব্যবিলনীয় নির্বাসন ও নির্বাসিত জনগোষ্ঠীর রূপান্তর
জেরুজালেম নগরী এবং বায়তুল মুকাদ্দাসের সম্পূর্ণ ধ্বংসসাধনের পর সেনাপতি নেবুজারাদান শুরু করেন দ্বিতীয় এবং সর্ববৃহৎ ব্যাবিলনীয় গণনির্বাসন। জেরুজালেমের অবশিষ্ট বেঁচে থাকা পুরোহিত, সরকারি কর্মকর্তা, সৈন্য এবং সুস্থ নাগরিকদের শিকলবদ্ধ করে পায়ে হাঁটিয়ে শত শত মাইল দূরে মেসোপটেমিয়ার ব্যাবিলনিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। জুদাহর পাহাড়ি অঞ্চলে কেবল নিঃস্বতম গ্রামীণ কৃষক, দ্রাক্ষাক্ষেতের মজুর ও দরিদ্রতম মানুষদের ফেলে রাখা হয়, যাতে এই অঞ্চলটি একটি প্রান্তিক কৃষিজমিতে পরিণত হয় এবং পুনরায় কোনো রাজনৈতিক বা সামরিক শক্তির উত্থান ঘটাতে না পারে।
ব্যাবিলনীয় কর্তৃপক্ষ জুদাহ ভূখণ্ডের অবশিষ্টাংশের প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানের জন্য শাখানের পুত্র গেদালিয়াহকে প্রাদেশিক গভর্নর নিযুক্ত করে। গেদালিয়াহ ছিলেন একজন প্রজ্ঞাবান ও শান্তিপ্রিয় ব্যক্তিত্ব, যিনি পূর্বে নবী ইরমিয়ার সুরক্ষায় ভূমিকা রেখেছিলেন। ধ্বংসপ্রাপ্ত জেরুজালেমের পরিবর্তে উত্তরে অবস্থিত মিজপা নগরীতে গেদালিয়াহ তাঁর প্রশাসনিক সদরদপ্তর স্থাপন করেন। গেদালিয়াহ অবশিষ্ট ইহুদিদের আস্বস্ত করেন যে তারা যদি ব্যাবিলনের বশ্যতা মেনে শান্তিতে কৃষিকাজ করে, তবে তাদের কোনো ক্ষতি করা হবে না। নবী ইরমিয়াও বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে গেদালিয়াহর আশ্রয়ে মিজপাতে বসবাস শুরু করেন।
কিন্তু এই ক্ষণস্থায়ী শান্তিও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। জুদাহর রাজপরিবারের এক উগ্র সদস্য ইসমাইল বিন নেথানিয়াহ আম্মোনীয় রাজার উসকানিতে মিজপাতে এসে বিশ্বাসঘাতকতামূলকভাবে গভর্নর গেদালিয়াহ এবং তাঁর সাথে থাকা ব্যাবিলনীয় প্রহরীদের হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ডের ফলে জুদাহর অবশিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তারা আশঙ্কা করে যে একজন রাজকীয় গভর্নর হত্যার অপরাধে ব্যাবিলনীয় বাহিনী ফিরে এসে তাদের সবাইকে নির্বিচারে হত্যা করবে। ফলে নবী ইরমিয়ার স্পষ্ট বারণ সত্ত্বেও তৎকালীন ইহুদি নেতারা অবশিষ্ট মানুষকে সাথে নিয়ে মিশরে পালিয়ে যায় এবং নবী ইরমিয়াকেও জোরপূর্বক তাদের সাথে তাহপানহেশ নামক মিশরীয় সীমান্ত শহরে নিয়ে যাওয়া হয়। এর ফলে খ্রিষ্টপূর্ব ৫৮২ অব্দের তৃতীয় এক সংক্ষিপ্ত নির্বাসনের পর প্রাচীন জুদাহ ভূখণ্ড কার্যত সম্পূর্ণ রাজনৈতিক নেতৃত্বহীন ও জনশূন্য হয়ে পড়ে।
মেসোপটেমিয়ার মাটিতে পৌঁছানোর পর নির্বাসিত ইহুদিদের নিপ্পুর নগরীর সন্নিকটে খাবার খালের তীরে অবস্থিত তেল আবিব নামক বিভিন্ন কৃষিজ ও নগর এলাকায় পুনর্বাসিত করা হয়। আসিরীয় নির্বাসনের মতো এখানে তাদের সম্পূর্ণ ভিন্ন সংস্কৃতিতে বিলীন করে দেওয়া হয়নি; বরং তাদের নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাস ও পারিবারিক কাঠামো বজায় রেখে বসবাস করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। নিপ্পুরে আবিষ্কৃত মুরাশু পরিবার আর্কাইভের বাণিজ্যিক নথিপত্রে নির্বাসিত ইহুদিদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সচ্ছলতার বিবরণ পাওয়া যায়। ব্যাবিলনের এই নির্বাসিত সমাজেই ইহুদি জাতির অস্তিত্ব ও ধর্মতত্ত্বে এক বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটে। মন্দির ও পশু কুরবানির আনুষ্ঠানিকতা হারিয়ে তারা আবিষ্কার করে প্রার্থনালয় বা সিনাগগ কেন্দ্রিক নতুন সামাজিক ব্যবস্থা, যেখানে তারা সম্মিলিত হয়ে পবিত্র ধর্মগ্রন্থ পাঠ, প্রার্থনা ও আলোচনা করত।
এই নির্বাসনের কালপর্বেই পুরোহিত ও লিপিকারদের হাত ধরে হিব্রু বাইবেলের মৌলিক গ্রন্থগুলো সংকলন, সম্পাদনা ও লিখিত রূপ লাভ করে। নির্বাসনের তীব্র বেদনা, মাতৃভূমির জন্য হাহাকার এবং বায়তুল মুকাদ্দাস পুনর্নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা ফুটে ওঠে তাদের সংকলিত স্তোত্রমালায়, যার অমর প্রতিধ্বনি শোনা যায়: "ব্যবিলনের নদীর তীরে বসে আমরা কাঁদতাম, যখন আমরা সিয়োনকে স্মরণ করতাম..."।
ইসলামি ইতিহাস ও ধর্মতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বনি ইসরাইলের এই প্রথম ধ্বংসযজ্ঞ এবং নির্বাসনের ঘটনা এক সুগভীর ঐশ্বরিক ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য বহন করে। পবিত্র কুরআনের সূরা আল-ইসরা বা বনি ইসরাইলে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে যে আল্লাহ তাআলা বনি ইসরাইলকে কিতাবে সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে তারা পৃথিবীতে দুবার চরম ফাসাদ ও অবাধ্যতায় লিপ্ত হবে। প্রথমবার যখন তারা অহংকার, সীমালঙ্ঘন ও নবীদের অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়, তখন আল্লাহ তাদের ওপর এমন পরাক্রান্ত ও কঠোর বান্দাদের চাপিয়ে দেন, যারা প্রতিটি জনপদে প্রবেশ করে তাদের রাজ্য ও উপাসনালয় ধূলিসাৎ করে দেয়। খ্রিষ্টপূর্ব ৫৮৬ অব্দে সম্রাট বখতেনাসরের হাতে প্রথম বায়তুল মুকাদ্দাসের সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হওয়া এবং এই অবর্ণনীয় নির্বাসন ছিল সেই সতর্কবাণীরই এক ঐতিহাসিক বাস্তবায়ন। বনি ইসরাইলের জন্য এটি ছিল এক নির্মম ঐশ্বরিক পরীক্ষা এবং তাদের জাতীয় অস্তিত্বের এক চরম পরিশোধন।
আমরা কী শিখলাম?
১. নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক অবিচারের পরিণতি: কোনো জাতির বাহ্যিক সমৃদ্ধি বা ধর্মীয় স্থাপনার পবিত্রতা তাকে ঐশ্বরিক ন্যায়বিচার থেকে রক্ষা করতে পারে না যদি সমাজে অহংকার, শোষণ ও নবীদের শিক্ষার অবাধ্যতা শিকড় গাড়ে।
২. বাস্তববাদী কূটনীতির বিপরীতে আবেগী হঠকারিতার ধ্বংসযজ্ঞ: নবী ইরমিয়ার বিচক্ষণ ও দূরদর্শী রাজনৈতিক সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে দুর্বল মিশরের ফাঁকা আশ্বাসে পরাক্রমশালী ব্যাবিলনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ জেরুজালেমের সম্পূর্ণ বিনাশ ডেকে এনেছিল।
৩. মানবসম্পদের কৌশলগত গুরুত্ব: সম্রাট নেবুচাদনেজার কর্তৃক প্রথম নির্বাসনে দক্ষ কারিগর ও যোদ্ধাদের ধরে নিয়ে যাওয়া প্রমাণ করে যে কোনো জাতির আসল শক্তি তার ভৌগোলিক সীমানায় নয়, বরং তার দক্ষ মানবসম্পদে নিহিত।
৪. বিপর্যয়ের মধ্যেও আত্মিক রূপান্তর ও সাহিত্যের নবজন্ম: মন্দিরের আনুষ্ঠানিক কাঠামো ধ্বংস হওয়ার পর ব্যাবিলনের নির্বাসিত জীবনে সিনাগগ ব্যবস্থা ও ধর্মগ্রন্থ সংকলনের মাধ্যমে ইহুদি সমাজ তাদের আত্মিক অস্তিত্ব পুনরুজ্জীবিত করেছিল।
৫. ঐশ্বরিক বাণীর চিরন্তন অনিবার্যতা: পবিত্র কুরআনের সূরা আল-ইসরায় উল্লেখিত ঐতিহাসিক সুন্নাহ অনুযায়ী বনি ইসরাইলের ওপর প্রথম বিপর্যয় ছিল তাদের সীমালঙ্ঘনের প্রত্যক্ষ ফলাফল, যা ইতিহাসের প্রতিটি জাতির জন্য এক চিরন্তন সতর্কবার্তা।
উপসংহার
খ্রিষ্টপূর্ব ৫৮৬ অব্দে সম্রাট বখতেনাসরের (দ্বিতীয় নেবুচাদনেজার) হাতে জেরুজালেমের পতন এবং প্রথম বায়তুল মুকাদ্দাসের সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হওয়া প্রাচীন ফিলিস্তিনের ইতিহাসে এক সুদূরপ্রসারী যুগান্তকারী অধ্যায়। এই ঘটনার মাধ্যমে হযরত দাউদ (আ.) ও সুলাইমান (আ.) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত শতাব্দীপ্রাচীন রাজতান্ত্রিক ঐতিহ্যের আনুষ্ঠানিক সমাধি রচিত হয়। ব্যাবিলনীয় ধ্বংসযজ্ঞ ফিলিস্তিনের জনমিতি ও শাসনব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ চূর্ণবিচূর্ণ করে দিলেও নির্বাসিত জনগোষ্ঠীর আত্মিক চৈতন্যকে চিরতরে মুছে দিতে পারেনি; বরং তা এক নতুন ধর্মীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে।
ব্যাবিলনের নদীর তীরে বসে নির্বাসিত বনি ইসরাইল যখন তাদের মাতৃভূমি ও ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দিরের জন্য ক্রন্দন করছিল, তখন তাদের মনে জ্বেলে রাখা হয়েছিল ভবিষ্যৎ প্রত্যাবর্তনের আশা। প্রাচীন নবীদের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী এই নির্বাসন চিরস্থায়ী হওয়ার কথা ছিল না। প্রাচ্যের দিগন্তে কয়েক দশকের মধ্যেই আবির্ভূত হতে যাচ্ছিল নতুন এক উদার বিশ্ব পরাশক্তি পারস্য সাম্রাজ্য। সম্রাট সাইরাস দ্য গ্রেটের উত্থানের মধ্য দিয়ে ব্যাবিলনের লৌহ শৃঙ্খল ভেঙে কীভাবে ইহুদিরা পুনরায় তাদের প্রিয় মাতৃভূমি জেরুজালেমে ফিরে আসার রাজকীয় অনুমতি লাভ করে, তা উন্মোচিত হবে এই ঐতিহাসিক সিরিজের পরবর্তী পর্বে।
নিজেকে যাচাই করুন
এই লেখার কুইজ
খ্রিষ্টপূর্ব ৬০৫ অব্দে প্রাচীন বিশ্বের নির্ণায়ক কারকেমিশের যুদ্ধে নব্য-ব্যবিলনীয় বাহিনীর কাছে কোন দেশের সম্মিলিত বাহিনী পরাজিত হয়েছিল?
খ্রিষ্টপূর্ব ৫৯৭ অব্দের প্রথম অবরোধের পর সম্রাট নেবুচাদনেজার জুদাহর কোন তরুণ রাজাকে সপরিবারে ব্যাবিলনে নির্বাসিত করেছিলেন?
খ্রিষ্টপূর্ব ৬০৯ অব্দে মেগিদোর গিরিপথে মিশরের ফারাও দ্বিতীয় নেকোর অগ্রযাত্রাকে প্রতিহত করতে গিয়ে জুদাহর কোন সংস্কারক রাজা নিহত হন?
খ্রিষ্টপূর্ব ৫৯৭ অব্দে নেবুচাদনেজার কর্তৃক জুদাহর সিংহাসনে পুতুল রাজা হিসেবে অভিষিক্ত দাউদ (আ.)-এর রাজবংশের সর্বশেষ শাসক কে ছিলেন?
খ্রিষ্টপূর্ব ৫৮৬ অব্দে জেরুজালেম ধ্বংসের পূর্বে ব্যাবিলনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করার জন্য কোন মহান ভাববাদী নবী বারবার সতর্ক করেছিলেন?
খ্রিষ্টপূর্ব ৫৮৬ অব্দে সম্রাট নেবুচাদনেজারের কোন প্রধান সেনাপতি জেরুজালেমে প্রবেশ করে প্রথম বায়তুল মুকাদ্দাস ও রাজপ্রাসাদে অগ্নিসংযোগ করেন?
খ্রিষ্টপূর্ব ৫৮৬ অব্দে জেরুজালেম ধ্বংসের পর ব্যাবিলনীয় কর্তৃপক্ষ জুদাহর অবশিষ্টাংশের দেখাশোনার জন্য কাকে প্রাদেশিক গভর্নর নিযুক্ত করেছিল?
পবিত্র কুরআনের সূরা আল-ইসরায় বনি ইসরাইলের প্রথম বিপর্যয় ও প্রথম বায়তুল মুকাদ্দাস ধ্বংসের কারণ হিসেবে প্রধানত কোনটিকে চিহ্নিত করা হয়েছে?
এই বিষয়ের কুইজ চ্যালেঞ্জ
কানআন থেকে গাজা কুইজে যান