৩ নভেম্বর, ২০২৬ এ ৬:০০ AM
কানআন থেকে গাজাপর্ব ১৩: সুলাইমান (আ.)-এর পরবর্তী রাজ্য বিভাজন: ঐক্যবদ্ধ রাজতন্ত্রের পতন এবং জুদাহ ও ইসরায়েল রাজ্যের সংঘাত

পর্ব ১৩: সুলাইমান (আ.)-এর পরবর্তী রাজ্য বিভাজন: ঐক্যবদ্ধ রাজতন্ত্রের পতন এবং জুদাহ ও ইসরায়েল রাজ্যের সংঘাত
"যদি আপনি আজ এই প্রজাদের প্রতি সদয় হন, তাদের সেবা করেন এবং তাদের সাথে মিষ্টি ভাষায় কথা বলেন, তবে তারা চিরকাল আপনার অনুগত প্রজা হয়ে থাকবে।"
— প্রবীণ পারিষদবর্গের ঐতিহাসিক উপদেশ (খ্রিষ্টপূর্ব আনুমানিক ৯৩১ অব্দ, ১ম রাজাবলি ১২:৭)
খ্রিষ্টপূর্ব ৯৩১ অব্দে হযরত সুলাইমান (আ.)-এর ওফাত কানআন ভূখণ্ডের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ইতিহাসে এক যুগান্তকারী রূপান্তরের সূচনা করে। চার দশকব্যাপী বিস্তৃত যে মহিমান্বিত স্বর্ণযুগ বারোটি গোত্রকে এক পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ রেখেছিল, তা তাঁর তিরোধানের সাথে সাথেই গভীর সংকটের মুখে পড়ে। কেন্দ্রীয় রাজধানী জেরুজালেমের বিশাল নির্মাণযজ্ঞের ব্যয়ভার মেটাতে গিয়ে যে কঠোর করব্যবস্থা ও বাধ্যতামূলক শারীরিক শ্রম ধার্য করা হয়েছিল, তা উত্তরের দশটি গোত্রের মনে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল। নতুন উত্তরাধিকারী হিসেবে সুলাইমান (আ.)-এর পুত্র রেহবিয়ামের সিংহাসনে আরোহণ সেই সুপ্ত অসন্তোষকে দাবানলে রূপান্তর করে।
সুলাইমান (আ.)-এর দূরদর্শী প্রজ্ঞার বিপরীতে রেহবিয়ামের রাজনৈতিক অহংকার শতাব্দীপ্রাচীন জাতীয় ঐক্যকে মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে দেয়। ঐতিহ্যবাহী কেন্দ্রীয় উপাসনালয় বায়তুল মুকাদ্দাস ও দাউদ রাজবংশের প্রতি প্রশ্নহীন আনুগত্যের বদলে উত্তরের গোত্রগুলো সামাজিক ইনসাফ ও কর লাঘবের দাবি তোলে। শেকেমের প্রান্তরে সেই বিরোধ মীমাংসার বদলে আরও চরম রূপ নেয়। এর অনিবার্য পরিণতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় দুটি স্বাধীন প্রতিদ্বন্দ্বী রাজ্য: উত্তরে দশ গোত্রীয় 'ইসরায়েল রাজ্য' এবং দক্ষিণে দ্বি-গোত্রীয় 'জুদাহ রাজ্য'। একই জাতির এই রাজনৈতিক বিভাজন কেবল সীমানাকেই খণ্ডবিখণ্ড করেনি, বরং তাওহিদের শাশ্বত সুরকে দুর্বল করে সমগ্র অঞ্চলকে পৌত্তলিকতা ও বৈদেশিক সাম্রাজ্যিক আগ্রাসনের নির্মম শিকারে পরিণত করে।
অধ্যায় ১: শেকেমের ঐতিহাসিক সম্মেলন এবং রাজতন্ত্রের দ্বিখণ্ডায়ন
হযরত সুলাইমান (আ.)-এর তিরোধানের পর তাঁর পুত্র রেহবিয়াম (Rehoboam) সমগ্র বনি ইসরাইলের চতুর্থ বাদশাহ হিসেবে অভিষিক্ত হওয়ার উদ্যোগ নেন। তবে এই ক্ষমতা হস্তান্তর কোনো মসৃণ আনুষ্ঠানিকতা ছিল না। অতীতে সুলাইমান (আ.) সমগ্র দেশকে বারোটি প্রশাসনিক অঞ্চলে বিভক্ত করেছিলেন, যার প্রতিটি অঞ্চল বছরে এক মাস রাজদরবারের বিপুল ব্যয়ভার বহন করত। কিন্তু বাদশাহর নিজস্ব যিহূদা গোত্র এই বাধ্যতামূলক করের চাপ থেকে অনেকটাই মুক্ত ছিল। এই আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বৈষম্য উত্তরের দশটি গোত্রের মনে গভীর বঞ্চনাবোধের জন্ম দিয়েছিল। ফলে দক্ষিণের যিহূদা গোত্র রেহবিয়ামকে দ্রুত সমর্থন জানালেও উত্তরের দশটি গোত্র তাৎক্ষণিক আনুগত্য দিতে সরাসরি অস্বীকার করে।
উত্তরের গোত্রপ্রধানেরা দাবি জানান যে নতুন বাদশাহকে তাদের ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন কেন্দ্র শেকেমে (বর্তমান নাবলুস) এসে সরাসরি আলোচনায় বসতে হবে। শেকেম ছিল সেই ঐতিহাসিক পুণ্যভূমি, যেখানে অতীতে জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ.) ও হযরত ইয়াকুব (আ.) বেদি নির্মাণ করেছিলেন এবং হযরত ইউশা ইবনে নুন (আ.) তাওহিদের জাতীয় অঙ্গীকার নবায়ন করেছিলেন। উত্তরের অসন্তুষ্ট মানুষদের নেতৃত্ব দিতে মিশর থেকে ফিরে আসেন যারবিয়াম ইবনে নাবাত (Jeroboam son of Nebat)। যারবিয়াম ছিলেন এফ্রাহিম গোত্রের এক অত্যন্ত দক্ষ প্রকৌশলী ও সাবেক রাজকীয় কর্মকর্তা। অতীতে সুলাইমান (আ.) জেরুজালেমের মিল্লো প্রতিরক্ষা প্রাচীর সংস্কারকালে যারবিয়ামের কর্মদক্ষতা প্রত্যক্ষ করে তাঁকে উত্তরের সমস্ত বাধ্যতামূলক শ্রমদলের প্রধান তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করেছিলেন।
শ্রমজীবী মানুষের ওপর অতিরিক্ত নির্যাতন দেখে যারবিয়াম ইতিপূর্বে বিদ্রোহের পরিকল্পনা করেছিলেন। সেই সময় পয়গম্বর আহিয়া শিলোনী নিজের পরিধেয় নতুন চাদর বারো টুকরো করে দশ টুকরো যারবিয়ামকে দিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে আল্লাহ তাঁকে উত্তরের দশ গোত্রের শাসক বানাবেন। এই খবর জানতে পেরে সুলাইমান (আ.) তাঁকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিলে যারবিয়াম মিশরে পালিয়ে যান এবং ফারাও শিশাকের (প্রথম শেশোঙ্ক) আশ্রয়ে অবস্থান নেন। সুলাইমান (আ.)-এর ওফাতের সংবাদে যারবিয়াম স্বদেশে ফেরেন এবং শেকেমে সমবেত জাতীয় প্রতিনিধিদলের প্রধান মুখপাত্র নির্বাচিত হন।
খ্রিষ্টপূর্ব ৯৩১ অব্দে শেকেমের রাজকীয় সম্মেলনে রেহবিয়াম উপস্থিত হলে যারবিয়াম ও গোত্রপ্রধানেরা একটি সুনির্দিষ্ট ও ন্যায়সঙ্গত দাবি পেশ করেন। তারা বলেন যে পিতা সুলাইমান প্রাসাদ, দুর্গ ও মন্দির নির্মাণের জন্য প্রজাদের ওপর অসহনীয় কর ও বাধ্যতামূলক বেগার শ্রমের জোয়াল চাপিয়ে দিয়েছিলেন। রেহবিয়াম যদি সেই করের বোঝা লাঘব করেন এবং সুবিচার প্রতিষ্ঠা করেন, তবে তারা সানন্দে তাঁকে সমগ্র দেশের বাদশাহ হিসেবে গ্রহণ করবে।
এই দাবিতে রেহবিয়াম তিন দিনের সময় চেয়ে নেন। সংকট নিরসনে তিনি প্রথমে তাঁর পিতা সুলাইমানের বিজ্ঞ প্রবীণ উপদেষ্টাদের সাথে পরামর্শ করেন। এই অভিজ্ঞ প্রবীণ statesmen অত্যন্ত বাস্তববাদী উপদেশ দেন। তারা বলেন যে রাজনীতি কোনো বলপ্রয়োগের ক্ষেত্র নয়, বরং প্রজাকল্যাণই রাজার প্রধান ধর্ম। বাদশাহ যদি আজ বিনয়ী হয়ে জনগণের সেবকের ভূমিকা নেন এবং সহানুভূতির ভাষায় কথা বলেন, তবে জাতি আজীবন তাঁর অনুগত থাকবে।
কিন্তু উদ্ধত রেহবিয়াম প্রবীণদের সেই প্রজ্ঞাময় উপদেশ অবজ্ঞা করেন। তিনি রাজপ্রাসাদে তাঁর সাথে বেড়ে ওঠা তরুণ বন্ধুদের সাথে পরামর্শ করেন। এই অপরিণামদর্শী তরুণেরা বাদশাহকে চরম দমননীতির প্ররোচনা দেয়। তারা দাবি করে যে শুরুতেই নতিস্বীকার করলে রাজকীয় মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হবে; অতএব বাদশাহর উচিত লৌহকঠিন ভীতি সৃষ্টি করা। তিন দিন পর যখন সমগ্র সমাবেশ সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় দাঁড়াল, তখন রেহবিয়াম অহংকারে অন্ধ হয়ে নিষ্ঠুর বক্তব্য দিলেন। তিনি ঘোষণা করলেন যে আমার কনিষ্ঠ আঙুল আমার পিতার কোমর অপেক্ষা অধিক স্থূল। আমার পিতা যদি ভারী জোয়াল চাপিয়ে থাকেন, তবে আমি তা আরও দ্বিগুণ করব। আমার পিতা তোমাদের সাধারণ চাবুক দিয়ে শাসন করেছিলেন, কিন্তু আমি তোমাদের লোহার কাঁটাযুক্ত বিষাক্ত বিচ্ছু চাবুক দিয়ে শাসন করব।
এই অবমাননাকর ঘোষণায় শেকেমের প্রাঙ্গণে তীব্র বিস্ফোরণ ঘটে। শতাব্দীর পুঞ্জীভূত ক্ষোভ তাৎক্ষণিক বিদ্রোহে রূপ নেয়। উত্তরের প্রতিনিধিরা আনুগত্য প্রত্যাহার করে বিখ্যাত ঐতিহাসিক স্লোগান তোলে: দাউদের সাথে আমাদের কী সম্পর্ক, আর যিশয়ের পুত্রের সম্পত্তিতে আমাদের কী অংশ? হে ইসরাইল, যে যার তাঁবুতে ফিরে যাও! রেহবিয়াম পরিস্থিতি সামলাতে তাঁর রাজস্ব ও বাধ্যতামূলক শ্রম বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা আদোরামকে পাঠালে বিক্ষুব্ধ জনতা পাথর ছুড়ে তাঁকে হত্যা করে। প্রাণভয়ে ভীত রেহবিয়াম রথে চড়ে দ্রুত জেরুজালেমে পলায়ন করেন। এভাবে শাসকের দম্ভের কারণে ঐক্যবদ্ধ রাজতন্ত্র চিরতরে দ্বিখণ্ডিত হয়।
অধ্যায় ২: উত্তর রাজ্য ইসরায়েল: যারবিয়ামের স্বর্ণের বাছুর এবং ধর্মীয় বিচ্যুতির সূচনা
শেকেম সম্মেলনের পতনের পর উত্তরের দশটি গোত্র (রেউবেন, শিময়োন, ইসাখার, সবূলূন, দান, নপ্তালি, গাদ, আশের, এফ্রাহিম ও মনাতসে) একত্রিত হয়ে নতুন স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। এই রাষ্ট্রের নাম রাখা হয় 'ইসরায়েল রাজ্য' (Kingdom of Israel), যা প্রধান গোত্রের পরিচয়ে প্রায়শই 'এফ্রাহিম' নামেও পরিচিত হতো। খ্রিষ্টপূর্ব ৯৩১ অব্দে দশ গোত্রের নেতারা যারবিয়াম ইবনে নাবাতকে উত্তর রাজ্যের প্রথম বাদশাহ হিসেবে অভিষিক্ত করেন। ভৌগোলিক বিস্তার, উর্বর কৃষিজমি এবং জনসংখ্যার দিক থেকে উত্তর রাজ্য ছিল দক্ষিণের চেয়ে বহুগুণে শক্তিশালী। যারবিয়াম শেকেম নগরীর প্রাচীর পুনর্নির্মাণ করে প্রাথমিক রাজধানী বানান; পরবর্তীতে জর্ডান নদীর পূর্বে পেনুয়েল দুর্গ এবং পশ্চিমে তিরসাতে রাজধানী স্থানান্তরিত হয়। পরিশেষে রাজা ওমরি কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত সুরম্য শমরিয়া (Samaria) নগরীতে তা স্থায়ী রূপ নেয়।
সিংহাসনে বসার পর যারবিয়ামের সামনে এক গভীর ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়। রাজনৈতিকভাবে দশ গোত্র স্বাধীন হলেও মানুষের অন্তরে জেরুজালেমের বায়তুল মুকাদ্দাসের আধ্যাত্মিক টান অটুট ছিল। তাওরাতের শরিয়ত অনুসারে প্রতি বছর তিনটি প্রধান বাৎসরিক উৎসবে প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক ইসরাইলি নাগরিকের জন্য জেরুজালেমের মূল উপাসনালয়ে সমবেত হওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। যারবিয়াম শঙ্কার সাথে ভাবলেন যে প্রজারা যদি নিয়মিত দক্ষিণের রাজধানী জেরুজালেমে যায়, তবে বায়তুল মুকাদ্দাসের পবিত্রতা ও দাউদ বংশের মহিমা তাদের মনে পুরনো ভক্তি জাগিয়ে তুলবে। এর ফলে তারা পুনরায় দাউদ রাজবংশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে তাঁকে সিংহাসনচ্যুত করতে পারে।
এই রাজনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা দূর করতে যারবিয়াম এক মারাত্মক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেন। তিনি নিখাদ তাওহিদকে জলাঞ্জলি দিয়ে ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে বিকৃত করেন। অতীতে সিনাই প্রান্তরে সামেরীর তৈরি স্বর্ণের বাছুরের মতো তিনিও সোনা গলিয়ে দুটি সুবিশাল স্বর্ণের বাছুর (Golden Calves) নির্মাণ করেন। এরপর একটি স্বর্ণের বাছুর তিনি স্থাপন করেন রাজ্যের দক্ষিণ সীমান্তে বৈথেলে (Bethel), যা জেরুজালেমের প্রবেশপথে অবস্থিত ছিল; আর অপরটি স্থাপন করেন সুদূর উত্তর সীমান্তে অবস্থিত দান (Dan) নগরীতে।
স্বর্ণের বাছুর প্রতিষ্ঠা করে যারবিয়াম ঘোষণা করেন: হে ইসরাইল, জেরুজালেমে যাওয়া তোমাদের জন্য অতিরিক্ত কষ্টসাধ্য। দেখ, এই হলো তোমাদের সেই উপাস্য দেবতা, যারা তোমাদের মিশর থেকে মুক্ত করেছিল! তিনি সেখানে বিকল্প বেদি, উৎসব ও ধূপদানের প্রথা চালু করেন। এমনকি শরিয়তসম্মত লেবি গোত্রকে পাশ কাটিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্য থেকে নিজের অনুগতদের পুরোহিত পদে বসান।
ইতিহাসে এই জঘন্য নীতি 'যারবিয়ামের মহাপাপ' নামে কুখ্যাত হয়। যে নিষ্ঠাবান লেবি পুরোহিত ও আল্লাহভীরু বিশ্বাসীরা এই পৌত্তলিকতা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, তাদেরকে উত্তর রাজ্য থেকে নির্মমভাবে বিতাড়িত করা হয়। তারা সহায়-সম্পদ ছেড়ে দক্ষিণের জুদাহ রাজ্যে হিজরত করেন। এমনকি যে পয়গম্বর আহিয়া শিলোনী অতীতে যারবিয়ামকে বাদশাহ হওয়ার সুসংবাদ দিয়েছিলেন, তিনিও পরবর্তীকালে যারবিয়ামের চরম শিরকের কারণে তাঁর বংশের ভয়াবহ ধ্বংসের ঐশী অভিশাপ ঘোষণা করেন।
ধর্মীয় এই বিচ্যুতির ফলে উত্তর রাজ্য চরম রাজনৈতিক অস্থিরতায় নিমজ্জিত হয়। দুই শতকের ইতিহাসে সেখানে কোনো স্থিতিশীল রাজবংশ গড়ে ওঠেনি। একের পর এক নয়টি ভিন্ন রাজবংশ ক্ষমতায় আসে এবং উনিশ জন রাজার মধ্যে আটজনই রক্তাক্ত সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন। পরবর্তীকালে রাজা আহাবের সময় এই পৌত্তলিকতা আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। আহাব ফিনিশীয় বন্দর টায়ারের রাজকুমারী ইজেবেলকে বিবাহ করলে ফিনিশীয় দেবতা বালের (Baal) পূজা রাষ্ট্রীয় রূপ পায়। শমরিয়ায় বালের সুরম্য মন্দির নির্মাণ করা হয় এবং তাওহিদের নবী ও একনিষ্ঠ বিশ্বাসীদের নির্বিচারে হত্যা করা শুরু হয়। এই ঘোর অন্ধকারে তাওহিদের আলো জ্বালাতে আবির্ভূত হন পয়গম্বর হযরত ইলিয়াস (আ.) এবং হযরত আল-ইয়াসা (আ.)। কারমেল পর্বতে ইলিয়াস (আ.)-এর অলৌকিক সত্যের বিজয় সত্ত্বেও উত্তর রাজ্যের শাসকশ্রেণি শিরক ও বিভ্রান্তির পথ পরিহার করেনি।
অধ্যায় ৩: দক্ষিণ রাজ্য জুদাহ: দাউদ বংশের ধারাবাহিকতা এবং ফারাও শিশাকের অভিযান
উত্তরের দশটি গোত্র বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর দক্ষিণের পাহাড়ি অঞ্চলে গড়ে ওঠে 'জুদাহ রাজ্য' (Kingdom of Judah)। এই রাজ্যের ভৌগোলিক পরিধি সীমাবদ্ধ ছিল মূলত প্রধান যিহূদা এবং ক্ষুদ্র বেনিয়ামিন গোত্রের ভূখণ্ডে। আয়তনে ছোট হলেও জুদাহ রাজ্যের হাতে ছিল দুটি অনন্য আধ্যাত্মিক সম্পদ। প্রথমত, তাদের রাজধানী ছিল বিশ্ব তাওহিদের পবিত্র তীর্থ জেরুজালেম এবং মোরিয়া পাহাড়ে অবস্থিত সুলাইমান (আ.)-এর বায়তুল মুকাদ্দাস, যেখানে সংরক্ষিত ছিল তাবুতুস সাকিনাহ। দ্বিতীয়ত, জুদাহ রাজ্যে বহাল ছিল হযরত দাউদ (আ.)-এর রাজবংশের ধারাবাহিকতা। উপরন্তু উত্তর থেকে বিতাড়িত লেবি পুরোহিত ও খোদাভীরু মুমিনদের আগমনে জুদাহর নৈতিক শক্তি সুসংহত হয়।
জেরুজালেমে ফিরে রেহবিয়াম ক্ষমতা পুনরুদ্ধারে মরিয়া হয়ে ওঠেন। তিনি যিহূদা ও বেনিয়ামিন থেকে এক লক্ষ আশি হাজার সৈন্যের বিশাল বাহিনী প্রস্তুত করেন, যাতে বলপ্রয়োগে উত্তরের গোত্রগুলোকে দমন করা যায়। কিন্তু রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ শুরুর পূর্বমুহূর্তে আল্লাহর প্রত্যাদেশ নিয়ে আসেন পয়গম্বর শেমায়াহ (Shemaiah)। তিনি বাদশাহ ও সৈন্যদের উদ্দেশে ঘোষণা করেন: তোমরা তোমাদের ভাইদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাবে না; নিজ নিজ ঘরে ফিরে যাও, কারণ এই বিভাজন আল্লাহর নির্ধারিত। রেহবিয়াম ও তাঁর বাহিনী এই ঐশী নির্দেশ মেনে অভিযান স্থগিত করেন। এতে তাৎক্ষণিক রক্তপাত বন্ধ হলেও দুই রাজ্যের সীমান্তে দীর্ঘকাল ধরে শীতল যুদ্ধ ও সংঘাত জারি থাকে।
গৃহযুদ্ধ স্থগিত করে রেহবিয়াম রাজ্যের প্রতিরক্ষা জোরদারে মনোযোগ দেন। তিনি জুদাহ ও বেনিয়ামিনের পাহাড়ে পনেরোটি সুরক্ষিত দুর্গনগরী নির্মাণ করেন। এগুলোর মধ্যে বেথলেহেম, এতাম, তকোয়াহ, লখিশ, আজিকাহ ও হেবরন অন্যতম। তিনি এই দুর্গগুলোতে প্রচুর খাদ্য, জলপাই তেল ও অস্ত্র মজুত করেন। প্রথম তিন বছর রাজ্যটি শরিয়তের অনুশাসনে পরিচালিত হওয়ায় জুদাহে শান্তি বজায় ছিল।
কিন্তু কিছুটা স্থিতিশীলতা অর্জনের পরেই রেহবিয়াম ও জুদাহর সমাজ নৈতিক অবক্ষয়ে জড়িয়ে পড়ে। রাজদরবারে বিজাতীয় সংস্কৃতি, পাহাড়ের চূড়ায় পৌত্তলিক স্তম্ভ ও বেদি নির্মাণের হিড়িক পড়ে যায়। তাওহিদের বিশুদ্ধতা ক্ষুণ্ণ হলে ঐশী নিয়মে এর পার্থিব পরিণতি নেমে আসে। রেহবিয়ামের রাজত্বের পঞ্চম বর্ষে, খ্রিষ্টপূর্ব ৯২৫ অব্দে, মিশর থেকে নেমে আসে পরাক্রমশালী সাম্রাজ্যিক আক্রমণ। মিশরের দ্বাবিংশতি লিবীয় রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ফারাও প্রথম শেশোঙ্ক (বাইবেলে যিনি শিশাক বা Shishak নামে খ্যাত) বিশাল বাহিনী নিয়ে ফিলিস্তিনে প্রবেশ করেন।
এই আক্রমণকারী সেনাদলে ছিল বারোশত যুদ্ধরথ, ষাট হাজার অশ্বারোহী এবং বিপুল পদাতিক সৈন্য। বিভক্ত ও দুর্বল ইসরাইলের সুযোগ নিয়ে ফারাও তাঁর সাম্রাজ্যিক আধিপত্য বিস্তার করতে চেয়েছিলেন। শিশাকের অপ্রতিরোধ্য বাহিনী জুদাহর সুরক্ষিত সীমান্ত দুর্গগুলো একের পর এক গুঁড়িয়ে দেয়। লখিশ ও হেবরনের পতন ঘটিয়ে মিশরীয় সেনারা সরাসরি জেরুজালেম অবরুদ্ধ করে। চরম বিপদে পয়গম্বর শেমায়াহ বাদশাহকে জানান যে তোমরা আল্লাহকে ত্যাগ করেছিলে, তাই আল্লাহ তোমাদের শিশাকের হাতে সঁপে দিয়েছেন।
মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে রেহবিয়াম ও জুদাহর নেতারা নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে সিজদায় লুটিয়ে পড়েন। তাদের বিনম্র তওবার কারণে শহরটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হওয়া থেকে রক্ষা পায়। তবে ফারাও শিশাক বায়তুল মুকাদ্দাস ও রাজপ্রাসাদের সমস্ত সুবর্ণ ভাণ্ডার লুণ্ঠন করেন। সুলাইমান (আ.)-এর নির্মিত তিনশত খাঁটি সোনার যুদ্ধঢাল তিনি মিশরে নিয়ে যান। পরবর্তীতে রাজকীয় পাহারার জন্য রেহবিয়াম সোনার বদলে নিকৃষ্ট তামার ঢাল তৈরি করতে বাধ্য হন। এটি ছিল জুদাহর জন্য চরম ঐতিহাসিক শিক্ষা: কীভাবে তাওহিদ বিসর্জনের ফলে সুলাইমানি স্বর্ণযুগ মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে তামার যুগে পরিণত হয়েছিল। শিশাকের এই লুণ্ঠনের পর জুদাহ মিশরের দুর্বল করদ রাজ্যে পরিণত হয়।
অধ্যায় ৪: ভূরাজনৈতিক সংঘাত, প্রত্নতাত্ত্বিক সাক্ষ্য এবং ইতিহাসের চিরন্তন শিক্ষা
সুলাইমান (আ.)-এর পরবর্তী এই বিভাজন সমগ্র ফিলিস্তিন ও লেভান্ত অঞ্চলের ভারসাম্যে দীর্ঘমেয়াদী বিপর্যয় ডেকে আনে। একটি ঐক্যবদ্ধ সাম্রাজ্য যখন দুটি ক্ষুদ্র দুর্বল রাজ্যে পরিণত হলো, তখন বহিরাগত সাম্রাজ্যগুলোর জন্য ফিলিস্তিন উন্মুক্ত চারণভূমিতে রূপ নিল। উত্তরে অরাম-দামেস্কের আরামীয়রা বারবার ইসরায়েলে আক্রমণ চালাতে থাকে। দক্ষিণ থেকে মিশর এবং পূর্ব থেকে মোয়াব ও আম্মোন স্বাধীনতা ঘোষণা করে। সবচেয়ে মারাত্মক ছিল, ভাইয়ে ভাইয়ে এই আত্মঘাতী সংঘাত জাতিকে সামরিকভাবে এতটাই নিঃস্ব করে যে পরবর্তীতে পূর্বের পরাক্রমশালী নব্য-আসিরীয় সাম্রাজ্যের আগ্রাসন ঠেকানো তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে।
আধুনিক প্রত্নতত্ত্ব খ্রিষ্টপূর্ব দশম শতকের এই ঐতিহাসিক বিভাজন ও ফারাও শিশাকের অভিযানকে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করেছে। সবচেয়ে প্রামাণ্য দলিলটি রয়েছে মিশরের লাক্সরে অবস্থিত কার্নাক মন্দিরে (Temple of Karnak)। কার্নাক মন্দিরের আমুন চত্বরের দক্ষিণ প্রাচীরে সুবিশাল 'বুবাস্তাইট প্রবেশদ্বারে' (Bubastite Portal) শিশাকের অভিযানের স্মারক খোদাই করা আছে। সেখানে দেবতা আমুনের সম্মুখে একশত পঞ্চাশটিরও বেশি বিজিত এশীয় শহরের তালিকা রয়েছে।
তালিকায় ফিলিস্তিনের মেগিদ্দো, রেহব, তাআনাক, বৈত-শিয়ান ও নেগেভের বহু দুর্গের নাম অবিকল শনাক্ত করা হয়েছে। উত্তর ফিলিস্তিনের তেল মেগিদ্দোতে শিশাকের স্মারক স্তম্ভের মূল খণ্ড আবিষ্কৃত হয়েছে, যা মিশরীয় অভিযানের ঐতিহাসিক সত্যতা নিশ্চিত করে। বর্তমান নাবলুসের পূর্ব প্রান্তে তেল বালাতা (Tell Balata) নামক স্থানে প্রাচীন শেকেম নগরীর খননে দশম শতকের সুদৃঢ় প্রাচীর ও প্রশাসনিক ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে, যা যারবিয়ামের প্রাথমিক রাজধানী নির্মাণের স্তরকে সমর্থন করে।
উত্তর রাজ্যের ধর্মীয় বিচ্যুতির অকাট্য প্রমাণ মিলেছে তেল দান (Tel Dan) নগরীতে। প্রত্নতাত্ত্বিক খননে সেখানে খ্রিষ্টপূর্ব দশম শতকের এক সুবিশাল উন্মুক্ত উপাসনালয় চত্বর বা 'হাই প্লেস' আবিষ্কৃত হয়েছে। সেখানে হলুদ চুনাপাথরের সুবিশাল বেদির ভিত্তি, ধাতব ধূপদানি ও পুরোহিতদের কক্ষ উন্মোচিত হয়েছে। এই স্থাপত্যটি ছিল যারবিয়াম কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত স্বর্ণের বাছুরের সেই বিকল্প কেন্দ্র, যা বনি ইসরাইলকে বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিল।
এই ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি মানবজাতির জন্য চিরন্তন শিক্ষা বহন করে। প্রথমত, কোনো জাতির ঐক্যের ভিত্তি নিছক বাহ্যিক সমৃদ্ধি বা সামরিক শক্তি নয়; বরং তার মূল হলো ইনসাফ, প্রজা সাধারণের সেবা ও খোদাভীতি। পিতা সুলাইমান (আ.) যে ঐশী দায়িত্ব পালন করেছিলেন, পুত্র রেহবিয়াম তাকে অহংকারের হাতিয়ার বানিয়েছিলেন। শাসকের কণ্ঠে যখন সেবার বদলে নিপীড়ন ও চাবুকের আস্ফালন উচ্চারিত হয়, তখন ঐক্যের বন্ধন ধূলিসাৎ হয়ে যায়।
দ্বিতীয়ত, যারবিয়ামের পরিণতি রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্ম বিকৃতির ভয়াবহ সতর্কবার্তা। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে যারা সমাজে শিরক ও মিথ্যা উপাসনা প্রতিষ্ঠা করে, তারা সাময়িক সিংহাসন পেলেও জাতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। যারবিয়ামের স্বর্ণের বাছুর উত্তর ইসরায়েলকে এমন আত্মিক ক্ষয়ে ফেলেছিল, যার পরিণতিতে মাত্র দুই শতক পর আসিরীয়দের নির্মম আঘাতে তাদের সম্পূর্ণ অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়। ফিলিস্তিনের ইতিহাস প্রমাণ করে যে ঐশী বরকতকে অহংকার ও বিভ্রান্তির মাধ্যমে নষ্ট করলে পরিণতি হয় বিভাজন ও চরম দাসত্ব।
উত্তর রাজ্য (ইসরায়েল) বনাম দক্ষিণ রাজ্য (জুদাহ): তুলনামূলক ঐতিহাসিক রূপরেখা
| রাজনৈতিক ও কৌশলগত ক্ষেত্র | উত্তর রাজ্য: ইসরায়েল (এফ্রাহিম) | দক্ষিণ রাজ্য: জুদাহ (যিহূদা) | ঐতিহাসিক ও কুরআনিক তাৎপর্য |
|---|---|---|---|
| গোত্রীয় বিন্যাস ও জনসংখ্যা | দশটি প্রধান গোত্র (রেউবেন, দান, নপ্তালি ইত্যাদি); সংখ্যাগরিষ্ঠ জনবল | দুটি গোত্র (যিহূদা ও বেনিয়ামিন) এবং অনুগত লেবি পুরোহিত সম্প্রদায় | সংখ্যাধিক্যের চেয়ে আদর্শিক নিষ্ঠার স্থায়িত্ব ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী হয় |
| ঐতিহাসিক রাজধানীসমূহ | প্রথমে শেকেম, পরবর্তীতে তিরসা এবং পরিশেষে ওমরি প্রতিষ্ঠিত শমরিয়া | একক ও অবিচল কেন্দ্র: পবিত্র জেরুজালেম (বায়তুল মুকাদ্দাস / কুদস) | কেন্দ্রীয় উপাসনালয়ের মর্যাদা কুদসকে অনন্য রাজনৈতিক স্থায়িত্ব দেয় |
| শাসনক্ষমতা ও রাজবংশ | চরম অস্থিতিশীলতা: নয়টি ভিন্ন রাজবংশ, ঘন ঘন সামরিক অভ্যুত্থান ও হত্যা | স্থিতিশীল ধারাবাহিকতা: একমাত্র অবিচ্ছিন্ন হযরত দাউদ (আ.)-এর রাজবংশ | ঐশী অঙ্গীকারের ছায়াতলে থাকা রাজবংশ কৃত্রিম অভ্যুত্থানের চেয়ে টেকসই হয় |
| ধর্মীয় ও আত্মিক নীতি | বৈথেল ও দানে স্বর্ণের বাছুর প্রতিষ্ঠা, অ-লেবি পুরোহিত ও বালের পূজা | বায়তুল মুকাদ্দাসে অঙ্গীকার সিন্দুক সংরক্ষণ এবং তাওহিদের শরিয়ত পালন | রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মের বিকৃতি সমগ্র জাতিকে শিরকের অন্ধকারে ডোবায় |
| অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক শক্তি | উর্বর সমভূমি, বিস্তৃত বাণিজ্যপথ এবং বিপুল কৃষিজাত উৎপাদনের প্রাচুর্য | পাথুরে পাহাড়ি অঞ্চল, সীমিত চারণভূমি ও তুলনামূলক শুষ্ক পরিবেশ | পার্থিব প্রাচুর্য সত্ত্বেও আত্মিক অবক্ষয়ের কারণে উত্তরের পতন আগে ঘটে |
| প্রথম সাম্রাজ্যিক আঘাত | আরাম-দামেস্কের ধারাবাহিক আক্রমণ ও ফারাও শিশাকের লুণ্ঠন | ফারাও শিশাকের হাতে সীমান্ত দুর্গ ধ্বংস ও বায়তুল মুকাদ্দাসের সম্পদহরণ | অভ্যন্তরীণ বিভাজন সর্বদা বহিরাগত সাম্রাজ্যিক আগ্রাসনের পথ উন্মুক্ত করে |
রাজতন্ত্রের বিভাজন ও সংঘাতের ঐতিহাসিক কার্যকারণ
আমরা কী শিখলাম?
১. রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হলো প্রজাদের প্রতি দয়া, সুবিচার ও কল্যাণকামী সেবা; উদ্ধত অহংকার শতবর্ষের জাতীয় ঐক্যকে মুহূর্তেই চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়।
২. অভিজ্ঞ প্রবীণদের সুচিন্তিত প্রজ্ঞাকে অগ্রাহ্য করে চাটুকার ও অপরিপক্ব তরুণদের পরামর্শ গ্রহণ করা যেকোনো নেতার পতনের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
৩. রাজনৈতিক ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করার উদ্দেশ্যে ধর্মীয় বিশ্বাসকে বিকৃত করা এবং সমাজে মিথ্যা আদর্শ প্রতিষ্ঠা করা জাতির আত্মিক ধ্বংস ডেকে আনে।
৪. ভ্রাতঘাতী অভ্যন্তরীণ সংঘাত সর্বদা বাইরের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসী শক্তির পথ প্রশস্ত করে, যার ফলে উভয় পক্ষকেই স্বাধীনতা ও জাতীয় সম্পদ হারাতে হয়।
৫. বাহ্যিক ধনসম্পদের প্রাচুর্য কখনোই জাতির স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে পারে না; তাওহিদ ও নৈতিকতা বিসর্জন দিলে স্বর্ণযুগ দ্রুত তামার যুগের গ্লানিতে পর্যবসিত হয়।
উপসংহার
হযরত সুলাইমান (আ.)-এর মহিমান্বিত স্বর্ণযুগের পর ইসরায়েল ও জুদাহ রাজ্যের এই বিভাজন মানব ইতিহাসের অন্যতম গভীর ট্র্যাজেডি। শেকেমের প্রান্তরে রেহবিয়ামের একটিমাত্র অহংকারী বাক্য শতাব্দীর ঐক্যকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল। একদিকে উত্তরে যারবিয়ামের স্বর্ণের বাছুর ও পরবর্তী ওমরি-আহাব যুগের বালের পৌত্তলিকতা জাতিকে আত্মিকভাবে পঙ্গু করে দেয়; অন্যদিকে দক্ষিণে ফারাও শিশাকের লুণ্ঠন বায়তুল মুকাদ্দাসের সুবর্ণ আভিজাত্যকে ম্লান করে দেয়।
এই রাজনৈতিক ও আত্মিক শূন্যতাই পরবর্তী শতাব্দীতে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে এক প্রলয়ংকরী পরাশক্তির উত্থানকে অবধারিত করে তোলে। মেসোপটেমিয়ার টাইগ্রিস তীরবর্তী নিনেভে থেকে ধেয়ে আসা নিষ্ঠুর নব্য-আসিরীয় সাম্রাজ্যের রণরথ কীভাবে বিভক্ত উত্তর রাজ্যের ওপর আঘাত হানবে, কীভাবে শমরিয়ার পতন ঘটবে এবং হারিয়ে যাওয়া দশ গোত্রের অবলুপ্তি সাধিত হবে, তা অনুধাবন করাই এই ঐতিহাসিক ধারাক্রমের পরবর্তী পর্বের মূল প্রতিপাদ্য।
নিজেকে যাচাই করুন
এই লেখার কুইজ
খ্রিষ্টপূর্ব আনুমানিক ৯৩১ অব্দে হযরত সুলাইমান (আ.)-এর ওফাতের পর বনি ইসরাইলের বারোটি গোত্রের ঐতিহাসিক জাতীয় সম্মেলন কোন প্রাচীন শহরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল?
খ্রিষ্টপূর্ব দশম শতকে শেকেম সম্মেলনে রেহবিয়ামের কাছে উত্তরের দশটি গোত্রের প্রধান প্রতিনিধি হিসেবে কর ও বেগার শ্রম লাঘবের দাবি কে উত্থাপন করেছিলেন?
খ্রিষ্টপূর্ব দশম শতকে শেকেমের সম্মেলনে প্রবীণ বিজ্ঞ পারিষদেরা নতুন বাদশাহ রেহবিয়ামকে জনগণের সাথে কী ধরনের আচরণ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন?
শেকেম সম্মেলনে অহংকারী রেহবিয়াম তাঁর পিতার সাধারণ চাবুকের শাসনের বিপরীতে প্রজাদের কী দিয়ে শাসন করার ঔদ্ধত্যপূর্ণ হুমকি দিয়েছিলেন?
খ্রিষ্টপূর্ব দশম শতকে উত্তর রাজ্য ইসরায়েলের বাদশাহ যারবিয়াম প্রজাদের জেরুজালেমে যাওয়া ঠেকাতে কোন দুটি স্থানে স্বর্ণের বাছুর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন?
খ্রিষ্টপূর্ব দশম শতকে রেহবিয়াম যখন উত্তরের বিরুদ্ধে এক লক্ষ আশি হাজার সৈন্য নিয়ে গৃহযুদ্ধের প্রস্তুতি নেন, তখন কোন পয়গম্বর এসে আল্লাহর নির্দেশে যুদ্ধ বন্ধ করেন?
খ্রিষ্টপূর্ব ৯২৫ অব্দে রেহবিয়ামের রাজত্বের পঞ্চম বর্ষে মিশরের কোন পরাক্রমশালী ফারাও জেরুজালেম আক্রমণ করে বায়তুল মুকাদ্দাসের সুবর্ণ ভাণ্ডার লুণ্ঠন করেন?
মিশরের লাক্সরে অবস্থিত কোন ঐতিহাসিক স্থাপত্যের গায়ে খ্রিষ্টপূর্ব দশম শতকে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ফারাও শিশাকের সামরিক অভিযানের বিজিত নগরসমূহের প্রামাণ্য তালিকা খোদাই করা আছে?
এই বিষয়ের কুইজ চ্যালেঞ্জ
কানআন থেকে গাজা কুইজে যান