৪ নভেম্বর, ২০২৬ এ ৬:০০ AM
কানআন থেকে গাজাপর্ব ১৪: আসিরীয় আক্রমণ এবং উত্তর রাজ্যের পতন ও হারিয়ে যাওয়া দশ জাতি

পর্ব ১৪: আসিরীয় আক্রমণ এবং উত্তর রাজ্যের পতন ও হারিয়ে যাওয়া দশ জাতি
"আমি সামারিয়া অবরোধ করলাম ও অধিকার করলাম; সেখানকার ২৭,২৯০ জন অধিবাসীকে আমি বন্দি করে নিয়ে গেলাম... আমি তাদের স্থলে অন্যান্য বিজিত দেশের মানুষদের পুনর্বাসিত করলাম।"
— সম্রাট দ্বিতীয় সার্গনের খোরসাবাদ রাজকীয় শিলালিপি (খ্রিষ্টপূর্ব ৭২২-৭২১ অব্দ)
প্রাচীন নিকট প্রাচ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে খ্রিষ্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দী ছিল এক চরম রক্তক্ষয়ী কালপর্ব। মেসোপটেমিয়ার টাইগ্রিস অববাহিকায় নব্য-আসিরীয় সাম্রাজ্যের পুনরুত্থান সমগ্র লেভান্ট তথা ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের প্রাচীন ক্ষুদ্র রাজ্যগুলোর অস্তিত্বকে মারাত্মক সংকটের মুখে ঠেলে দেয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ ও উর্বর কৃষিজমির ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আসিরিয়ার দুর্ধর্ষ সামরিক অভিযান ফিলিস্তিনের ওপর একের পর এক বিধ্বংসী আঘাত হানে। এই ভূরাজনৈতিক ঝড়ের প্রথম শিকার হয় উত্তর রাজ্য ইসরায়েল। অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি, রক্তক্ষয়ী প্রাসাদ ষড়যন্ত্র এবং ভুল ভূরাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে খ্রিষ্টপূর্ব ৭২২ অব্দে ইসরায়েলের রাজধানী সামারিয়ার পতন ঘটে। আসিরীয় সাম্রাজ্যের সুপরিকল্পিত গণনির্বাসন নীতির ফলে উত্তর রাজ্যের দশটি গোত্র নিজ আবাসভূমি থেকে উচ্ছিন্ন হয়, যা বিশ্ব ইতিহাসে 'হারিয়ে যাওয়া দশ জাতি' নামে দীর্ঘস্থায়ী আখ্যানের জন্ম দেয়। ফিলিস্তিনের মাটিতে এই ঘটনা কেবল একটি রাজ্যের পতন ছিল না, বরং তা ছিল এই ভূখণ্ডের জনমিতি, প্রশাসন ও ধর্মীয় সংস্কৃতির এক স্থায়ী রূপান্তর।
অধ্যায় ১: নব্য-আসিরীয় সাম্রাজ্যের পুনরুত্থান ও লেভান্টের ভূরাজনৈতিক সংকট
খ্রিষ্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীর মধ্যভাগে মেসোপটেমিয়ার টাইগ্রিস নদীর অববাহিকায় নব্য-আসিরীয় সাম্রাজ্য সম্রাট তৃতীয় তিগলাত-পিলেসারের (খ্রিষ্টপূর্ব ৭৪৫ থেকে ৭২৭ অব্দ) নেতৃত্বে এক অপ্রতিরোধ্য সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়। সিংহাসনে বসে তিনি পূর্বতন বাহিনীর স্থলে গঠন করেন একটি সুসংগঠিত স্থায়ী বেতনভোগী বাহিনী, যাকে বলা হতো 'কিসির শাররুতি'। লৌহবর্শা, অশ্বারোহী বাহিনী ও দুর্গবিধ্বংসী যন্ত্রের সমন্বয়ে গঠিত এই সুসজ্জিত বাহিনী প্রাচীন নগররাষ্ট্রগুলোর জন্য চরম ত্রাসে রূপ নেয়। আসিরীয় সাম্রাজ্যের এই সামরিক উত্থানের মূল চালিকাশক্তি ছিল বাণিজ্যিক পথ দখল, করদরাজ্য স্থাপন এবং পশ্চিমের ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের সম্পদে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা।
এই পরাশক্তির বিস্তারবাদী দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের ওপর। ফিলিস্তিনের অবস্থান ছিল মেসোপটেমিয়া ও মিশরের নীল নদ উপত্যকার মিলনস্থলে। প্রধান বাণিজ্যিক পথ 'ভায়া মারিস' ও 'কিংস হাইওয়ে' এই অঞ্চলের মধ্য দিয়েই প্রসারিত ছিল। লেবাননের কাঠ, ফিলিস্তিনের জলপাই তেল ও বাণিজ্য রুটের নিয়ন্ত্রণ লাভের জন্য এই ভূখণ্ড অধিকার করা আসিরীয়দের কাছে অপরিহার্য ছিল। ফলে ফিলিস্তিনের ক্ষুদ্র রাজ্যগুলো চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়ে এবং উত্তর প্রান্তে অবস্থিত ইসরায়েল রাজ্য সরাসরি আসিরীয় আগ্রাসনের প্রথম শিকারে পরিণত হয়।
অভ্যন্তরীণভাবে উত্তর রাজ্য ইসরায়েল তখন চরম রাজনৈতিক অস্থিরতায় নিমজ্জিত ছিল। দ্বিতীয় যারোবিয়ামের (খ্রিষ্টপূর্ব ৭৮৬ থেকে ৭৪৬ অব্দ) শাসনের অবসানের পর উত্তর রাজ্যে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। পরবর্তী মাত্র তিন দশকে ছয়জন রাজা সিংহাসনে বসেন, যাদের চারজনই নিহত হন নিজস্ব সেনাপতিদের সশস্ত্র অভ্যুত্থানে। যারোবিয়ামের পুত্র জাকারিয়াকে হত্যা করে সিংহাসন দখল করেন শাল্লুম। মাত্র এক মাস পর মেনাহেম রক্তাক্ত অভ্যুত্থানে শাল্লুমকে হত্যা করে ক্ষমতায় বসেন। মেনাহেমের পর তাঁর পুত্র পেকাহিয়াহ সিংহাসনে বসলে তাঁকে হত্যা করেন প্রধান সেনাপতি পেকাহ। এই রক্তক্ষয়ী ক্ষমতা দখলের লড়াই উত্তর রাজ্যের সামরিক সক্ষমতা ও সংহতি পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়।
উত্তর রাজ্যের এই বিশৃঙ্খলার সুযোগে খ্রিষ্টপূর্ব ৭৩৮ অব্দে সম্রাট তৃতীয় তিগলাত-পিলেসার পশ্চিমে প্রথম বড় সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন। ভঙ্গুর সিংহাসন রক্ষায় ইসরায়েলের রাজা মেনাহেম আসিরীয় সম্রাটকে এক হাজার তালেন্ত রৌপ্য কর দিতে বাধ্য হন। এই বিপুল অর্থ সংগ্রহে মেনাহেম ধনী পরিবারের ওপর মাথাপিছু পঞ্চাশ শেকেল রৌপ্যের করভার চাপিয়ে দিলে সমাজে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ফলে খ্রিষ্টপূর্ব ৭৩৭ অব্দ নাগাদ ইসরায়েল আসিরীয় সাম্রাজ্যের একটি নতজানু করদ রাজ্যে পরিণত হয়।
পরবর্তী শাসক রাজা পেকাহ ক্ষমতায় এসে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ ভূরাজনৈতিক চাল চালেন। তিনি আসিরীয় আধিপত্য ভাঙতে দামেস্কের আরামীয় রাজা রেজিনের সাথে সিরো-এফ্রয়িমীয় জোট গঠন করেন। তারা দক্ষিণ রাজ্য জুদাহর রাজা আহাজকে জোটে টানতে প্রচণ্ড চাপ দেয়। কিন্তু বাস্তববাদী আহাজ জোটে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে খ্রিষ্টপূর্ব ৭৩৫ অব্দে পেকাহ ও রেজিনের যৌথ বাহিনী জুদাহ আক্রমণ করে এবং জেরুজালেম অবরোধের উপক্রম করে।
এই চরম বিপদে জুদাহর রাজা আহাজ আত্মঘাতী কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বাইতুল মুকাদ্দাস ও রাজপ্রাসাদের সোনা-রুপা দূত মারফত তিগলাত-পিলেসারের কাছে পাঠান এবং আনুগত্য স্বীকার করে জুদাহ রক্ষার অনুরোধ জানান। এই সুযোগে তিগলাত-পিলেসার খ্রিষ্টপূর্ব ৭৩৪ অব্দে প্রলয়ঙ্করী অভিযান শুরু করেন। খ্রিষ্টপূর্ব ৭৩২ অব্দে আসিরীয় বাহিনী দামেস্ক অধিকার করে আরামীয় রাজ্য নিশ্চিহ্ন করে দেয়। একই সাথে তারা উত্তর রাজ্য ইসরায়েলের গালীল, জাবুলুন, নপ্তালি এবং জর্ডান নদীর পূর্ব তীরের গিলিয়াদ সম্পূর্ণ দখল করে সরাসরি আসিরীয় প্রদেশে রূপান্তর করে।
উত্তর রাজ্য তার ভৌগোলিক আয়তনের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ হারায়। পরাজয়ের মুখে পেকাহকে হত্যা করে হোশেয়া সিংহাসন দখল করেন এবং আসিরিয়ার কাছে নতিস্বীকার করেন। ফলে খ্রিষ্টপূর্ব ৭৩২ অব্দ নাগাদ উত্তর রাজ্যটি রাজধানী সামারিয়া এবং আশপাশের পাহাড়ি অঞ্চল নিয়ে গঠিত একটি দুর্বল ও সংকুচিত ছিটমহলে পরিণত হয়।
অধ্যায় ২: সামারিয়ার চূড়ান্ত অবরোধ ও উত্তর রাজ্যের পতন (খ্রিষ্টপূর্ব ৭২২ অব্দ)
খ্রিষ্টপূর্ব ৭২৭ অব্দে তৃতীয় তিগলাত-পিলেসারের মৃত্যু হলে আসিরীয় সিংহাসনে বসেন তাঁর পুত্র পঞ্চম শালমানেসের (খ্রিষ্টপূর্ব ৭২৭ থেকে ৭২২ অব্দ)। প্রাচীন নিকট প্রাচ্যে সম্রাটের মৃত্যুর সময় করদ রাজ্যগুলোর মধ্যে বিদ্রোহের প্রবণতা দেখা দিত। উত্তর রাজ্যের পুতুল রাজা হোশেয়া এই সংকটকে সুযোগ মনে করে মারাত্মক ভুল পদক্ষেপে লিপ্ত হন। তিনি নিনেভেতে বার্ষিক কর পাঠানো বন্ধ করে আসিরিয়ার বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্রোহ ঘোষণা করেন।
হোশেয়ার এই দুঃসাহসের পেছনে ছিল মিশরের বিভ্রান্তিকর আশ্বাস। চব্বিশতম রাজবংশের অধীনে মিশরের রাজনৈতিক ক্ষমতা খণ্ডিত হলেও তারা আসিরিয়ার বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনে বাফার রাজ্য রক্ষা করতে আগ্রহী ছিল। রাজা হোশেয়া মিশরের তৎকালীন ফারাও সো-এর দরবারে গোপনে দূত পাঠান। ফারাও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে আসিরীয় আক্রমণ হলে মিশরীয় সেনাবাহিনী দ্রুত সাহায্য পাঠাবে। কিন্তু এটি ছিল সম্পূর্ণ অসার প্রতিশ্রুতি। পরবর্তীকালে হিব্রু ভাববাদী নবী যিশাইয় অত্যন্ত চমৎকারভাবে মিশরকে একটি ভাঙা নলখাগড়া হিসেবে অভিহিত করেছিলেন, যার ওপর ভর দিলে তা ভেঙে হাতে ফুটে যায়।
হোশেয়ার বিদ্রোহের সংবাদে ক্ষুব্ধ সম্রাট পঞ্চম শালমানেসের সুবিশাল বাহিনী নিয়ে পশ্চিমে অগ্রসর হন। খ্রিষ্টপূর্ব ৭২৫ অব্দে আসিরীয় বাহিনী সামারিয়ার সীমান্তে উপস্থিত হয়। নগরীর বাইরে এক সামরিক তৎপরতায় আসিরীয়রা হোশেয়াকে বন্দি করে আসিরিয়ায় পাঠিয়ে দেয়। রাজার পতন সত্ত্বেও সামারিয়াবাসী আত্মসমর্পণ করেনি; তারা নগরদ্বার বন্ধ করে এক দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরক্ষার প্রস্তুতি নেয়।
খ্রিষ্টপূর্ব ৭২৫ থেকে ৭২২ অব্দ পর্যন্ত দীর্ঘ তিন বছর ধরে চলে সামারিয়ার ঐতিহাসিক অবরোধ। সামারিয়ার অবস্থান ছিল প্রতিরক্ষার জন্য চমৎকার। খ্রিষ্টপূর্ব নবম শতাব্দীতে রাজা অম্রি এই নগরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একটি খাড়া চুনাপাথরের পাহাড়ের চূড়ায়, যা চারপাশের গভীর উপত্যকা থেকে কয়েক শত ফুট উঁচুতে অবস্থিত ছিল। পাহাড়ের খাড়া ঢাল বেয়ে আসিরীয় রথ ওঠা অসম্ভব ছিল। নগরীর চারপাশে ছিল বিশালাকার মসৃণ পাথরের দ্বৈত কেসম্যাট দেয়াল এবং পাথরে কাটা সুবিশাল ভূগর্ভস্থ জলাধার। এছাড়া বিপুল খাদ্যশস্য সঞ্চিত থাকায় সামারিয়াবাসী তীব্র সংকটের মধ্যেও তিন বছর আসিরীয় বাহিনীকে ঠেকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়।
কিন্তু আসিরীয় সামরিক কৌশল ছিল অত্যন্ত নির্মম। পঞ্চম শালমানেসেরের বাহিনী সামারিয়া পাহাড়ের চারপাশ ঘিরে মাটির পরিখা খনন করে নগরীকে বাইরের জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। অবরুদ্ধ নগরীর ভেতর দেখা দেয় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ও মহামারি। আসিরীয়রা পাহাড়ের ঢালে মাটি ভরাট করে বিশাল র্যাম্প তৈরি করে এবং তার ওপর দিয়ে ভারী ব্যাটারিং র্যাম এনে প্রাচীরে ক্রমাগত আঘাত হানতে থাকে।
খ্রিষ্টপূর্ব ৭২২ অব্দের শেষ ভাগে সামারিয়ার পাথুরে প্রাচীর ভেঙে পড়ে। দীর্ঘ অবরোধে ক্লিষ্ট সেনাদের প্রতিরোধ ভেঙে পড়লে আসিরীয় বাহিনী নগরীতে প্রবেশ করে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। রাজপ্রাসাদ ও সুরক্ষাব্যবস্থা পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়। ঠিক এই সন্ধিক্ষণে সম্রাট পঞ্চম শালমানেসের রহস্যজনকভাবে মৃত্যুবরণ করেন বা অপসারিত হন। সিংহাসনে বসেন দুর্ধর্ষ সেনাপতি দ্বিতীয় সার্গন (খ্রিষ্টপূর্ব ৭২২ থেকে ৭০৫ অব্দ)।
সম্রাট দ্বিতীয় সার্গন ক্ষমতা গ্রহণ করেই সামারিয়া বিজয়ের সমস্ত গৌরব আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের নামে নথিভুক্ত করেন। খোরসাবাদের রাজপ্রাসাদের শিলালিপিতে সার্গন উল্লেখ করেন যে তিনি সামারিয়া পুনর্নির্মাণ করেন এবং সেখান থেকে পঞ্চাশটি রাজকীয় যুদ্ধের রথ জব্দ করে আসিরীয় বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করেন।
প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় সামারিয়া নগরীর এই ভয়াবহ পতনের স্পষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ মিলেছে। প্রাচীন সামারিয়ার প্রত্নস্থল সেবাস্তিয়াতে আধুনিক খননকাজে আবিষ্কৃত হয়েছে খ্রিষ্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীর শেষভাগের এক বিশাল পোড়া স্তর। সেখানে পাওয়া গেছে ভস্মীভূত রাজপ্রাসাদের ভিত্তি, আসিরীয় ধাঁচের তিন কোণাকার ব্রোঞ্জের তীরের ফলা, ভাঙা কেসম্যাট প্রাচীর এবং বিখ্যাত সামারিয়া আইভরি বা হাতির দাঁতের ফলকের পোড়া ধ্বংসাবশেষ। এই প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান প্রমাণ করে যে খ্রিষ্টপূর্ব ৭২২ অব্দে উত্তর রাজ্য ইসরায়েলের দুই শতকব্যাপী রাজনৈতিক অস্তিত্ব চিরতরে অবলুপ্ত হয়।
| ঐতিহাসিক পর্যায় ও অভিযান | সময়কাল | প্রধান সাম্রাজ্যিক ও স্থানীয় শক্তি | কৌশলগত সিদ্ধান্ত ও ফলাফল |
|---|---|---|---|
| তিগলাত-পিলেসারের প্রথম আগ্রাসন | খ্রিষ্টপূর্ব ৭৩৮ অব্দ | নব্য-আসিরিয়া ও রাজা মেনাহেম | এক হাজার তালেন্ত রৌপ্য কর প্রদান এবং নতজানু করদ রাজ্যে রূপান্তর |
| সিরো-এফ্রয়িমীয় যুদ্ধ | খ্রিষ্টপূর্ব ৭৩৫-৭৩২ অব্দ | রাজা পেকাহ, আরামীয় রেজিন ও রাজা আহাজ | জুদাহর আহাজের নতিস্বীকার, দামেস্ক ধ্বংস এবং গালীল ও গিলিয়াদ দখল |
| রাজা হোশেয়ার আসিরীয়বিরোধী বিদ্রোহ | খ্রিষ্টপূর্ব ৭২৭-৭২৫ অব্দ | রাজা হোশেয়া ও মিশরের ২৪তম রাজবংশ | কর বন্ধ ও মিশরীয় আশ্বাসে বিভ্রান্তি; হোশেয়ার গ্রেপ্তার ও কারাবাস |
| সামারিয়ার চূড়ান্ত তিন বছরের অবরোধ | খ্রিষ্টপূর্ব ৭২৫-৭২২ অব্দ | সম্রাট পঞ্চম শালমানেসের ও দ্বিতীয় সার্গন | সামারিয়ার পতন, নগর ধ্বংস, ব্যাপক অগ্নিকাণ্ড ও উত্তর রাজ্যের চিরতরে অবলুপ্তি |
অধ্যায় ৩: আসিরীয় নির্বাসন নীতি ও হারিয়ে যাওয়া দশ জাতির ঐতিহাসিক সত্যতা
সামারিয়ার পতনের পর নব্য-আসিরীয় সাম্রাজ্য তার সুপরিচিত সাম্রাজ্যিক কৌশল প্রয়োগ করে, যা ইতিহাসে আসিরীয় গণনির্বাসন নীতি বা দ্বিমুখী জনসংখ্যা স্থানান্তর নামে পরিচিত। এই নীতির মূল উদ্দেশ্য ছিল বিজিত অঞ্চলের জাতীয় চেতনা, ধর্মীয় সংহতি ও সামরিক প্রতিরোধের ক্ষমতাকে সমূলে বিনষ্ট করা। বিজয়ের পর আসিরীয়রা বুদ্ধিজীবী, সেনাপতি, কারিগর, পুরোহিত ও অভিজাত পরিবারগুলোকে সাম্রাজ্যের দূরদূরান্তে সম্পূর্ণ অপরিচিত পরিবেশে নির্বাসিত করত। নতুন পরিবেশে এসে নির্বাসিতরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ত এবং কয়েক প্রজন্মের মধ্যে নিজস্ব আত্মপরিচয় ও রাজনৈতিক স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলত।
খোরসাবাদে প্রাপ্ত সম্রাট দ্বিতীয় সার্গনের রাজকীয় শিলালিপি অনুযায়ী, সামারিয়া পতনের পর তিনি ঠিক ২৭,২৯০ জন ইসরায়েলিকে বন্দি করে আসিরিয়ায় নির্বাসিত করেন। এই সংখ্যাটি ছিল উত্তর রাজ্যের সামগ্রিক জনসংখ্যার সবচেয়ে প্রভাবশালী অংশ। তাদের মধ্য থেকে দক্ষ সৈনিক, রথচালক ও প্রতিভাবান কারিগরদের বেছে নিয়ে আসিরীয় সেনাবাহিনী ও নির্মাণ প্রকল্পে যুক্ত করা হয়। বাকি বিশাল জনতাকে নিয়ে যাওয়া হয় উত্তর মেসোপটেমিয়ার খাবুর নদী অববাহিকার গোজান অঞ্চলে এবং দূরবর্তী মেদেয়ার বিভিন্ন পাহাড়ি জনপদে।
একই সাথে আসিরীয় সাম্রাজ্য শূন্য হয়ে যাওয়া সামারিয়ার পাহাড়ি অঞ্চলে সাম্রাজ্যের অন্যান্য প্রান্ত থেকে নির্বাসিত জনগোষ্ঠীকে এনে পুনর্বাসিত করে। আসিরীয় নথিপত্র অনুযায়ী, মেসোপটেমিয়ার ব্যবিলন, কুথাহ, আব্বা, হামাত এবং সেফারভাইম থেকে হাজার হাজার মানুষকে উচ্ছেদ করে সামারিয়ায় এনে বসতি স্থাপন করানো হয়। ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির এই নবাগত মানুষেরা স্থানীয় ভূখণ্ডে বসবাসকারী অবশিষ্টাংশ দরিদ্র গ্রামীণ কৃষক জনগোষ্ঠীর সাথে মিশ্রিত হতে শুরু করে।
এই সামাজিক সংমিশ্রণ থেকেই ফিলিস্তিনের মাটিতে জন্ম নেয় এক নতুন ঐতিহাসিক জাতিগোষ্ঠী, যাদের ইতিহাসে শমরীয় সম্প্রদায় বা সামারিটান বলা হয়। পরবর্তীকালে ইহুদি ঐতিহ্যে শমরীয়দের মিশ্রণ হিসেবে অবজ্ঞার চোখে দেখা হতো। তবে আধুনিক ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে যে শমরীয়রা মূলত স্থানীয় ইসরায়েলিদের বংশধর, যাদের সাথে পুনর্বাসিত জনগোষ্ঠীর মিশ্রণ ঘটেছিল। শমরীয়রা স্থানীয় একত্ববাদী ঐতিহ্য ও তাওরাতের নিজস্ব পাঠ রক্ষা করে চলেছিল এবং তারা জেরুজালেমের পরিবর্তে নাবলুসের নিকটবর্তী গেরিজিম পর্বতকে প্রধান উপাসনালয় হিসেবে গ্রহণ করে। এই সামাজিক বিরোধ ফিলিস্তিনের মাটিতে পরবর্তী বহু শতাব্দী ধরে অব্যাহত ছিল।
এদিকে সামারিয়ার নির্বাসিত জনগোষ্ঠীর ভাগ্য নিয়ে জন্ম নেয় মানব ইতিহাসের অন্যতম রহস্যময় আখ্যান, হারিয়ে যাওয়া দশ জাতি বা টেন লস্ট ট্রাইবস। প্রাচীন ঐতিহ্য অনুসারে হযরত ইয়াকুব (আ.)-এর বারো পুত্রের বংশধরদের মধ্যে উত্তর রাজ্যে ছিল দশটি গোত্র: রূবেন, শিময়োন, দান, নপ্তালি, গাদ, আশের, ইষাখর, সবূলূন, এফ্রয়িম এবং মনঃশে। দক্ষিণ রাজ্য গঠিত ছিল মূলত জুদাহ ও বিন্যামীন গোত্র নিয়ে। উত্তর রাজ্যের পতনের পর দশটি গোত্রের নির্বাসিত অংশের কোনো সুস্পষ্ট রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা আর অবশিষ্ট থাকেনি। ফলে পরবর্তী যুগে নানা কিংবদন্তি গড়ে ওঠে যে এই দশ জাতি আফগানিস্তান, কাশ্মীর, ইথিওপিয়া বা মধ্য এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে।
কিন্তু সমসাময়িক প্রত্নতত্ত্ব ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা অনেক বেশি বিজ্ঞানসম্মত চিত্র তুলে ধরে। আধুনিক ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে দেখা যায় যে উত্তর রাজ্যের দশটি গোত্র কোনো অলৌকিক শূন্যতায় মিলিয়ে যায়নি, বরং তাদের রূপান্তর ঘটেছে তিনটি বাস্তব ধারায়:
প্রথমত, আসিরিয়ার রাজকীয় শিলালিপিতে ২৭,২৯০ জন নির্বাসিতের কথা বলা হয়েছে, যা ছিল তৎকালীন উত্তর রাজ্যের মোট জনসংখ্যার মাত্র পনেরো থেকে বিশ শতাংশ। এই নির্বাসিত অভিজাত শ্রেণি মেসোপটেমিয়ার বিশাল জনগোষ্ঠীর সাথে মিশে যায়। নিনেভে এবং কালহুর নথিপত্রে ইসরায়েলি নামযুক্ত কিছু লিপিকার ও কর্মকর্তার নাম পাওয়া যায়, যা প্রমাণ করে যে তারা ক্রমশ আসিরীয় সংস্কৃতির সাথে আত্মীকৃত হয়ে আলাদা সত্তা হারিয়ে ফেলেছিলেন।
দ্বিতীয়ত, উত্তর রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ কৃষক ও দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষ তাদের নিজস্ব জমিতেই রয়ে গিয়েছিল। তারা পাহাড়ে কৃষিকাজ অব্যাহত রাখে এবং পুনর্বাসিত বহিরাগত জনগোষ্ঠীর সাথে মিলেমিশে পরবর্তীকালের শমরীয় জাতিসত্তা গড়ে তোলে।
তৃতীয়ত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, খ্রিষ্টপূর্ব ৭৩৪ থেকে ৭২২ অব্দের যুদ্ধের সময় উত্তর রাজ্য থেকে লক্ষাধিক মানুষ দক্ষিণে জুদাহ রাজ্যে শরণার্থী হিসেবে পালিয়ে আসে। প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজ এই ঐতিহাসিক অভিবাসনের অকাট্য প্রমাণ উন্মোচন করেছে। তৎকালীন জুদাহর রাজা হিষ্কিয়াহর (খ্রিষ্টপূর্ব ৭১৫ থেকে ৬৮৬ অব্দ) শাসনামলে রাজধানী জেরুজালেমের আকার ও জনসংখ্যা প্রায় চারগুণ বৃদ্ধি পায়। নগরীর মূল পাহাড় থেকে বসতি উপচে পড়ে পশ্চিমের পাহাড়ে নতুন শহরতলি গড়ে ওঠে। এই বিপুল শরণার্থী জনগোষ্ঠীকে আসিরীয় আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য হিষ্কিয়াহ শহরের চারপাশে সুবিশাল ব্রড ওয়াল নির্মাণ করেন। এই উত্তরীয় শরণার্থীরা সাথে করে এনেছিলেন তাদের ধর্মীয় স্মৃতি, ঐতিহাসিক নথি ও ভাববাদীদের শিক্ষার সংকলন, যা পরবর্তীকালে জুদাহর ধর্মীয় সাহিত্যের সাথে একীভূত হয়ে চিরতরে সংরক্ষিত হয়।
অধ্যায় ৪: ফিলিস্তিনের ভূমিতে জনমিতিক ও ভূরাজনৈতিক রূপান্তর
উত্তর রাজ্যের পতনের ফলে প্রাচীন ফিলিস্তিনের ভূরাজনৈতিক মানচিত্র চিরতরে বদলে যায়। আসিরীয় সাম্রাজ্য উত্তর ফিলিস্তিনের সমগ্র অঞ্চলকে তিনটি প্রধান সাম্রাজ্যিক প্রদেশে বিভক্ত করে: পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের কেন্দ্র করে গঠিত হয় দোর প্রদেশ, গালীল ও জেজরিল উপত্যকা নিয়ে গঠিত হয় মেগিদো প্রদেশ এবং কেন্দ্রীয় পাহাড়ি অঞ্চল তথা পূর্বতন ইসরায়েল রাজ্যের কেন্দ্রস্থল নিয়ে গঠিত হয় সামারিনা প্রদেশ। এই প্রদেশগুলোর শাসনভার ন্যস্ত করা হয় নিনেভে থেকে প্রেরিত আসিরীয় গভর্নরদের হাতে। ফলে হাজার বছর ধরে চলা স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের অবসান ঘটে এবং উত্তর ফিলিস্তিন সরাসরি মেসোপটেমীয় সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক শোষণ ও সামরিক নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
এই প্রশাসনিক পুনর্গঠনে উত্তর ফিলিস্তিন আসিরীয় সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের অংশ হয়ে ওঠে। আসিরীয়রা বন্দরগুলোর ওপর নজরদারি কায়েম করে বাণিজ্য কাফেলা থেকে বিপুল শুল্ক আদায় করত। কৃষকদের ওপর বাধ্যতামূলক শ্রম চাপিয়ে দিয়ে উৎপাদিত জলপাই তেল ও দ্রাক্ষারস নিয়মিত নিনেভে পাঠানো হতো। এর ফলে ফিলিস্তিনের উত্তরাঞ্চল নিজস্ব রাজনৈতিক কর্তৃত্ব হারিয়ে এক ঔপনিবেশিক রূপ লাভ করে।
অন্যদিকে এই ঐতিহাসিক পটভূমিতে দক্ষিণ রাজ্য জুদাহর টিকে থাকা ছিল এক বিস্ময়কর বাস্তবতা। উত্তর রাজ্য যখন মানচিত্র থেকে মুছে গেল, তখন জুদাহ বেঁচে রইল আসিরীয় সাম্রাজ্যের এক দুর্বল করদ বাফার রাষ্ট্র হিসেবে। জুদাহর শাসকবর্গ প্রত্যক্ষ করেছিলেন কীভাবে আসিরিয়ার সাথে সংঘাতের পরিণতিতে তাদের উত্তরের প্রতিবেশী ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। ফলে রাজা হিষ্কিয়াহ ও তাঁর উপদেষ্টারা সতর্কতার সাথে অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা বৃদ্ধির পদক্ষেপ নেন। জেরুজালেমের পানির সংকট মেটাতে হিষ্কিয়াহ দুর্গের ভেতর পাথরের নিচ দিয়ে ৫৩৩ মিটার দীর্ঘ ঐতিহাসিক শিলোহ সুড়ঙ্গ খনন করেন। এই সুড়ঙ্গ পাহাড়ি ঝরনার পানি সরাসরি শহরের ভেতরে নিয়ে আসত, যাতে আসিরীয় অবরোধের সময় নগরবাসী চরম পানির সংকটে না পড়ে।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে উত্তর রাজ্যের পতন প্রাচীন ইসরায়েলি সমাজে গভীর আত্মজিজ্ঞাসা সৃষ্টি করে। সমসাময়িক ভাববাদী নবী আমোস এবং হোশেয়া বহু পূর্ব থেকেই উত্তর রাজ্যের এই মর্মান্তিক পরিণতির স্পষ্ট সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছিলেন। নবী আমোস উত্তর রাজ্যের শাসক ও ব্যবসায়ীদের বিলাসিতা, দরিদ্রদের ওপর শোষণ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে ন্যায়বিচার ও ইনসাফ না থাকলে কোনো জাতির সামরিক প্রাচীর তাকে বাঁচাতে পারে না। একইভাবে নবী হোশেয়া সতর্ক করেছিলেন যে আধ্যাত্মিক অবক্ষয় ও নৈতিক স্খলন রাষ্ট্রকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়।
সামারিয়ার পতনের পর জুদাহর সমাজ এই বিপর্যয়কে ঐশ্বরিক বিধান ও ন্যায়ের প্রতিফলনের অকাট্য প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করে। তারা উপলব্ধি করে যে রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব কোনো স্থায়ী অধিকার নয়, বরং তা টিকে থাকে নৈতিক শুদ্ধতা, সামাজিক ইনসাফ এবং সৃষ্টিকর্তার বিধান পালনের ওপর। ইসলামি ঐতিহ্যেও বনি ইসরায়েলের এই কালপর্বকে অহংকার ও সীমালঙ্ঘনের করুণ পরিণতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে বারবার সতর্ক করা হয়েছে যে কোনো জাতি যদি পথভ্রষ্ট হয় এবং দুর্বলদের ওপর জুলুম চালায়, তবে তাদের ওপর প্রবল পরাক্রান্ত শত্রুকে চাপিয়ে দেওয়া হয়। খ্রিষ্টপূর্ব ৭২২ অব্দে আসিরীয়দের হাতে উত্তর রাজ্যের পরিণতি ছিল সেই ঐতিহাসিক সুন্নাহরই এক বাস্তব রূপ।
সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করলে দেখা যায় যে আসিরীয় আক্রমণ ফিলিস্তিনের মাটিতে এক দীর্ঘস্থায়ী বিভাজন রেখা টেনে দেয়। উত্তর ফিলিস্তিন রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে মিশ্র ঔপনিবেশিক সমাজে রূপান্তরিত হয়, যার ধারাবাহিকতা বজায় থাকে পরবর্তী পারসিক, হেলেনীয় ও রোমান যুগেও। আর অন্যদিকে দক্ষিণে জুদাহ হয়ে ওঠে একত্ববাদী ধর্মীয় ঐতিহ্য, হিব্রু সাহিত্যের সংরক্ষণ এবং জেরুজালেম কেন্দ্রিক আত্মপরিচয়ের একমাত্র ধারক। যদিও এই টিকে থাকা ছিল সাময়িক, তবুও তা জেরুজালেমকে রক্ষা করেছিল আরও দেড় শতক, যতক্ষণ না প্রাচ্যের দিগন্তে আবির্ভূত হয় নতুন এক ব্যাবিলনীয় পরাশক্তি।
আমরা কী শিখলাম?
১. বাহ্যিক শক্তির মিথ্যা আশ্বাসে আত্মঘাতী পদক্ষেপের পরিণতি: রাজা হোশেয়ার বিভ্রান্তিকর মিশরীয় সামরিক সহায়তার ওপর ভরসা করে আসিরিয়ার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা উত্তর রাজ্যের দ্রুত পতন ও সম্পূর্ণ বিলুপ্তি ডেকে এনেছিল।
২. অভ্যন্তরীণ শোষণ ও নৈতিক অবক্ষয়ের অনিবার্য ধ্বংস: নবী আমোস ও হোশেয়ার সতর্কবাণী অনুযায়ী অভ্যন্তরীণ সামাজিক অবিচার, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও নৈতিক অবক্ষয় একটি রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে এতটাই ভঙ্গুর করে তোলে যে তা বহিরাগত আঘাত সহ্য করতে পারে না।
৩. সাম্রাজ্যিক জনসংখ্যা স্থানান্তরের দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক প্রভাব: নব্য-আসিরীয় সাম্রাজ্যের দ্বিমুখী গণনির্বাসন নীতি উত্তর ফিলিস্তিনের আদি জনমিতি ভেঙে দিয়ে শমরীয় সম্প্রদায়ের মতো নতুন মিশ্র সামাজিক ও ধর্মীয় বাস্তবতার জন্ম দেয়।
৪. শরণার্থী সংকট থেকে নগর ও সংস্কৃতির রূপান্তর: সামারিয়ার পতনের পর উত্তর থেকে পালিয়ে আসা হাজার হাজার শরণার্থীর আগমনে জেরুজালেম এক সমৃদ্ধ মহানগরীতে রূপ নেয় এবং তাদের সংরক্ষিত দলিলপত্র হিব্রু সাহিত্যকে চিরতরে সমৃদ্ধ করে।
৫. ক্ষুদ্র বাফার রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা: মেসোপটেমিয়া ও মিশরের মতো দুটি পরাশক্তির মধ্যবর্তী সংযোগস্থলে অবস্থিত ক্ষুদ্র রাজ্যগুলোর টিকে থাকা নির্ভর করে বাস্তবসম্মত কূটনীতি ও বিচক্ষণ ভারসাম্যের ওপর, হঠকারী আবেগের ওপর নয়।
উপসংহার
খ্রিষ্টপূর্ব ৭২২ অব্দে সামারিয়ার পতন এবং উত্তর রাজ্য ইসরায়েলের চিরতরে বিলুপ্তি কেবল একটি নগরের পতন ছিল না, বরং তা ছিল প্রাচীন ফিলিস্তিনের ভূরাজনৈতিক ও জনমিতিক মানচিত্রের এক মৌলিক রূপান্তর। সম্রাট তৃতীয় তিগলাত-পিলেসারের আগ্রাসন থেকে শুরু করে সম্রাট দ্বিতীয় সার্গনের নির্মম নির্বাসন নীতি পর্যন্ত আসিরীয় তাণ্ডব প্রমাণ করে যে সাম্রাজ্যিক শক্তির বিস্তার কীভাবে শতাব্দীপ্রাচীন মানববসতি ও সীমানাকে মুহূর্তে মুছে দিতে পারে। তথাকথিত হারিয়ে যাওয়া দশ জাতির রূপকথার পেছনে লুকিয়ে থাকা ঐতিহাসিক সত্য হলো সাধারণ মানুষের শরণার্থী জীবন, মেসোপটেমিয়ার বিশাল সমাজে আত্মীকরণের ট্র্যাজেডি এবং ফিলিস্তিনের পাহাড়ি জনপদে শমরীয় সম্প্রদায়ের নতুন বিকাশ।
উত্তর রাজ্যের এই নির্মম পরিণতির পর ফিলিস্তিনের একক রাজনৈতিক ও আত্মিক কেন্দ্র হিসেবে টিকে রইল দক্ষিণ রাজ্য জুদাহ এবং তার পবিত্র রাজধানী জেরুজালেম। উত্তরের করুণ পরিণতি জুদাহর সমাজ ও নীতিনির্ধারকদের সামনে এক জ্বলন্ত সতর্কবার্তা হিসেবে উপস্থিত হয়েছিল। কিন্তু এই ভূরাজনৈতিক স্বস্তি জুদাহর জন্যও চিরস্থায়ী ছিল না। আসিরিয়ার এই তাণ্ডব থেকে সাময়িকভাবে বেঁচে গেলেও মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য কয়েক দশকের মধ্যেই আবার বদলে যেতে শুরু করে। মেসোপটেমিয়ার বুকে তখন জেগে উঠছিল আরেক নতুন ও আরও বিধ্বংসী শক্তি নব্য-ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্য। যার ফলে পরবর্তী পর্বে জুদাহর ভাগ্যও আবর্তিত হতে থাকে এক অনিবার্য মহাপ্রলয়ের দিকে।
নিজেকে যাচাই করুন
এই লেখার কুইজ
খ্রিষ্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীর মধ্যভাগে নব্য-আসিরীয় সাম্রাজ্যের পুনরুত্থান ও সামরিক সংস্কার কোন সম্রাটের নেতৃত্বে শুরু হয়েছিল?
সম্রাট দ্বিতীয় সার্গনের খোরসাবাদ রাজকীয় শিলালিপি অনুসারে সামারিয়া পতনের পর ঠিক কতজন অধিবাসীকে আসিরিয়ায় নির্বাসিত করা হয়েছিল?
খ্রিষ্টপূর্ব ৭৩৫-৭৩২ অব্দের সিরো-এফ্রয়িমীয় জোটে আরামীয় রাজা রেজিনের সাথে উত্তর রাজ্য ইসরায়েলের কোন রাজা যুক্ত ছিলেন?
উত্তর রাজ্য ধ্বংসের পূর্বে সেখানকার সীমাহীন সামাজিক অবিচার, অর্থনৈতিক শোষণ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কোন ভাববাদী নবী সোচ্চার হয়েছিলেন?
খ্রিষ্টপূর্ব ৭২২ অব্দে সামারিয়ার পতনের প্রাক্কালে উত্তর রাজ্য ইসরায়েলের শেষ রাজা কে ছিলেন?
আসিরীয় নির্বাসন নীতি ও বহিরাগত জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসনের ফলে উত্তর ফিলিস্তিনে কোন ঐতিহাসিক মিশ্র সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটে?
খ্রিষ্টপূর্ব ৭২৫ থেকে ৭২২ অব্দ পর্যন্ত দীর্ঘ তিন বছর ধরে আসিরীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে উত্তর রাজ্যের কোন রাজধানী নগরী অবরুদ্ধ ছিল?
সামারিয়া পতনের পর উত্তর রাজ্য থেকে পালিয়ে আসা বিপুল শরণার্থীর কারণে দক্ষিণ রাজ্য জুদাহর কোন নগরীর আয়তন চারগুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল?
এই বিষয়ের কুইজ চ্যালেঞ্জ
কানআন থেকে গাজা কুইজে যান