২ নভেম্বর, ২০২৬ এ ৬:০০ AM
কানআন থেকে গাজাপর্ব ১২: হযরত সুলাইমান (আ.)-এর স্বর্ণযুগ এবং বাইতুল মুকাদ্দাস নির্মাণ: ঐশী প্রজ্ঞা, অতুলনীয় সাম্রাজ্য ও পবিত্র গৃহের প্রতিষ্ঠা

"আর আমি সুলাইমানের অধীন করে দিয়েছিলাম বায়ুকে, যা সকালে এক মাসের পথ এবং সন্ধ্যায় এক মাসের পথ অতিক্রম করত; আর আমি তার জন্য গলিত তামার ঝরনা প্রবাহিত করেছিলাম। আর তার রবের আদেশে জিনদের একদল তার সম্মুখে কাজ করত..."
— পবিত্র কুরআন, সূরা সাবা: ১২
অধ্যায় ১: সুলাইমান (আ.)-এর অভিষেক, ঐশী প্রজ্ঞা এবং তুলনাহীন রাজত্ব
খ্রিষ্টপূর্ব দশম শতকের মধ্যভাগে পিতা হযরত দাউদ (আ.)-এর ওফাতের পর কানআন ভূখণ্ডের ঐক্যবদ্ধ সিংহাসনে আরোহণ করেন ইতিহাসের অন্যতম বিজ্ঞ ও মহিমান্বিত পয়গম্বর হযরত সুলাইমান (আ.)। খ্রিষ্টপূর্ব আনুমানিক ৯৭০ অব্দে মাত্র বিশ বছর বয়সে যখন তিনি সমগ্র বনি ইসরাইলের শাসনভার গ্রহণ করেন, তখন তাঁর সামনে ছিল এক সুসংহত রাজ্য। তবে সুলাইমান (আ.)-এর রাজত্ব নিছক কোনো পার্থিব উত্তরাধিকারের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল না; বরং তা ছিল শৈশব থেকেই পরম করুণাময় আল্লাহ কর্তৃক প্রদত্ত অলৌকিক প্রজ্ঞা, গভীর দূরদর্শিতা এবং বিশেষ ঐশী বরকতের এক অনন্য প্রকাশ।
সূরা আল-আম্বিয়ার ৭৮ ও ৭৯ আয়াতে শৈশবেই সুলাইমান (আ.)-এর বিচারিক প্রতিভার দৃষ্টান্ত আছে। একবার এক ব্যক্তির ছাগলের পাল রাতের আঁধারে অন্যের শস্যক্ষেতে ঢুকে ফসল বিনষ্ট করেছিল। পিতা দাউদ (আ.) সমস্ত ছাগল ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিককে দেওয়ার রায় দিলে কিশোর সুলাইমান এক বিকল্প প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন যে জমির মালিক ছাগলগুলো সাময়িকভাবে নিজের কাছে রাখবে এবং তার দুধ ও পশম ভোগ করবে, আর ছাগলের মালিক ক্ষতিগ্রস্ত জমিটি চাষ করে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে দেবে; জমি প্রস্তুত হলে উভয় পক্ষ নিজ নিজ সম্পদ ফেরত পাবে। পিতা দাউদ (আ.) পুত্রের এই অপূর্ব ইনসাফভিত্তিক সমাধান সানন্দে গ্রহণ করেন। কুরআন ঘোষণা করে যে আল্লাহ স্বয়ং সুলাইমানকে এই সূক্ষ্ম ফয়সালা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন এবং উভয়কেই জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দান করেছিলেন।
ক্ষমতার প্রাথমিক পর্যায়ে হযরত সুলাইমান (আ.) মহান রবের দরবারে যে ঐতিহাসিক মোনাজাত করেছিলেন, তা সূরা সোয়াদের ৩৫ নম্বর আয়াতে অমর হয়ে আছে। তিনি পার্থিব দীর্ঘায়ু না চেয়ে তিনি বিনম্র চিত্তে আরজ করেছিলেন: হে আমার রব! আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমাকে এমন এক রাজত্ব দান করুন, যা আমার পর আর কারও জন্য শোভনীয় হবে না; নিশ্চয়ই আপনি মহান দাতা। পরম করুণাময় আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দার এই আন্তরিক প্রার্থনা কবুল করেন এবং তাঁকে সৃষ্টির ইতিহাসে সম্পূর্ণ নজিরবিহীন সার্বভৌমত্ব ও নিয়ন্ত্রণ দান করেন।
আল্লাহ তাআলা সুলাইমান (আ.)-এর আজ্ঞাবহ করে দিয়েছিলেন প্রবল বায়ুকে। সূরা আল-আম্বিয়ার ৮১ আয়াত এবং সূরা সাবার ১২ আয়াতে বর্ণিত হয়েছে যে বাতাস তাঁর নির্দেশে সকালে এক মাসের পথ এবং সন্ধ্যায় এক মাসের পথ নিমেষের মধ্যে অতিক্রম করত। বিশাল সৈন্যদল ও রসদপত্র নিয়ে তিনি বাতাসের দোলায় চড়ে অতি দ্রুত সাম্রাজ্যের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে গমন করতে পারতেন। ধাতব প্রযুক্তির ক্ষেত্রে আল্লাহ তাঁর জন্য মোমের মতো প্রবাহিত করে দিয়েছিলেন তরল তামার এক অলৌকিক ঝরনা, যা আরবিতে 'আইনাল ক্বিত্বরি' নামে খ্যাত। এই অফুরন্ত গলিত তামা ব্যবহার করে তিনি বিশালাকার পাত্র, দুর্গপ্রাকার ও রাজকীয় স্থাপত্যের ভিত্তি নির্মাণ করেন।
আল্লাহ তাআলা জিন জাতিকে সুলাইমান (আ.)-এর কর্তৃত্বে অর্পণ করেছিলেন। জিনদের এক বিশাল দল তাঁর সামনে গভীর সাগরে ডুব দিয়ে বহুমূল্য মুক্তা ও প্রবাল তুলে আনত এবং সুউচ্চ প্রাসাদ, সুরম্য মসজিদ, বিশালাকার জলাধারের মতো পাত্র ও মাটির সাথে স্থায়ীভাবে স্থাপিত সুবিশাল ডেকচি নির্মাণ করত। অবাধ্য জিনদের জন্য ছিল লোহার শৃঙ্খল ও কঠোর শাস্তির বিধান। এর পাশাপাশি আল্লাহ তাঁকে পশুপাখির ভাষা বা 'মান্তিকাত তাইর' বোঝার ক্ষমতা দান করেন।
সূরা আন-নামলে বর্ণিত পিপীলিকার উপত্যকার ঘটনা তাঁর নবুয়তি বিনয়ের এক অনুপম নিদর্শন। সুলাইমান (আ.) যখন তাঁর বিশাল বাহিনী নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন এক ক্ষুদ্র পিপীলিকা অন্য সঙ্গীদের সতর্ক করে বলেছিল যে তোমরা গর্তে ঢোকো, পাছে সুলাইমান ও তাঁর বাহিনী অজান্তে তোমাদের পিষে ফেলে। এক ক্ষুদ্রতম কীটের এই সচেতন কথা বাতাসের তরঙ্গে শুনতে পেয়ে সুলাইমান (আ.) কোনো দম্ভ প্রকাশ করেননি; বরং তিনি মৃদু হেসে পরম রবের প্রতি কৃতজ্ঞতায় সিজদাবনত হয়েছিলেন। এমন ঐশী বিনয়ই সুলাইমানি স্বর্ণযুগকে মানবতার চিরন্তন আদর্শে রূপান্তর করেছিল।
অধ্যায় ২: মোরিয়া পাহাড়ে বাইতুল মুকাদ্দাস নির্মাণ ও ঐশী উপাসনার প্রতিষ্ঠা
হযরত সুলাইমান (আ.)-এর চল্লিশ বছরের রাজত্বকালের সর্বাধিক গৌরবময় ও কেন্দ্রীয় ঐতিহাসিক অর্জন ছিল পবিত্র জেরুজালেমে 'বাইতুল মুকাদ্দাস' বা প্রথম পবিত্র উপাসনালয় (First Temple) নির্মাণ সম্পন্ন করা। এটি ছিল তাওহিদের সেই শাশ্বত কেন্দ্রবিন্দু, যার স্বপ্ন তাঁর পিতা হযরত দাউদ (আ.) লালন করেছিলেন এবং যার জন্য মোরিয়া পাহাড়ের চূড়ায় আরাউনা জেবুসীয়র গম মাড়াইয়ের পবিত্র প্রান্তরটি ন্যায্য স্বর্ণমুদ্রায় ক্রয় করে রেখেছিলেন। ঐতিহাসিক কালানুক্রম অনুসারে খ্রিষ্টপূর্ব আনুমানিক ৯৬৬ অব্দে, সুলাইমান (আ.)-এর রাজত্বের চতুর্থ বর্ষে এই ঐতিহাসিক মহাযজ্ঞের সূচনা হয়।
নির্মাণকাজের জন্য সুলাইমান (আ.) এক আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। ফোয়েনিশিয়ার সমৃদ্ধ সামুদ্রিক বাণিজ্যনগরী টায়ারের রাজা হিরামের সাথে তাঁর গভীর কূটনৈতিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। রাজা হিরাম লেবাননের পর্বতমালা থেকে সুগন্ধি ও দীর্ঘস্থায়ী দেবদারু কাঠ (Cedar of Lebanon) এবং সাইপ্রেস কাঠ কেটে সাগরে ভাসিয়ে ভেলা আকারে ভূমধ্যসাগর দিয়ে জাফা (বা ইয়াফো) বন্দরে প্রেরণ করেন। সেখান থেকে বিশাল কাঠের গুঁড়িগুলো পাহাড়ি পথ বেয়ে জেরুজালেমের মোরিয়া পাহাড়ে তুলে আনা হতো। একই সাথে ফোয়েনিশিয়ার সুদক্ষ স্থপতি, ব্রোঞ্জশিল্পী ও পাথর কাটার কারিগররা জেরুজালেমে এসে বনি ইসরাইলের কর্মীদের সাথে যৌথভাবে কাজ শুরু করেন।
পবিত্র এই উপাসনালয় নির্মাণের একটি সবচেয়ে অলৌকিক ও ধর্মীয় বৈশিষ্ট্য ছিল তার চরম নিস্তব্ধতা ও পবিত্রতা। ঐতিহাসিক নথিতে বর্ণিত আছে যে মন্দির প্রাঙ্গণে কোনো হাতুড়ি বা লোহার অস্ত্রের শব্দ শোনা যেত না। প্রতিটি বিশালাকার চুনাপাথর খনির গভীরে বা দূরবর্তী খাদানেই নিখুঁত পরিমাপে কেটে মসৃণ করা হতো। এরপর প্রস্তুতকৃত সেই বিশাল পাথরগুলো এনে মোরিয়া পাহাড়ের চূড়ায় কোনো ধাতব শব্দ ছাড়াই কেবল খাঁজে খাঁজে নিঃশব্দে বসিয়ে দেওয়া হতো।
প্রধান ভবনটির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ষাট হাত, প্রস্থ বিশ হাত এবং উচ্চতা ত্রিশ হাত। সমগ্র অভ্যন্তরীণ দেয়াল ও ছাদ সুগন্ধি দেবদারু কাঠে আচ্ছাদিত করা হয়েছিল, যার ওপর কোনো উন্মুক্ত পাথর দৃশ্যমান ছিল না। সেই কাঠের ওপর সোনার পাত দিয়ে মুড়ে দেওয়া হয়েছিল এবং তাতে খোদাই করা হয়েছিল খেজুর গাছ, উন্মুক্ত পুষ্পমঞ্জরি ও স্বর্গীয় প্রাণীর প্রতীক। মন্দিরের সবচেয়ে পবিত্রতম স্থানটি ছিল 'ক্বুদসুল আকদাস' বা পরম পবিত্র কক্ষ (Holy of Holies), যেখানে কেবল আল্লাহর নির্ধারিত প্রধান পুরোহিত ব্যতীত কারও প্রবেশের অনুমতি ছিল না।
সুলাইমান (আ.) জলপাই কাঠের ওপর খাঁটি সোনা মুড়িয়ে দুটি বিশাল স্বর্গীয় দূত বা চেরুব তৈরি করেন, যাদের প্রসারিত সোনার ডানা পুরো কক্ষটিকে আবৃত করে রেখেছিল। এরপর খ্রিষ্টপূর্ব আনুমানিক ৯৫৯ অব্দে, দীর্ঘ সাড়ে সাত বছরের অক্লান্ত নির্মাণকাজ শেষে এক ঐতিহাসিক জাতীয় সমাবেশের আয়োজন করা হয়। বারো গোত্রের উপস্থিতিতে পবিত্র 'তাবুতুস সাকিনাহ' সিয়োন থেকে এনে পরম শ্রদ্ধায় ক্বুদসুল আকদাসের সোনার ডানার নিচে স্থাপন করা হয়।
উপাসনালয়টির নির্মাণ সমাপ্তির পর হযরত সুলাইমান (আ.) আল্লাহর দরবারে হাত তুলে যে অশ্রুসিক্ত ঐতিহাসিক মোনাজাত করেছিলেন, তা সহিহ সুনানে আন-নাসায়ী এবং ইবনে মাজাহর এক বিশুদ্ধ হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন যে সুলাইমান (আ.) বাইতুল মুকাদ্দাস নির্মাণ শেষ করে আল্লাহর নিকট তিনটি বরকত প্রার্থনা করেছিলেন: প্রথমত, তাঁর বিচার যেন আল্লাহর ন্যায়বিচারের হুবহু অনুরূপ হয় (আল্লাহ তা কবুল করেছিলেন); দ্বিতীয়ত, তাঁকে যেন এমন রাজত্ব দেওয়া হয় যা তাঁর পর আর কারও জন্য প্রযোজ্য হবে না (আল্লাহ তাও কবুল করেছিলেন); এবং তৃতীয়ত, যে ব্যক্তি কোনো পার্থিব স্বার্থ ছাড়া কেবল একনিষ্ঠভাবে নামাজ আদায়ের উদ্দেশ্যে এই পবিত্র মসজিদে প্রবেশ করবে, সে যেন তার সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হয়ে সেই দিনের মতো নিষ্পাপ হয়ে বের হয়, যেদিন তার মাতা তাকে প্রসব করেছিল।
শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এই হাদিসের শেষে মন্তব্য করেছিলেন যে প্রথম দুটি দোয়া নিশ্চিতভাবে কবুল হয়েছে এবং আমরা আশা করি আল্লাহ তাঁর তৃতীয় দোয়াটিও কবুল করেছেন। এভাবে মোরিয়া পাহাড়ের বাইতুল মুকাদ্দাস পরিণত হয় বিশ্ব তাওহিদের দ্বিতীয় পবিত্রতম মহাতীর্থে, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কোটি কোটি মুমিনের হৃদয়ে এক ঐশী বাতিঘর হিসেবে প্রজ্বলিত থাকে।
অধ্যায় ৩: আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, সমৃদ্ধির বিস্তার এবং রানি বিলকিসের আগমন
বাইতুল মুকাদ্দাস প্রতিষ্ঠার পর হযরত সুলাইমান (আ.)-এর সাম্রাজ্য প্রাচীন প্রাচ্যের সর্বাধিক সমৃদ্ধ, শক্তিশালী ও শান্তিপূর্ণ আন্তর্জাতিক পরাশক্তিতে রূপান্তরিত হয়। তাঁর চল্লিশ বছরের রাজত্বকালে কানআন ভূখণ্ডে কোনো বড় ধরনের যুদ্ধ বা অভ্যন্তরীণ রক্তপাত ঘটেনি; ফলে এই সময়টিকে ইতিহাসে ইসরাইলি রাজতন্ত্রের 'স্বর্ণযুগ' বা প্যাক্স সোলোমোনিকা বলা হয়। সুলাইমান (আ.) আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক ও স্থলবাণিজ্যের সুবিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন।
তিনি লোহিত সাগরের আকাবা উপসাগরের তীরে অবস্থিত ইলাতের নিকটবর্তী এজিয়ন-গেবের (Ezion-geber) বন্দরে এক সুবিশাল নৌবহর নির্মাণ করেন। রাজা হিরামের অভিজ্ঞ ফোয়েনিশীয় নাবিকদের সহায়তায় সুলাইমানের সেই বাণিজ্যতরী সুদূর ওফির (Ophir) দ্বীপে নিয়মিত বাণিজ্যিক অভিযানে যেত। সেখান থেকে শত শত মণ খাঁটি স্বর্ণ, মূল্যবান রত্নপাথর এবং দুর্লভ চন্দন কাঠ জেরুজালেমে নিয়ে আসা হতো। এর পাশাপাশি 'তার্শীশের বাণিজ্যতরী' প্রতি তিন বছর অন্তর বিপুল পরিমাণ সোনা, রূপা, হাতির দাঁত ও ময়ূর নিয়ে বন্দরে ফিরে আসত। জেরুজালেমে রূপার প্রাচুর্য এত বেড়েছিল যে ঐতিহাসিক বিবরণে তা সাধারণ পাথরের মতো সহজলভ্য বলা হয়েছে।
স্থলবাণিজ্যের ক্ষেত্রে সুলাইমান (আ.) আরব উপদ্বীপ থেকে সিরিয়া ও মেসোপটেমিয়ার দিকে চলে যাওয়া প্রাচীন 'সুগন্ধি বাণিজ্যপথ' (Incense Route) এবং 'রাজকীয় মহাসড়ক' (King's Highway) সম্পূর্ণ নিজের নিয়ন্ত্রণে আনেন। ইয়েমেনের লবান ও সুগন্ধি বহনকারী শত শত উটের কাফেলা সুলাইমানের সাম্রাজ্যের ভেতর দিয়ে নিরাপদে যাতায়াত করত এবং তারা রাজকোষে নিয়মিত শুল্ক প্রদান করত। এই অর্থনৈতিক প্রাচুর্যে প্রজারা নিজ নিজ দ্রাক্ষালতার ছায়ায় শান্তিতে বাস করত।
এই সমৃদ্ধির চরম শিখরে সংঘটিত হয় ইতিহাসের অন্যতম রোমাঞ্চকর ও আধ্যাত্মিক ঘটনা, যার বিস্তারিত বিবরণ পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নামলে সংরক্ষিত আছে। একদিন সুলাইমান (আ.) তাঁর আজ্ঞাবহ পাখিদের পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে দেখতে পান যে গোয়েন্দা পাখি হুদহুদ অনুপস্থিত। কিছু সময় পর হুদহুদ ফিরে এসে জানায় যে সে সুদূর দক্ষিণ আরবের সমৃদ্ধ 'সাবা' (Saba বা শেবা) রাজ্য থেকে এক চাঞ্চল্যকর খবর নিয়ে এসেছে। সেখানে এক পরাক্রমশালী রানি রাজত্ব করছেন, যাঁর রয়েছে এক সুরম্য সিংহাসন; কিন্তু তারা এক আল্লাহর পরিবর্তে সূর্যের পূজা করছে।
তাওহিদের এই লঙ্ঘনে সুলাইমান (আ.) তাৎক্ষণিক আক্রমণ না চালিয়ে প্রজ্ঞার সাথে হুদহুদের মাধ্যমে একটি পত্র পাঠান। সেই চিঠির শুরুতে লেখা ছিল: 'ইন্নাহু মিন সুলাইমানা ওয়া ইন্নাহু বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম' (নিশ্চয়ই এটি সুলাইমানের পক্ষ থেকে এবং নিশ্চয়ই এটি পরম দয়ালু আল্লাহর নামে)। পত্রে রানিকে অহংকার পরিহার করে একনিষ্ঠভাবে আত্মসমর্পণ করার আহ্বান জানানো হয়।
সাবার বিচক্ষণ রানি বিলকিস যুদ্ধের ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে সুলাইমানের মনোভাব যাচাইয়ের জন্য স্বর্ণ, রত্ন ও উপহারভরা এক বিপুল কাফেলা পাঠান। কিন্তু সুলাইমান (আ.) সেই উপহার অবজ্ঞার সাথে প্রত্যাখ্যান করে বলেন: তোমরা কি ধনসম্পদ দিয়ে আমাকে প্রলুব্ধ করতে চাও? আল্লাহ আমাকে যা দিয়েছেন, তা তোমাদের প্রদত্ত সম্পদের চেয়ে বহুগুণ শ্রেষ্ঠ! এরপর রানি স্বয়ং যখন রাজকীয় বহর নিয়ে জেরুজালেমের পথে রওনা হন, তখন সুলাইমান (আ.) তাঁর দরবারে অলৌকিক শক্তির প্রকাশ ঘটাতে চান।
তিনি জানতে চান কে রানির পৌঁছানোর আগেই তাঁর সেই সুদৃশ্য সিংহাসন নিয়ে আসতে পারবে। এক পরাক্রমশালী জিন বলল যে আপনি বৈঠক থেকে ওঠার আগেই আমি তা এনে দেব। কিন্তু আসমানি কিতাবের বিশেষ জ্ঞানসম্পন্ন এক আল্লাহর অলি বলে উঠলেন: চোখের পলক ফেলার আগেই আমি তা আপনার সামনে হাজির করব! চোখের পলকে সেই সিংহাসন দরবারে উপস্থিত দেখে সুলাইমান (আ.) অহংকারী হননি; বরং বলে ওঠেন: এটি আমার রবের অনুগ্রহ, যাতে তিনি আমাকে পরীক্ষা করেন আমি কৃতজ্ঞ নাকি অকৃতজ্ঞ!
রানি যখন প্রাসাদে পৌঁছান, তখন তাঁকে এক স্বচ্ছ কাঁচ ও স্ফটিকের তৈরি মেঝের (সারহিন মুমাররাদ) ওপর দিয়ে হাঁটার আহ্বান জানানো হয়। কাঁচের নিচে স্বচ্ছ জলধারা প্রবাহিত দেখে বিলকিস একে গভীর জলাশয় মনে করে নিজের পোশাক তুলে ধরেন। সুলাইমান (আ.) বিনম্রভাবে বলেন যে এটি পানি নয়, বরং স্ফটিকে মোড়ানো মসৃণ প্রাসাদপ্রাঙ্গণ। এই অনন্য আধ্যাত্মিক মহিমা প্রত্যক্ষ করে রানির পৌত্তলিক অহংকার চূর্ণ হয়ে যায়। তিনি আবেগে আপ্লুত হয়ে ঘোষণা করেন: হে আমার রব! আমি নিজের প্রতি চরম জুলুম করেছিলাম; আজ আমি সুলাইমানের সাথে বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহর সমীপে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করলাম। এভাবে কোনো রক্তপাত ছাড়াই একটি সমৃদ্ধ পৌত্তলিক সাম্রাজ্য তাওহিদের পতাকাতলে আশ্রয় লাভ করে।
অধ্যায় ৪: দশম শতকের প্রত্নতাত্ত্বিক সাক্ষ্য, সুলাইমান (আ.)-এর ওফাত এবং ইতিহাসের শিক্ষা
হযরত সুলাইমান (আ.)-এর রাজত্বকাল যে কোনো পৌরাণিক রূপকথা নয়, বরং ফিলিস্তিনের মাটিতে বাস্তব ইতিহাসের এক সুদৃঢ় অধ্যায়, তা আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। মিনিমালিস্টদের দাবি ছিল সুলাইমান নিছক লোকগাথা, তবে প্রত্নতত্ত্ব সেই ধারণাকে ধূলিসাৎ করেছে।
প্রথমত, বাইবেলের প্রথম রাজাবলির ৯ অধ্যায়ের ১৫ আয়াতে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে যে সুলাইমান জেরুজালেমের প্রাচীর ছাড়াও হাজোর (Hazor), মেগিদ্দো (Megiddo) এবং গেজের (Gezer) নামক তিনটি প্রধান সামরিক বাণিজ্যনগরী পুনর্নির্মাণ ও সুরক্ষিত করেছিলেন। প্রখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ ড. ইয়েগেল ইয়াদিন এই তিনটি প্রাচীন ঢিবিতে খননকার্য পরিচালনা করে সম্পূর্ণ অভিন্ন নকশার খ্রিষ্টপূর্ব দশম শতকের সুবিশাল 'ছয়-কক্ষবিশিষ্ট সোপানযুক্ত নগরতোরণ' (Six-Chambered Solomonic Gates) আবিষ্কার করেন। তোরণগুলোর অভিন্ন পাথর কাটার ধরণ ও পরিমাপ প্রমাণ করে এটি কেন্দ্রীয় প্রকৌশলীদের সুপরিকল্পিত কাজ।
দ্বিতীয়ত, জেরুজালেমের সিয়োন পাহাড় ও মোরিয়া পাহাড়ের মধ্যবর্তী ওফেল (Ophel) অঞ্চলে প্রখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ ড. এইলাত মাজার খননকার্য পরিচালনা করে খ্রিষ্টপূর্ব দশম শতকের এক সুবিশাল প্রতিরক্ষা প্রাচীর, রাজকীয় ফটক এবং সুউচ্চ নজরদারি টাওয়ার উন্মোচন করেন। এই স্থাপত্যটি নিখুঁতভাবে দাউদ নগরীকে বাইতুল মুকাদ্দাস চত্বরের সাথে সংযুক্ত করেছিল। একই স্তরে আবিষ্কৃত বিশাল মাটির মৃৎপাত্রে (Ophel Pithos) খোদাই করা প্রাচীনতম সেমেটিক লিপি তৎকালীন কেন্দ্রীয় প্রশাসনের সাক্ষ্য দেয়। উপরন্তু দক্ষিণ ফিলিস্তিনের তিমনা উপত্যকায় (Timna Valley) আবিষ্কৃত বিশালাকার প্রাচীন তামার খনি ও গলনাগারগুলো আধুনিক রেডিওকার্বন পরীক্ষায় খ্রিষ্টপূর্ব দশম শতকের সুলাইমানি যুগের বলেই প্রমাণিত হয়েছে।
তবে ক্ষমতার এই অবিশ্বাস্য চূড়ায় অবস্থান করেও হযরত সুলাইমান (আ.)-এর ওফাতের দৃশ্য মানবজাতির জন্য এক চরম আধ্যাত্মিক শিক্ষা হয়ে থাকে। পবিত্র কুরআনের সূরা সাবার ১৪ নম্বর আয়াতে তাঁর তিরোধানের এক বিস্ময়কর বিবরণ দেওয়া হয়েছে। খ্রিষ্টপূর্ব আনুমানিক ৯৩১ অব্দে, চল্লিশ বছর সফল শাসনের পর সুলাইমান (আ.) লাঠিতে ভর দিয়ে ইবাদতে রত অবস্থায় ওফাত পান। জিনেরা তাঁকে জীবিত মনে করে ভয়ে কঠিন পরিশ্রমে লিপ্ত ছিল।
অবশেষে একটি ক্ষুদ্র ঘুণপোকা বা উইপোকা (দাব্বাতুল আরদ) ধীরে ধীরে তাঁর কাঠের লাঠিটি ভেতর থেকে খেয়ে ফেলে। লাঠিটি ভেঙে গেলে সুলাইমান (আ.)-এর পবিত্র দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তখনই জিন ও সমগ্র মানবজাতি উপলব্ধি করতে পারে যে মহান বাদশাহ বহু পূর্বেই মৃত্যুবরণ করেছেন। কুরআন এই ঘটনার মাধ্যমে জিনদের অদৃশ্য জ্ঞান বা গায়েব জানার দাবিকে চিরতরে ধূলিসাৎ করে দেয়। কারণ জিনরা যদি অদৃশ্যের খবর জানত, তবে তারা দীর্ঘকাল ধরে এমন অপমানকর ও ক্লান্তিকর দাসত্বে আবদ্ধ থাকত না।
হযরত সুলাইমান (আ.)-এর মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরাধিকারী পুত্র রেহবিয়াম (Rehoboam)-এর রাজনৈতিক অহংকার ও অদূরদর্শিতার কারণে সমগ্র ঐক্যবদ্ধ রাজ্য ভেঙে দুই টুকরো হয়ে যায়: উত্তরের দশ গোত্র নিয়ে 'ইসরাইল রাজ্য' এবং দক্ষিণের দুই গোত্র নিয়ে 'জুদাহ রাজ্য'।
ইসলামি আকিদা হযরত সুলাইমান (আ.)-কে বাইবেলের বিকৃত বর্ণনার অপবাদ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ঘোষণা করে। বাইবেলের পরবর্তী বর্ণনায় দাবি করা হয়েছিল যে বৃদ্ধ বয়সে তিনি পৌত্তলিক স্ত্রীদের প্ররোচনায় মূর্তিপূজা করেছিলেন (নাউযুবিল্লাহ)। কিন্তু পবিত্র কুরআনের সূরা আল-বাকারার ১০২ আয়াতে আল্লাহ তাআলা এই জঘন্য অপবাদ প্রত্যাখ্যান করে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন: 'ওয়া মা কাফারা সুলাইমানু ওয়া লাকিন্ন্যাশ-শায়াত্বীনা কাফারূ' (সুলাইমান কখনো কুফরি করেননি; বরং শয়তানরাই কুফরি করেছিল)। সুলাইমান (আ.) ছিলেন আজীবন একনিষ্ঠ তাওহিদের ধারক, মহামহিম নবী এবং আল্লাহর এক অনুপম খলিফা। ফিলিস্তিনের মাটিতে তাঁর প্রতিষ্ঠিত বাইতুল মুকাদ্দাস আজও প্রমাণ করে যে সুবিচার, প্রজ্ঞা ও খোদাভীতির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা সাম্রাজ্যই কেবল মানব ইতিহাসের পাতায় চিরন্তন আলোকবর্তিকা হয়ে বেঁচে থাকে।
সুলাইমানি স্বর্ণযুগ বনাম পূর্ববর্তী যুগের প্রশাসনিক রূপান্তর
| ক্ষেত্র ও বিষয়বস্তু | দাউদ (আ.) ও পূর্ববর্তী পর্ব (খ্রিষ্টপূর্ব একাদশ-দশম শতক) | সুলাইমান (আ.)-এর স্বর্ণযুগ (খ্রিষ্টপূর্ব দশম শতক) | ঐতিহাসিক ও কুরআনিক তাৎপর্য |
|---|---|---|---|
| কেন্দ্রীয় উপাসনালয় | সিয়োন পাহাড়ের অস্থায়ী পবিত্র তাঁবুতে সংরক্ষিত তাবুত | মোরিয়া পাহাড়ে সুবিশাল পাথুরে বাইতুল মুকাদ্দাস প্রতিষ্ঠা | বিশ্ব তাওহিদের স্থায়ী কেন্দ্র ও নবজাতক শিশুর মতো নিষ্পাপ হওয়ার বরকত |
| সামরিক ও প্রাকৃতিক নিয়ন্ত্রণ | অশ্বারোহী সৈন্য ও লৌহ শিকলবর্মের মাধ্যমে প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধ | বাতাস, গলিত তামা ও জিন বাহিনীর অলৌকিক অনুগত্য | সূরা সাবার ঐশী ক্ষমতা ও সম্পূর্ণ অহংকারহীন নবুয়তি বিনয় |
| আন্তর্জাতিক বাণিজ্য | আঞ্চলিক ভূমিভিত্তিক বাণিজ্য ও নিকটবর্তী বৈরুত-টায়ার মৈত্রী | লোহিত সাগর হয়ে ওফির ও তার্শীশের ত্রিবার্ষিক সামুদ্রিক নৌবহর | রূপার প্রাচুর্য ও প্রাচীন ইনসেন্স রুটের ওপর সার্বভৌম কর্তৃত্ব |
| কূটনীতি ও ধর্মপ্রচার | পার্শ্ববর্তী মোয়াব, আম্মোন ও আরামের বিরুদ্ধে সামরিক সংঘাত | পত্র ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে রানি বিলকিসের অহিংস তাওহিদ গ্রহণ | সূরা আন-নামলের আদর্শ অহিংস আন্তর্জাতিক দাওয়াত |
| নগর প্রতিরক্ষা স্থাপত্য | কেবল জেরুজালেমের দাউদ নগরী ও মিল্লো প্রতিরক্ষা প্রাচীর | হাজোর, মেগিদ্দো, গেজেরের অভিন্ন ছয়-কক্ষবিশিষ্ট সোপান তোরণ | দশম শতকের কেন্দ্রীয় রাজকীয় প্রকৌশলের অকাট্য প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ |
সুলাইমানি স্বর্ণযুগের সাম্রাজ্যিক ও আধ্যাত্মিক কাঠামো
আমরা কী শিখলাম?
১. রাষ্ট্রক্ষমতা, প্রাচুর্য এবং অলৌকিক শক্তির চরম শিখরে আরোহণ করেও একজন প্রকৃত মুমিন কখনোই দম্ভ প্রকাশ করে না; বরং একটি ক্ষুদ্র পিপীলিকার সচেতনতা দেখেও আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতায় অবনত হয়।
২. ধর্মীয় উপাসনালয় নির্মাণে কেবল বাহ্যিক জাঁকজমক নয়, বরং অন্তরের প্রশান্তি, নিস্তব্ধ পবিত্রতা এবং হালাল উপার্জনের পবিত্র ভিত্তি নিশ্চিত করাই প্রধান শিক্ষা।
৩. আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে অন্ধ রক্তপাত ও যুদ্ধের পরিবর্তে আত্মমর্যাদাপূর্ণ পত্রালাপ, প্রজ্ঞা এবং তাওহিদের নৈতিক সৌন্দর্য তুলে ধরাই সবচেয়ে সফল দাওয়াতি পদ্ধতি।
৪. অদৃশ্য জগতের জিন বা কোনো সৃষ্টিরই অদৃশ্যের জ্ঞান (গায়েব) নেই; তারা চরম সীমাবদ্ধ এবং কেবলমাত্র মহান পরাক্রমশালী আল্লাহর সার্বভৌম ইচ্ছার অধীন।
৫. ক্ষমতা যখন সত্যের প্রতি সমর্পিত হয়, তখনই সমাজে প্রকৃত সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হয়, যা হযরত সুলাইমান (আ.)-এর স্বর্ণযুগ মানব ইতিহাসের পাতায় চিরতরে প্রমাণ করেছে।
উপসংহার
হযরত সুলাইমান (আ.)-এর স্বর্ণযুগ ফিলিস্তিনের সুপ্রাচীন ইতিহাসে কেবল কোনো পার্থিব সাম্রাজ্যের উত্থানপতন ছিল না; এটি ছিল ঐশী ন্যায়বিচার, মহাজাগতিক অনুগত্য এবং বিশ্বজনীন তাওহিদের এক চরম পরাকাষ্ঠা। পিতা দাউদ (আ.)-এর বিনম্র ভিত্তি থেকে শুরু করে মোরিয়া পাহাড়ের সুউচ্চ প্রাচীর পর্যন্ত সুলাইমান (আ.) প্রমাণ করেছিলেন যে যখন কোনো শাসন আল্লাহর সন্তুষ্টির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন বাতাস, ধাতু ও অদৃশ্য জগৎও সেই শাসনের অনুগত সেবকে পরিণত হয়। তাঁর নির্মিত বাইতুল মুকাদ্দাস কেবল একটি পাথুরে স্থাপত্য ছিল না; এটি ছিল লক্ষ কোটি তাওহিদপ্রেমী মানুষের জন্য পরম রবের দরবারে নিষ্পাপ হওয়ার এক পবিত্র আশ্রয়স্থল।
আধুনিক প্রত্নতত্ত্ব মেগিদ্দোর ছয়-কক্ষবিশিষ্ট তোরণ থেকে শুরু করে তিমনার তামার খনি পর্যন্ত তাঁর ঐতিহাসিক পদচিহ্নকে যেমন সুদৃঢ় করেছে, তেমনি পবিত্র কুরআন তাঁর চরিত্রকে মানব ইতিহাসের সকল বিকৃত অপবাদ থেকে মুক্ত করে এক নিষ্কলঙ্ক নবী হিসেবে চিরভাস্বর রেখেছে। উইপোকা দ্বারা লাঠি ভেঙে যাওয়ার মাধ্যমে জিনদের মিথ্যা অহংকার চূর্ণ করে সুলাইমান (আ.) মানবজাতিকে এই শাশ্বত সত্য শিখিয়ে গেছেন যে পার্থিব সমস্ত পরাক্রম ক্ষণস্থায়ী, কেবল চিরঞ্জীব আল্লাহর সার্বভৌমত্বই চিরন্তন। জেরুজালেমের পবিত্র মাটিতে তাঁর রেখে যাওয়া এই সোনালী স্মৃতি আজও ফিলিস্তিনের প্রতিটি পাথরে ও আকাশে ন্যায়বিচার, শান্তি এবং মুক্তির এক অনন্ত আলোকবর্তিকা হয়ে জ্বলছে।
নিজেকে যাচাই করুন
এই লেখার কুইজ
পবিত্র কুরআনের সূরা সোয়াদের ৩৫ নম্বর আয়াত অনুসারে হযরত সুলাইমান (আ.) ক্ষমতা গ্রহণের প্রারম্ভে আল্লাহর কাছে কোন বিশেষ দোয়া করেছিলেন?
ঐতিহাসিক কালানুক্রম ও ধর্মীয় বর্ণনা অনুসারে হযরত সুলাইমান (আ.) মোরিয়া পাহাড়ে বাইতুল মুকাদ্দাস (প্রথম পবিত্র উপাসনালয়) নির্মাণে সর্বমোট কত বছর সময় ব্যয় করেছিলেন?
বাইতুল মুকাদ্দাস নির্মাণের সময় পবিত্র গৃহের চত্বরে লৌহ অস্ত্রের কোনো শব্দ না হওয়ার পেছনে কী বিশেষ ঐতিহাসিক কৌশল অবলম্বন করা হয়েছিল?
সহিহ সুনানে আন-নাসায়ী ও ইবনে মাজাহর বিশুদ্ধ হাদিস অনুসারে বাইতুল মুকাদ্দাস নির্মাণ সমাপ্ত করে হযরত সুলাইমান (আ.) আল্লাহর কাছে যে তিনটি বিষয় প্রার্থনা করেছিলেন, তার তৃতীয়টি কী ছিল?
পবিত্র কুরআনের সূরা সাবার ১২ নম্বর আয়াত অনুসারে মহান আল্লাহ হযরত সুলাইমান (আ.)-এর জন্য কোন ধাতুর অলৌকিক ঝরনা প্রবাহিত করেছিলেন?
পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নামলের ৪৪ আয়াত অনুসারে রানি বিলকিস সুলাইমানের প্রাসাদে প্রবেশ করে মেঝেটিকে গভীর স্বচ্ছ পানির জলাশয় মনে করেছিলেন কেন?
পবিত্র কুরআনের সূরা সাবার ১৪ আয়াত অনুসারে হযরত সুলাইমান (আ.)-এর ওফাতের সংবাদ দীর্ঘকাল গোপন থাকার মাধ্যমে জিনদের সম্পর্কে কোন পরম সত্য উন্মোচিত হয়?
পবিত্র কুরআনের সূরা আল-বাকারার ১০২ নম্বর আয়াতে হযরত সুলাইমান (আ.)-এর বিরুদ্ধে বাইবেলের বিকৃত অভিযোগ খণ্ডন করে কোন দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা দেওয়া হয়েছে?
এই বিষয়ের কুইজ চ্যালেঞ্জ
কানআন থেকে গাজা কুইজে যান