৩০ অক্টোবর, ২০২৬ এ ৬:০০ AM
কানআন থেকে গাজাপর্ব ৯: বিচারকদের যুগ এবং প্রাচীন ফিলিস্টিয়ানদের সাথে সংঘর্ষ: লৌহ যুগের সংঘাত ও তাবুতুস সাকিনাহর সংকট
পর্ব ৯: বিচারকদের যুগ এবং প্রাচীন ফিলিস্টিয়ানদের সাথে সংঘর্ষ: লৌহ যুগের সংঘাত ও তাবুতুস সাকিনাহর সংকট
"তারা বলল: আমাদের জন্য একজন রাজা নিযুক্ত করুন, যাতে আমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করতে পারি... আর তাদের নবী তাদের বললেন: তাঁর রাজত্বের নিদর্শন এই যে, তোমাদের কাছে সেই সিন্দুকটি আসবে যাতে রয়েছে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে অন্তরের প্রশান্তি এবং মুসা ও হারুনের পরিবারের রেখে যাওয়া পবিত্র স্মৃতিচিহ্ন।"
— আল-কুরআন, সূরা আল-বাকারা: ২৪৬ ও ২৪৮
হযরত ইউশা ইবনে নুন (আ.) এবং তাঁর সমকালীন প্রবীণ দলপতিদের তিরোধানের পর বনি ইসরাইলের ইতিহাসে সূচিত হয়েছিল এক সুদীর্ঘ, বিশৃঙ্খল ও রূপান্তরকামী কালপর্ব, যা ইতিহাসে 'বিচারকদের যুগ' (Era of the Judges) নামে পরিচিত। খ্রিষ্টপূর্ব দ্বাদশ শতক থেকে শুরু করে খ্রিষ্টপূর্ব একাদশ শতকের শেষভাগ পর্যন্ত বিস্তৃত এই প্রায় দেড়শত বছরের সময়কালে কানআন ভূমিতে কোনো একক রাজা, কেন্দ্রীয় প্রশাসন বা স্থায়ী রাজধানী ছিল না। বারোটি গোত্র পাহাড়ি অঞ্চলে নিজ নিজ বরাদ্দকৃত সীমানায় স্বায়ত্তশাসিতভাবে বসবাস করত। প্রাচীন ঐতিহাসিক বিবরণ অনুসারে, সেই দিনগুলোতে বনি ইসরাইলের মাঝে কোনো স্থায়ী শাসক ছিল না; যার যার চোখে যা ন্যায়সঙ্গত মনে হতো, সে তাই করত।
এই প্রাতিষ্ঠানিক বিকেন্দ্রীকরণ ও আত্মিক শৃঙ্খলার অভাবের সুযোগে সমগ্র সমাজে বারবার নেমে আসত এক সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক সংকটচক্র। দীর্ঘ শান্তির সময়ে বনি ইসরাইল আল্লাহর তাওহিদের বিধান বিস্মৃত হয়ে প্রতিবেশী কানআনীয়দের মূর্তিপূজা ও উর্বরতা দেবদেবীর আরাধনায় লিপ্ত হতো। এর অনিবার্য ঐতিহাসিক পরিণতি হিসেবে তাদের ওপর নেমে আসত পার্শ্ববর্তী পরাক্রমশালী জাতিসমূহের রাজনৈতিক আধিপত্য ও চরম সামরিক নিপীড়ন। যখন অসহায় জনতা লাঞ্ছনায় জর্জরিত হয়ে আল্লাহর দরবারে কায়মনোবাক্যে তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করত, তখন আল্লাহ তাদের মধ্য থেকে একেকজন ক্যারিশম্যাটিক ও আল্লাহভীরু নেতা বা বিচারক (শোফেত) দাঁড় করিয়ে দিতেন, যিনি শত্রুর জোয়াল ভেঙে তাদের মুক্তি এনে দিতেন। কিন্তু বিচারকের ওফাতের পর জাতি পুনরায় সেই পুরনো পৌত্তলিক স্খলনে নিমজ্জিত হতো।
তবে বিচারকদের যুগের শেষার্ধে তাদের সামনে আবির্ভূত হয়েছিল এমন এক বহিরাগত ও সুসংগঠিত সামরিক শক্তি, যা বনি ইসরাইলের অস্তিত্বের ভিত্তিমূলকেই কাঁপিয়ে দিয়েছিল। এজিয়ান সাগর থেকে আগত উন্নত লৌহ প্রযুক্তিতে বলীয়ান 'সমুদ্রচারী জাতি' বা প্রাচীন ফিলিস্টিয়ানদের (Philistines) উত্থান ভূরাজনীতিকে চিরতরে বদলে দেয়। কীভাবে উপকূলীয় পঞ্চ-নগরীর ফিলিস্টিয়ানরা বনি ইসরাইলকে পদানত করেছিল, কীভাবে বীর শামশুনের একক লড়াই ও আত্মাহুতি ঘটেছিল, এবং কীভাবে আফেকের ঐতিহাসিক যুদ্ধে পবিত্র চুক্তি সিন্দুক বা তাবুতুস সাকিনাহ শত্রুর হাতে বন্দি হয়ে শিলোহ ধ্বংস হয়েছিল, তা বিশ্লেষণ করাই এই পর্বের মূল ঐতিহাসিক পাঠ।
অধ্যায় ১: বিচারকদের উত্থানের সামাজিক পটভূমি ও আত্মিক অবক্ষয়ের পুনরাবৃত্তি
হযরত মুসা ও ইউশা (আ.)-এর যুগে বনি ইসরাইল যে দৃঢ় তাওহিদি শৃঙ্খলায় পরিচালিত হয়েছিল, বিচারকদের যুগে তার ব্যাপক অবক্ষয় ঘটে। নতুন প্রজন্ম যারা মরুভূমির কৃচ্ছ্রসাধন ও জর্ডান পারাপারের অলৌকিক কুদরত স্বচক্ষে দেখেনি, তারা কানআনের সমতলভূমিতে এসে বিলাসী ও পরনির্ভরশীল হয়ে পড়ে। বিশেষ করে স্থানীয় কানআনীয়দের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন এবং প্রকৃতির দেবতা 'বাল' (Baal) ও উর্বরতার দেবী 'আশতারোত' (Ashtoreth)-এর আরাধনা সাধারণ সামাজিক অভ্যাসে পরিণত হয়। তাওহিদের এই লঙ্ঘন তাদের সামরিক ও নৈতিক প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ভেতর থেকে অন্তঃসারশূন্য করে ফেলে।
ঐতিহাসিক ক্রমানুসারে এই আত্মিক অবক্ষয়ের মুখে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন অত্নীয়েল (Othniel), যিনি মেসোপটেমিয়ার আগ্রাসন প্রতিহত করেছিলেন। পরবর্তীতে মোয়াবের রাজা এগলোনের আঠারো বছরের দাসত্ব থেকে জাতিকে মুক্ত করেন বামহাতি বীর বিচারক এহুদ (Ehud)। তিনি কৌশলে রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করে দ্বিমুখী ছোট তলোয়ার দিয়ে অত্যাচারী রাজাকে হত্যা করেন। এরপর শমগর (Shamgar) নামক কৃষক বলদের খেদানো লাঠি দিয়ে ছয়শত শত্রুকে পরাস্ত করে প্রাথমিক প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
তবে বিচারকদের যুগে প্রথম সর্বাত্মক জাতীয় সংঘাত তৈরি হয় কানআনের উত্তরের রাজা জাবিনের সেনাপতি সিসেরা (Sisera)-র নেতৃত্বে। সিসেরার অধীনে ছিল নয়শত সুসজ্জিত লৌহ রথ, যা সমতলভূমিতে পদাতিক সেনাদলকে ধূলিসাৎ করতে সক্ষম ছিল। এই চরম সংকটে নেতৃত্ব দেন বিজ্ঞ নারী বিচারক দেবোরা (Deborah)। তিনি সেনাপতি বারাক (Barak)-কে ডেকে দশ হাজার সৈন্য সমবেত করে তাবোর পর্বতের (Mount Tabor) চূড়ায় অবস্থান গ্রহণের নির্দেশ দেন। সিসেরা যখন রথবাহিনী নিয়ে কিশোন নদীর সমভূমিতে অগ্রসর হয়, তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে নেমে আসে প্রচণ্ড মুষলধারে বৃষ্টি। পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় কিশোন নদীর তীরবর্তী মাঠ কর্দমাক্ত জলাভূমিতে পরিণত হয়, ফলে সিসেরার ভারী লৌহ রথগুলো কাদায় দেবে গিয়ে অকেজো হয়ে পড়ে। ইসরাইলি পদাতিক সেনারা পাহাড় থেকে নেমে এসে হতবিহ্বল কানআনীয় বাহিনীকে ধ্বংস করে। সেনাপতি সিসেরা পালিয়ে গিয়ে কেনীয় নারী যায়েল (Jael)-এর তাঁবুতে নিহত হয়।
উত্তর কানআনে বিজয়ের পর মধ্য অঞ্চলে নেমে আসে আরও এক ভয়াবহ যাযাবর বিপর্যয়। আরব মরুভূমি থেকে পঙ্গপালের মতো আবির্ভূত হয় উষ্ট্রারোহী যাযাবর মিদিয়ানীয় (Midianites) বাহিনী। তারা মাঠের সমস্ত ফসল ও গবাদিপশু লুট করে নিয়ে যেত। এই চরম দারিদ্র্যের মুহূর্তে আল্লাহর আদেশে রুখে দাঁড়ান তরুণ গিদওন (Gideon)। গিদওন প্রথমে বালের বেদি ভেঙে তাওহিদের ঘোষণা দেন। বত্রিশ হাজার সৈন্য সমবেত হলেও আল্লাহ গিদওনকে নির্দেশ দেন ভীতুদের বিদায় দিতে এবং ঝরনায় পরীক্ষা করে মাত্র তিনশত সতর্ক সৈন্য বেছে নিতে।
রাতের অন্ধকারে মোরেহ পাহাড়ের ঢালে মিদিয়ানীয়দের বিশাল শিবিরের চতুর্দিকে তিনশত সৈন্য ছড়িয়ে পড়ে। তাদের প্রত্যেকের এক হাতে ছিল মাটির কলসির ভেতরে লুকানো জ্বলন্ত মশাল এবং অন্য হাতে রণশিঙা। মধ্যরাতে একযোগে তিনশত কলসি ভেঙে মশালের আলো জ্বালিয়ে এবং তূর্য বাজিয়ে তারা গর্জন তোলে: আল্লাহর তলোয়ার এবং গিদওনের তলোয়ার। অতর্কিত আলো ও শব্দের প্রচণ্ড আতঙ্কে বিভ্রান্ত মিদিয়ানীয়রা অন্ধকারের ভেতর একে অপরকে শত্রু মনে করে নিজেদের তলোয়ার দিয়েই আত্মঘাতী সংঘাত শুরু করে পালিয়ে যায়। বিজয়ের পর জনতা গিদওনকে রাজা হওয়ার প্রস্তাব দিলে তিনি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে বলেন: একমাত্র আল্লাহই তোমাদের প্রকৃত শাসক।
অধ্যায় ২: সমুদ্রচারী ফিলিস্টিয়ানদের আগমন, পঞ্চ-নগরীর উত্থান ও লৌহ যুগের সামরিক প্রাধান্য
খ্রিষ্টপূর্ব ত্রয়োদশ শতকের শেষভাগ থেকে খ্রিষ্টপূর্ব দ্বাদশ শতকের সূচনালগ্নে পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে এক মহাপ্রলয়ঙ্করী বিপর্যয় সংঘটিত হয়, যা প্রত্নতত্ত্বে 'ব্রোঞ্জ যুগের শেষ পতন' (Late Bronze Age Collapse) নামে পরিচিত। এই যুগে মাইসিনীয় গ্রিস ও হিত্তীয় সাম্রাজ্য আকস্মিক ধ্বংসযজ্ঞের মুখে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এই মহাবিপর্যয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এজিয়ান দ্বীপপুঞ্জ ও দক্ষিণ ইউরোপ থেকে ধেয়ে আসা এক যাযাবর যোদ্ধা জনগোষ্ঠী, যাদের মিশরীয় লিপিতে 'সমুদ্রচারী জাতি' (Sea Peoples) বলা হয়েছে।
মিশরের মেদিনাত হাবুতে সংরক্ষিত ফারাও তৃতীয় রামসেসের সমাধিমন্দিরের শিলালিপিতে এই সমুদ্রচারী জাতির বিবরণ রয়েছে। খ্রিষ্টপূর্ব আনুমানিক ১১৭৭ অব্দে এই নৌযোদ্ধারা মিশরের নীল নদের বদ্বীপে আক্রমণ চালায়। তৃতীয় রামসেস রক্তক্ষয়ী নৌযুদ্ধে তাদের পরাজিত করে মিশরে প্রবেশ প্রতিহত করেন। কিন্তু পরাজিত এই দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সুসংগঠিত গোষ্ঠীটি, যাদের মিশরীয় লিপিতে 'পেলেসেত' (Peleset) বলা হয়েছে, তারা কানআনের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় উর্বর সমভূমিতে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করে। এই পেলেসেত বা ফিলিস্টিয়ান থেকেই মূলত এই ভূখণ্ডের নাম কালক্রমে 'ফিলিস্তিন' হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি লাভ করে।
উপকূলীয় সমভূমিতে ফিলিস্টিয়ানরা পাঁচটি অত্যন্ত সুরক্ষিত নগররাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে, যা ইতিহাসে 'ফিলিস্টিয়ান পঞ্চ-নগরী' (Philistine Pentapolis) নামে খ্যাত। এই পাঁচটি নগরী ছিল গাজা (Gaza), আসকেলন (Ashkelon), আশদোদ (Ashdod), এক্রন (Ekron) এবং গাথ (Gath)। প্রতিটি নগরী পরিচালিত হতো একজন করে সামরিক শাসক বা 'সেরেন' (Seren)-এর দ্বারা, এবং যুদ্ধের সময় তারা সম্মিলিত কমান্ডের অধীনে ঐক্যবদ্ধ হয়ে যুদ্ধ করত। তাদের প্রধান জাতীয় উপাস্য ছিল শস্য ও সমুদ্রের দেবতা 'দাগোন' (Dagon) এবং এক্রনের উপাস্য ছিল 'বাল-জেবুব' (Baal-zebub)।
ফিলিস্টিয়ানদের প্রধান ঐতিহাসিক ও সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব নিহিত ছিল তাদের উন্নত ধাতব প্রযুক্তিতে। তারা কানআনে প্রথম উন্নত লৌহ গলাবার প্রযুক্তি (Iron smelting) প্রবর্তন করে। ব্রোঞ্জের ভঙ্গুর অস্ত্রের বিপরীতে ফিলিস্টিয়ানদের কাছে ছিল দীর্ঘ লোহার তলোয়ার, বর্শা, ভারী শিরস্ত্রাণ এবং উন্নত যুদ্ধরথ। ঐতিহাসিক ধর্মগ্রন্থের বিবরণে স্পষ্টভাবে উল্লেখিত আছে যে, সেই যুগে বনি ইসরাইলের দেশে কোনো কর্মকার বা কামার খুঁজে পাওয়া যেত না; কারণ ফিলিস্টিয়ানরা কঠোরভাবে আদেশ জারি করেছিল যাতে হিব্রুরা কখনো নিজেদের জন্য লোহার তলোয়ার বা বর্শা তৈরি করতে না পারে। এমনকি কৃষিকাজের জন্য লাঙলের ফলা বা কুড়াল শাণিত করতে হলেও বনি ইসরাইলকে ফিলিস্টিয়ানদের শহরে গিয়ে চড়া মূল্য দিতে হতো।
| ঐতিহাসিক ও সামাজিক মাপকাঠি | বনি ইসরাইল (পাহাড়ি গোত্রীয় সমাজ) | প্রাচীন ফিলিস্টিয়ান (উপকূলীয় পঞ্চ-নগরী) |
|---|---|---|
| ভূপ্রকৃতি ও মূল বসতি অঞ্চল | কেন্দ্রীয় কানআনের রুক্ষ পাহাড়ি উচ্চভূমি ও ঢাল | দক্ষিণ-পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল ও উর্বর শেফেলা |
| রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো | রাজা বা কেন্দ্রহীন বারোটি স্বায়ত্তশাসিত গোত্রীয় সমাজ | পাঁচ সামরিক নগরপতি (সেরেন)-এর সুসংহত কনফেডারেশন |
| সামরিক ও ধাতব প্রযুক্তি | ঐতিহ্যবাহী ব্রোঞ্জ ও সাধারণ লাঠিসোটা, কামারের অভাব | উন্নত লৌহ অস্ত্রশস্ত্র, ভারী বর্ম ও লোহার যুদ্ধরথ |
| ধর্মীয় বিশ্বাস ও উপাসনা | অদৃশ্য এক আল্লাহর তাওহিদ ও তাবুতুস সাকিনাহ | পৌত্তলিক দেবতা দাগোন ও বাল-জেবুবের কাল্ট |
| অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক ভিত্তি | পাহাড়ি সোপানভিত্তিক ক্ষুদ্র কৃষিকাজ ও পশুপালন | আন্তর্জাতিক সমুদ্রবাণিজ্য, বন্দর ও একচেটিয়া কামারশিল্প |
এই প্রযুক্তিগত ও রাজনৈতিক অসমতার কারণে ফিলিস্টিয়ানরা খুব দ্রুত উপকূলীয় সমভূমি ছাড়িয়ে শেফেলা (Shephelah) নামক পাহাড়ি পাদদেশে আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করে। তারা বনি ইসরাইলের সীমান্ত গোত্রসমূহকে পদানত করে নিয়মিত ভারী কর আদায় শুরু করে। এই পরাধীনতার প্রেক্ষাপটেই আবির্ভূত হন দান গোত্রের কিংবদন্তি বীর শামশুন।
অধ্যায় ৩: শামশুনের প্রতিরোধ, ব্যক্তিগত বীরত্ব ও দাগোন মন্দিরের মহাপ্রলয়
ফিলিস্টিয়ানদের বিরুদ্ধে বনি ইসরাইলের প্রতিরোধ কোনো প্রাতিষ্ঠানিক যুদ্ধক্ষেত্রের সংঘাত ছিল না; বরং তা ছিল একাকী এক অতিমানবীয় বীরের গেরিলা আক্রমণ। দান গোত্র যখন ফিলিস্টিয়ানদের চাপে পিছু হটছিল, তখন সোরাহ নামক গ্রামে জন্ম নেন শামশুন (Samson)। জন্মের পূর্বেই ঐশী ফেরেশতা তাঁর মাকে সুসংবাদ দিয়েছিলেন যে এই সন্তান আল্লাহর উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত বা 'নাজির' (Nazirite) হবেন। নাজির ব্রতের তিনটি কঠোর শর্ত ছিল: মাথার চুল কখনো কামানো যাবে না, কোনো আঙ্গুরজাতীয় পানীয় পান করা যাবে না এবং কোনো মৃতদেহ স্পর্শ করা যাবে না। এই ঐশী নিয়মের বিনিময়ে আল্লাহ শামশুনকে দান করেছিলেন দানবীয় শারীরিক শক্তি।
শামশুনের জীবন ছিল ব্যক্তিমানুষের দুর্বলতা এবং ঐশী শক্তির চরম সংঘাতময় মহাকাব্য। তিনি কোনো সেনাবাহিনী পরিচালনা করেননি; বরং তাঁর প্রতিটি আক্রমণ ছিল ফিলিস্টিয়ানদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আঘাত। তিমনাথের পথে এক গর্জনরত সিংহকে তিনি খালি হাতে চিরে ফেলেন। পরবর্তীতে এক ফিলিস্টিয়ান নারীকে বিবাহ করতে গিয়ে সংঘাতের সূত্রপাত হয়। নিজের স্ত্রী ও শ্বশুরকে ফিলিস্টিয়ানরা পুড়িয়ে মারলে শামশুন একাই শত শত শত্রুর ওপর প্রতিশোধ নেন। লেহি নামক স্থানে ফিলিস্টিয়ানরা এক হাজার সৈন্য নিয়ে তাঁকে ঘিরে ফেললে তিনি একটি গাধার চোয়ালের তাজা হাড় তুলে নেন এবং সেই হাড় দিয়েই একাকী এক হাজার সশস্ত্র ফিলিস্টিয়ান যোদ্ধাকে খতম করেন।
পরবর্তীতে গাজা নগরীতে যখন শত্রুরা তাঁকে হত্যা করতে নগরফটক ঘিরে রাখে, তখন মধ্যরাতে শামশুন জেগে উঠে গাজার বিশালাকার নগরফটকের দুই কপাট, খিল ও হুড়কাসহ উপড়ে কাঁধে তুলে হেবরন পর্বতের চূড়ায় বয়ে নিয়ে যান। ফিলিস্টিয়ানদের পঞ্চ-নগরীর সমস্ত শাসক এই একক শক্তির কাছে দিশেহারা হয়ে পড়ে। সম্মুখ সমরে তাঁকে পরাজিত করা অসম্ভব জেনে নগরপতিরা শামশুনের মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতাকে কাজে লাগানোর ষড়যন্ত্র করে।
সোরেকের উপত্যকায় শামশুন দলীলা (Delilah) নাম্নী এক ফিলিস্টিয়ান নারীর মোহে পড়েন। নগরপতিরা দলীলাকে বিপুল রূপার মুদ্রা দেওয়ার প্রস্তাব দেয়, যদি সে শামশুনের শক্তির আসল রহস্য জেনে নিতে পারে। তিনবার ব্যর্থ হওয়ার পর দলীলার অব্যাহত মানসিক চাপে শামশুন প্রকাশ করেন তাঁর নাজির ব্রতের মূল গোপনীয়তা: আমার মাথায় কখনো ক্ষুর পড়েনি; যদি আমার মাথার চুল কেটে ফেলা হয়, তবে আমার শক্তি চলে যাবে এবং আমি সাধারণ মানুষের মতো দুর্বল হয়ে পড়ব।
শামশুন যখন দলীলার কোলে ঘুমন্ত ছিলেন, তখন গোপনে নাপিত ডেকে তাঁর মাথার সাতটি বেণি কেটে ফেলা হয়। ঘুম ভাঙার পর শামশুন বুঝতে পারলেন যে আল্লাহর ঐশী শক্তি তাঁকে পরিত্যাগ করেছে। ফিলিস্টিয়ানরা তৎক্ষণাৎ তাঁকে বন্দি করে, তপ্ত শলাকা দিয়ে তাঁর দুটি চোখ উপড়ে ফেলে এবং শিকল দিয়ে বেঁধে গাজার কারাগারে গম পেষার চক্র ঘোরানোর দাসবৃত্তিতে নিযুক্ত করে।
কিন্তু অন্ধ শামশুনের কারাবাসের দিনগুলোতে ধীরে ধীরে তাঁর মাথার চুল পুনরায় গজাতে শুরু করে। ফিলিস্টিয়ানরা যখন তাদের উপাস্য দাগোনের মন্দিরে বিশাল বিজয় উৎসবে সমবেত হলো, তখন সেখানে শামশুনকে উপহাসের পাত্র হিসেবে নাচানোর জন্য নিয়ে আসা হলো। সেই মন্দিরের ছাদ ও প্রাঙ্গণে ফিলিস্টিয়ান পঞ্চ-নগরীর সমস্ত অভিজাত ও তিন হাজার মানুষ সমবেত ছিল। অন্ধ শামশুন হাত ধরে থাকা বালকটিকে অনুরোধ করলেন তাঁকে মন্দিরের ছাদ ধরে রাখা মূল দুটি স্তম্ভের কাছে নিয়ে যেতে।
দুই স্তম্ভের মাঝে দাঁড়িয়ে শামশুন স্বীয় জীবনের অন্তিম মুহূর্তে পরম প্রভুর দরবারে কাতর আর্তনাদ জানালেন: হে আল্লাহ, আমাকে এই একবারের জন্য শক্তি দান করুন, যাতে আমার দুটি চোখের জন্য আমি এই ফিলিস্টিয়ানদের ওপর প্রতিশোধ নিতে পারি। এরপর তিনি দুই হাতে দুই স্তম্ভ জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে বললেন: ফিলিস্টিয়ানদের সাথে আমারও মৃত্যু হোক! তিনি সমস্ত শক্তি দিয়ে স্তম্ভ দুটিতে প্রবল চাপ দিলেন। মুহূর্তের মধ্যে দাগোন মন্দিরের বিশাল পাথুরে ছাদ ভেঙে নিচে সমবেত সমস্ত নগরপতি ও অভিজাতদের ওপর ধসে পড়ল। নিজের জীবদ্দশায় শামশুন যত ফিলিস্টিয়ানকে হত্যা করেছিলেন, তাঁর মৃত্যুর মুহূর্তে তার চেয়ে বেশি শত্রুর বিনাশ ঘটল। তবে এই সংঘাত স্থায়ীভাবে মেটেনি; বরং তা এগিয়ে চলেছিল কেন্দ্রীয় ধর্মীয় কেন্দ্র শিলোহের দিকে।
অধ্যায় ৪: আফেকের যুদ্ধ, শিলোহের ধ্বংস ও তাবুতুস সাকিনাহর ঐতিহাসিক সংকট
শামশুনের আত্মাহুতির পর বিচারকদের যুগের অন্তিম পর্যায়ে বনি ইসরাইলের আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব ছিল প্রবীণ পুরোহিত এলির (Eli) ওপর। মধ্য কানআনের পাহাড়ি শহর শিলোহ (Shiloh) ছিল তখন সমগ্র জাতির একমাত্র আনুষ্ঠানিক রাজধানী, যেখানে মুসা (আ.)-এর সেই পবিত্র তাবুতুস সাকিনাহ বা চুক্তি সিন্দুক সংরক্ষিত ছিল। কিন্তু শিলোহের ধর্মীয় পরিবেশ ছিল চরম কলুষিত। এলির দুই পুরোহিত পুত্র হফনি ও পিনহাদ (Hophni and Phinehas) মন্দিরে আসা কোরবানির অংশ বলপ্রয়োগ করে ছিনিয়ে নিত এবং অনৈতিকতায় লিপ্ত হতো। প্রবীণ পিতা এলি তাদের পাপ সম্পর্কে জেনেও কঠোর ব্যবস্থা নেননি। ফলে ঐশী সতর্কবার্তা উচ্চারিত হয় যে এই অপবিত্র যাজক বংশের পতন অনিবার্য।
খ্রিষ্টপূর্ব আনুমানিক ১০৫০ অব্দে ফিলিস্টিয়ানরা তাদের পঞ্চ-নগরীর সেনাবাহিনী নিয়ে আফেক (Aphek) নামক স্থানে সমবেত হয়। বনি ইসরাইল তাদের প্রতিহত করতে ইবেন-এজার (Ebenezer) প্রান্তরে সমবেত হয়। প্রথম দিনের যুদ্ধে চার হাজার ইসরাইলি সেনা নিহত হয়ে পিছু হটে। এই পরাজয়ে আতঙ্কিত হয়ে প্রবীণ নেতারা একটি চরম ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। তারা ভাবলেন চুক্তি সিন্দুকটি যুদ্ধের ময়দানে নিয়ে এলেই তার যাদুর মতো অলৌকিক শক্তিতে তারা বিজয়ী হবে। তারা শিলোহ থেকে হফনি ও পিনহাদের সাথে করে সেই পরম পবিত্র তাবুতুস সাকিনাহকে রণক্ষেত্রে নিয়ে এলেন।
সিন্দুকটি শিবিরে পৌঁছামাত্রই বনি ইসরাইল এমন বিকট আনন্দধ্বনি তুলল যে ভূমিতে কম্পন সৃষ্টি হলো। ফিলিস্টিয়ানরা প্রথমে সেই গর্জন শুনে আতঙ্কিত হয়েছিল। কিন্তু তাদের নগরপতিরা সেনাদের সাহসী হওয়ার আহ্বান জানাল। দ্বিতীয় দিনের যুদ্ধে বনি ইসরাইলের সমস্ত প্রতিরোধ ভেঙে পড়ল। ত্রিশ হাজার পদাতিক সেনা নিহত হলো, হফনি ও পিনহাদ যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ হারাল এবং আল্লাহর পবিত্র 'তাবুতুস সাকিনাহ' ফিলিস্টিয়ানদের হাতে বন্দি হলো। এই খবর শুনে শিলোহের নগরদ্বারে বসে থাকা অন্ধ পুরোহিত এলি চেয়ার থেকে পেছন দিকে পড়ে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
আফেক বিজয়ের পরপরই ফিলিস্টিয়ানরা এগিয়ে গিয়ে শিলোহ নগরী আক্রমণ করে এবং অভয়াশ্রমটিকে সম্পূর্ণ আগুনে পুড়িয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়। আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যে তেল সাইলো (Tel Shiloh)-তে খ্রিষ্টপূর্ব ১০৫০ অব্দের এক সুবিশাল অগ্নিকাণ্ডের ধ্বংসাবশেষ স্তর আবিষ্কৃত হয়েছে, যা এই বিবরণের অকাট্য সত্যতা প্রমাণ করে।
কিন্তু পবিত্র চুক্তি সিন্দুক ফিলিস্টিয়ানদের জন্য বিজয়ের স্মারক না হয়ে এক মহাভয়াবহ ঐশী গযবে পরিণত হলো। ফিলিস্টিয়ানরা সিন্দুকটিকে আশদোদ নগরীতে নিয়ে গিয়ে তাদের দেবতা দাগোনের মূর্তির সামনে স্থাপন করে। পরদিন সকালে দেখা গেল দাগোনের মূর্তিটি চুক্তি সিন্দুকের সামনে উপুড় হয়ে মাটিতে পড়ে আছে। দ্বিতীয় দিন সকালে দেখা গেল দাগোনের মাথা ও দুটি হাত ভেঙে চৌকাঠে পড়ে আছে। এর পরপরই আশদোদ, গাথ ও এক্রন নগরীতে ছড়িয়ে পড়ল ভয়াবহ মহামারি ও প্লেগ। মানুষের শরীরে মারাত্মক ফোড়া ও ইঁদুরের উপদ্রবে হাজার হাজার ফিলিস্টিয়ান মারা যেতে লাগল।
সাত মাস পর ফিলিস্টিয়ান নগরপতিরা চরম ভীত হয়ে সিন্দুকটি ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। তারা পাঁচটি সোনার ফোড়া ও পাঁচটি সোনার ইঁদুরের প্রতীক তৈরি করে তা সিন্দুকের পাশে রাখল। এরপর জোয়াল না পরা দুটি দুগ্ধবতী গরুকে একটি নতুন কাঠের গাড়িতে জুড়ে দিয়ে চালকবিহীনভাবে ছেড়ে দিল। গরু দুটি সোজা ইসরাইলি সীমান্ত শহর বেথ-শেমেশের (Beth-shemesh) দিকে চলে এলো। সেখান থেকে সিন্দুকটিকে কিরয়াত-ইয়ারিম (Kiriath-jearim)-এ অবিনাদাবের গৃহে দীর্ঘ কয়েক দশক নিরাপদে সংরক্ষণ করা হয়।
এই দুর্যোগের মধ্য থেকে আবির্ভূত হন হযরত শামুয়েল (Samuel বা ইসমুঈল আ.)। তিনি ছিলেন একাধারে শেষ বিচারক এবং বনি ইসরাইলের মহিমান্বিত পয়গম্বর। তিনি সমগ্র জাতিকে মিসপাহ (Mizpah)-তে সমবেত করে বিদেশি দেবদেবী বর্জন করে একমাত্র আল্লাহর দিকে ফিরে আসার ডাক দেন। শামুয়েলের নেতৃত্বে বনি ইসরাইল ফিলিস্টিয়ানদের বিরুদ্ধে আত্মবিশ্বাস ফিরে পায়। কিন্তু বিচারকদের যুগের দীর্ঘ বিশৃঙ্খলা প্রমাণ করেছিল যে অসংগঠিত গোত্রীয় ব্যবস্থা দিয়ে আর টিকে থাকা সম্ভব নয়। বনি ইসরাইলের প্রবীণ নেতারা পয়গম্বর শামুয়েলের কাছে এসে দাবি করলেন: আমাদের জন্য একজন শক্তিশালী রাজা মনোনীত করুন, যিনি আমাদের একত্র করে যুদ্ধ পরিচালনা করবেন। এই দাবির মধ্য দিয়েই সমাপ্তি ঘটে বিচারকদের যুগের এবং উন্মোচিত হয় পবিত্র ভূমিতে রাজতন্ত্রের এক নতুন ঐতিহাসিক মহাকাব্য।
আমরা কী শিখলাম?
১. কেন্দ্রীয় নেতৃত্বহীনতার বিপদ: ঐক্যের অভাব ও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার অনুপস্থিতি একটি জাতিকে অভ্যন্তরীণ কলহ ও বহিরাগত আগ্রাসনের সহজ শিকারে পরিণত করে।
২. প্রতীককে অন্ধ বিশ্বাসে রূপান্তরের পরিণতি: তাবুতুস সাকিনাহ ছিল আল্লাহর নির্দেশ পালনের মাধ্যম, কোনো জাদুকরি তাবিজ নয়; আত্মিক পবিত্রতা ছাড়া কেবল বাহ্যিক পবিত্র বস্তুর উপস্থিতি বিজয় আনতে পারে না।
৩. সাংস্কৃতিক আপসের আত্মঘাতী ফাঁদ: শত্রুর পৌত্তলিক সংস্কৃতি ও নৈতিক অবক্ষয়কে আপন করে নিলে নিজের বিশ্বাস ও প্রতিরক্ষার মূল ভিত্তি ধসে পড়ে।
৪. প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের ভূরাজনৈতিক প্রভাব: ফিলিস্টিয়ানদের লৌহ প্রযুক্তি প্রমাণ করে যে সামরিক ও বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিতে পিছিয়ে থাকা যেকোনো জাতিকে শতাব্দীর পর শতাব্দী পরাধীনতার গ্লানি বহন করতে বাধ্য করে।
৫. ঐশী শক্তির অপরাজেয়তা: মানুষ ভুল করতে পারে এবং সমাজ সাময়িকভাবে পরাজিত হতে পারে, কিন্তু আল্লাহর সত্য ও তাঁর নিদর্শনকে কখনো বন্দি বা পদানত করে রাখা যায় না।
উপসংহার
বিচারকদের যুগ এবং প্রাচীন ফিলিস্টিয়ানদের সাথে সংঘাতের কালপর্বটি ছিল ফিলিস্তিনের প্রাচীন ইতিহাসে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী অথচ অপরিহার্য এক গঠনমূলক অধ্যায়। ইউশা ইবনে নুনের রেখে যাওয়া বিজয়গাথা কীভাবে আত্মিক অবহেলা ও প্রযুক্তির ঘাটতিতে বিলীন হয়ে গিয়েছিল, তা প্রমাণ করে ইতিহাস কখনো কোনো জাতিকে নিঃশর্ত চিরস্থায়ী সুরক্ষা দেয় না। সমুদ্রচারী পেলেসেতদের আগমন ফিলিস্তিনের উপকূলে এমন এক শক্তিশালীর নোঙর ফেলেছিল, যার সাথে সংঘাতেই বনি ইসরাইল উপলব্ধি করেছিল যে গোত্রীয় বিভাজন ভুলে একটি সুসংহত ও শক্তিশালী রাষ্ট্রের জন্ম দেওয়া ছাড়া তাদের আর কোনো অস্তিত্ব থাকবে না।
শামশুনের বীরত্বপূর্ণ আত্মাহুতি এবং আফেকের যুদ্ধে চুক্তি সিন্দুক হারানোর নিদারুণ ট্র্যাজেডি এই জাতির চেতনাকে ভেতর থেকে নাড়া দিয়েছিল। তারা বুঝতে পেরেছিল যে কেবল ব্যক্তিগত বীরত্ব বা যুদ্ধক্ষেত্রে সিন্দুক প্রদর্শন করে স্বাধীনতা রক্ষা সম্ভব নয়; প্রয়োজন একজন ন্যায়পরায়ণ ও শক্তিশালী বাদশাহর অধীনে সমগ্র জাতির ইস্পাতকঠিন রাজনৈতিক ঐক্য। এই উপলব্ধিই তাদের পয়গম্বর শামুয়েলের দরবারে রাজা চাওয়ার ঐতিহাসিক আবেদনের দিকে ঠেলে দিয়েছিল।
কীভাবে পয়গম্বর শামুয়েল (আ.) ঐশী নির্দেশে সাধারণ মেষপালক ও দীর্ঘদেহী তালুত (শৌল)-কে বনি ইসরাইলের প্রথম রাজা হিসেবে অভিষিক্ত করলেন, কীভাবে ফেরেশতাদের কাঁধে ভর করে পবিত্র তাবুতুস সাকিনাহ পুনরায় ফিরে এলো, এবং কীভাবে তরুণ হযরত দাউদ (আ.) মাত্র একটি গুলতি ও পাথর হাতে ফিলিস্টিয়ানদের দানবীয় বীর যোদ্ধা জালুতকে (গোলিয়াথ) পরাস্ত করে ফিলিস্তিনের ইতিহাসে নতুন স্বর্ণযুগের সূচনা করলেন, সেই রোমাঞ্চকর বিজয়গাথা উন্মোচিত হবে সিরিজের পরবর্তী পর্বে।
নিজেকে যাচাই করুন
এই লেখার কুইজ
খ্রিষ্টপূর্ব দ্বাদশ ও একাদশ শতকে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পূর্বে বনি ইসরাইলের গোত্রীয় শাসনকালে আবির্ভূত পরিত্রাতা ও জাতীয় নেতাদের হিব্রু ও সেমেটিক ভাষায় কী বলা হতো?
মিশরের মেদিনাত হাবু শিলালিপিতে খ্রিষ্টপূর্ব আনুমানিক ১১৭৭ অব্দে ফারাও তৃতীয় রামসেসের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত কোন সমুদ্রচারী গোষ্ঠীকে ফিলিস্টিয়ানদের মূল পূর্বপুরুষ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে?
প্রাচীন ফিলিস্টিয়ানরা ফিলিস্তিনের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে যে পাঁচটি সুরক্ষিত নগররাষ্ট্রের জোট (Pentapolis) গড়ে তুলেছিল, তাদের মধ্যে কোনটি অন্তর্ভুক্ত ছিল না?
বিচারকদের যুগে বনি ইসরাইলের বিরুদ্ধে ফিলিস্টিয়ানদের দীর্ঘস্থায়ী সামরিক প্রাধান্যের প্রধান প্রযুক্তিগত কারণ কী ছিল?
ফিলিস্টিয়ানদের বিরুদ্ধে একক গেরিলা লড়াই পরিচালনাকারী দান গোত্রের বীর শামশুনের অলৌকিক শারীরিক শক্তির মূল ভিত্তি ছিল তাঁর কোন বিশেষ ধর্মীয় ব্রত?
খ্রিষ্টপূর্ব আনুমানিক ১০৫০ অব্দে আফেকের ঐতিহাসিক যুদ্ধে ফিলিস্টিয়ানদের বিরুদ্ধে পরাজয়ের পর বনি ইসরাইলের কোন মহাবিপর্যয় ঘটেছিল?
ছিনতাইকৃত তাবুতুস সাকিনাহ আশদোদ নগরীতে নিয়ে গিয়ে ফিলিস্টিয়ানরা কোন পৌত্তলিক দেবতার মন্দিরে পরাজিত ট্রফি হিসেবে স্থাপন করেছিল?
বিচারকদের যুগের সমাপ্তিলগ্নে বনি ইসরাইলকে পৌত্তলিকতা থেকে মুক্ত করে ঐক্যবদ্ধ করেন এবং পরবর্তীতে প্রথম রাজা নির্বাচনের নেতৃত্ব দেন কোন মহান পয়গম্বর?
এই বিষয়ের কুইজ চ্যালেঞ্জ
কানআন থেকে গাজা কুইজে যান