২৮ অক্টোবর, ২০২৬ এ ৬:০০ AM
কানআন থেকে গাজাপর্ব ৭: হযরত মুসা (আ.)-এর নেতৃত্বে সিনাই প্রান্তর ও 'তিহ' ময়দানের ৪০ বছরের নির্বাসন: লোহিত সাগর পার থেকে প্রতিশ্রুত ভূমির দোরগোড়ায়

পর্ব ৭: হযরত মুসা (আ.)-এর নেতৃত্বে সিনাই প্রান্তর ও 'তিহ' ময়দানের ৪০ বছরের নির্বাসন: লোহিত সাগর পার থেকে প্রতিশ্রুত ভূমির দোরগোড়ায়
"তারা বলল: হে মুসা, সেখানে এক পরাক্রান্ত জাতি রয়েছে; তারা সেখান থেকে বের না হওয়া পর্যন্ত আমরা কখনোই সেখানে প্রবেশ করব না... তিনি বললেন: এটি তাদের জন্য চল্লিশ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা হলো, তারা জমিনে বিভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়াবে।"
— আল-কুরআন, সূরা আল-মায়িদাহ: ২২ ও ২৬
লোহিত সাগরের উদ্বেল জলরাশি যখন স্বৈরাচারী ফেরাউন ও তার পরাক্রমশালী সেনাবাহিনীকে গ্রাস করে চিরতরে সলিলসমাধি ঘটিয়েছিল, তখন ইতিহাসের পাতায় উন্মোচিত হয়েছিল এক সম্পূর্ণ নতুন দিগন্ত। শতবর্ষব্যাপী শারীরিক দাসত্ব ও নিদারুণ লাঞ্ছনার শৃঙ্খল ভেঙে বনি ইসরাইল অবশেষে মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ পায়। কিন্তু ভৌগোলিক মুক্তি অর্জন যতটা দ্রুত সম্পন্ন হয়েছিল, মনস্তাত্ত্বিক ও আত্মিক মুক্তি অর্জন ছিল তার চেয়ে বহুগুণে কঠিন ও দীর্ঘমেয়াদী। নীল নদের উর্বর প্লাবনভূমি ও মিসরীয় নগরকেন্দ্রিক জীবনধারা থেকে উৎখাত হয়ে হঠাৎ করে সিনাই উপদ্বীপের শুষ্ক, রৌদ্রদগ্ধ ও পাথুরে মরুপ্রান্তরে এসে উপস্থিত হওয়া ছিল এই যাযাবর জনগোষ্ঠীর জন্য এক সুকঠিন ঐতিহাসিক অভিঘাত।
হযরত মুসা (আ.)-এর সামনে তখন প্রধানতম ঐতিহাসিক চ্যালেঞ্জ ছিল দুটি। প্রথমত, দীর্ঘ দাসত্বের অভ্যাসে দাসমনোবৃত্তি ও পরনির্ভরশীলতায় অভ্যস্ত একটি বহুধা বিভক্ত জনসমষ্টিকে তাওহিদভিত্তিক এক সুসংহত ও সুশৃঙ্খল জাতিতে রূপান্তর করা। দ্বিতীয়ত, পূর্বপুরুষ ইবরাহিম, ইসহাক ও ইয়াকুব (আ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত কানআনের প্রতিশ্রুত পবিত্র ভূমিতে তাদের পুনরায় মর্যাদার সাথে প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু সিনাইয়ের রুক্ষ মরুপথে পা রাখা মাত্রই প্রকাশিত হতে শুরু করে সেই দাসত্বকালীন মনস্তত্ত্বের গভীর ক্ষতচিহ্ন। তৃষ্ণা, ক্ষুধা ও সামান্যতম কৃচ্ছ্রসাধনের মুখে তাদের বারবার আনুগত্যহীনতা, মিশরীয় পৌত্তলিকতার প্রতি নস্টালজিয়া এবং সর্বোপরি কানআনের শক্তিশালী জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রকাশ্য কাপুরুষতা প্রকাশ পায়।
এই চরম চারিত্রিক দুর্বলতা ও অবাধ্যতার ঐশী পরিণতি হিসেবে তাদের ওপর নেমে আসে চল্লিশ বছরব্যাপী তিহ ময়দানে দিকভ্রান্ত নির্বাসনের দণ্ড। লোহিত সাগর থেকে কানআনের দূরত্ব ছিল মাত্র কয়েক সপ্তাহের পথ, অথচ সেই পথ অতিক্রম করতে তাদের সময় লেগেছিল চার দশক। এই চল্লিশ বছর নিছক কোনো অন্ধ শাস্তি ছিল না; বরং তা ছিল ইতিহাসের এক গভীর সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরশালা। কীভাবে মিশরীয় শৃঙ্খলে লালিত একটি দুর্বল প্রজন্মের অবসান ঘটিয়ে মরুভূমির রুক্ষ আলো বাতাসে এক নির্ভীক ও তাওহিদবাদী নতুন প্রজন্মের জন্ম হয়েছিল, কীভাবে মান্না ও সালওয়ার অলৌকিক নেয়ামত তাদের টিকিয়ে রেখেছিল এবং কীভাবে মুসা (আ.)-এর জীবদ্দশাতেই ভবিষ্যৎ বিজয়ের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছিল, তা বিশ্লেষণ করাই এই পর্বের মূল ঐতিহাসিক পাঠ।
অধ্যায় ১: লোহিত সাগর অতিক্রম, মরুভূমির তৃষ্ণা ও সিনাইয়ের তাওরাতের অঙ্গীকার
লোহিত সাগরের অলৌকিক বিভাজনের মধ্য দিয়ে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার পর বনি ইসরাইলের শিবিরে প্রথমে সৃষ্টি হয়েছিল আনন্দের মহাকাব্যিক উচ্ছ্বাস। কিন্তু এই আধ্যাত্মিক আবেগ স্থায়ী হয়নি। লোহিত সাগর পার হয়ে যখন কাফেলাটি সিনাইয়ের দক্ষিণ প্রান্তরে অগ্রসর হতে শুরু করল, তখনই তাদের চোখের সামনে পড়ে এক স্থানীয় পৌত্তলিক জনগোষ্ঠী, যারা মূর্তির সামনে সিজদারত ছিল। শত শত বছর ধরে মিশরের পৌত্তলিক পরিবেশ দেখে আসা বনি ইসরাইলের একটি অংশ তৎক্ষণাৎ মুসা (আ.)-এর কাছে দাবি করে বসে: হে মুসা, তাদের যেমন উপাস্য রয়েছে, আমাদের জন্যও তেমনি এক দৃশ্যমান মূর্তি উপাস্য বানিয়ে দাও। পবিত্র কুরআনের সূরা আল-আরাফের ১৩৮ নম্বর আয়াতে মুসা (আ.)-এর ক্ষোভ ও হতাশা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে; তিনি বললেন: নিশ্চয় তোমরা এক চরম অজ্ঞ ও অবিবেচক জাতি। সাগর পাড়ি দেওয়ার অলৌকিক নিদর্শন চাক্ষুষ দেখার কয়েকদিনের মাথায় এমন দাবি প্রমাণ করেছিল যে শারীরিক দাসত্ব থেকে মুক্তি পেলেও তাদের হৃদয় থেকে পৌত্তলিকতার প্রভাব মুছে যায়নি।
মরুভূমির বাস্তবতায় দ্রুত তাদের সামনে হাজির হয় খাদ্য ও পানির তীব্র সংকট। সিনাই উপদ্বীপের রুক্ষ মালভূমিতে মিষ্টি পানির তীব্র অভাব ছিল। তিন দিন পথ চলার পর যখন তারা মারাহ নামক স্থানে পৌঁছায়, তখন সেখানকার কূপে প্রাপ্ত পানি ছিল অত্যন্ত তিক্ত ও পানের অযোগ্য। তৃষ্ণার্ত মানুষ ধৈর্য না ধরে পুনরায় মুসা (আ.)-এর বিরুদ্ধে অসন্তোষ ও অভিযোগ শুরু করে। আল্লাহর আদেশে মুসা (আ.) একটি নির্দিষ্ট গাছের কাঠ সেই পানিতে নিক্ষেপ করলে তা অলৌকিকভাবে সুপেয় হয়ে ওঠে। এরপর রেফিদিম উপত্যকায় পুনরায় চরম পানিশূন্যতা দেখা দিলে আল্লাহ তাআলা মুসা (আ.)-কে তাঁর লাঠি দিয়ে একটি পাথরে আঘাত করার নির্দেশ দেন। পবিত্র কুরআনের সূরা আল-বাকারার ৬০ নম্বর আয়াত অনুসারে, সেই পাথর থেকে তৎক্ষণাৎ বারোটি সুপেয় ঝরনা প্রবাহিত হয়। বনি ইসরাইলের বারোটি গোত্রের প্রত্যেকে নিজেদের নির্ধারিত ঝরনা চিনে নেয়, যা গোত্রগুলোর মাঝে পানির দখল নিয়ে সম্ভাব্য রক্তক্ষয়ী সংঘাত চিরতরে বন্ধ করে দেয়।
পানির এই অলৌকিক সমাধান নিশ্চিত করার পর কাফেলাটি এসে পৌঁছায় ঐতিহাসিক সিনাই পর্বত বা তূর পর্বতের পাদদেশে। এখানে পৌঁছানোর পর আল্লাহ তাআলা হযরত মুসা (আ.)-কে নির্দেশ দেন চল্লিশ রাতের জন্য নির্জন পর্বতের চূড়ায় আরোহণ করতে, যেখানে তাঁকে একটি জাতির সামগ্রিক জীবনবিধান হিসেবে আসমানি কিতাব তাওরাত প্রদান করা হবে। মুসা (আ.) স্বীয় সহোদর ভ্রাতা ও নবী হযরত হারুন (আ.)-কে তাঁর অনুপস্থিতিতে বনি ইসরাইলের তত্ত্বাবধায়ক ও নেতা হিসেবে নিযুক্ত করে তূর পাহাড়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। পর্বতের শীর্ষদেশে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা মুসা (আ.)-এর সাথে সরাসরি বাক্যালাপ করেন (কালামুল্লাহ) এবং পাথুরে ফলকে (আলওয়াহ) উৎকীর্ণ অবস্থায় তাওরাতের মৌলিক ঐশী বিধানাবলি দান করেন। এই বিধানে ছিল তাওহিদের অবিচল ঘোষণা, পিতা মাতার প্রতি কর্তব্য, মানবজীবনের সুরক্ষা, নৈতিক সততা, চুরি ও ব্যভিচার বর্জনের মতো সার্বজনীন সামাজিক ও আধ্যাত্মিক আইন।
পবিত্র কুরআনের সূরা আল-আরাফের ১৭১ নম্বর আয়াতে এই ঐতিহাসিক চুক্তির এক মহিমান্বিত দৃশ্য বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা সিনাই পর্বতমালাকে তাদের মাথার ওপর একটি সুবিশাল মেঘমালার মতো ঝুলিয়ে ধরেন, যেন তা তাদের ওপর পতিত হতে চলেছে। সেই চরম গাম্ভীর্যের মুহূর্তে বনি ইসরাইল আল্লাহর কাছে অঙ্গীকার করেছিল যে তারা তাওরাতের প্রতিটি বিধান বিশ্বস্ততার সাথে মেনে চলবে এবং একমাত্র আল্লাহর আনুগত্যে অবিচল থাকবে। এটি ছিল এক যাযাবর শরণার্থী গোষ্ঠীর একটি সুসংহত আইনভিত্তিক তাওহিদি জাতিতে রূপান্তরিত হওয়ার প্রথম সাংবিধানিক দলিল।
অধ্যায় ২: স্বর্ণের গোবৎস, সামেরির বিভ্রান্তি ও বনি ইসরাইলের আধ্যাত্মিক দোদুল্যমানতা
তূর পর্বতের শীর্ষে মুসা (আ.)-এর অবস্থান নির্ধারিত ত্রিশ রাতের পর আরও দশ রাত বৃদ্ধি পেয়ে যখন চল্লিশ রাতে পৌঁছাল, তখন নিচে সমতলে বনি ইসরাইলের অন্তরে এক মারাত্মক অস্থিরতার জন্ম নিল। তাদের অধৈর্য মনস্তত্ত্ব ধরে নিল যে মুসা (আ.) হয়তো পর্বতচূড়ায় পথ হারিয়েছেন অথবা আর কখনো ফিরে আসবেন না। এই নেতৃত্বের শূন্যতার সুযোগ গ্রহণ করে 'সামেরি' নামক এক চতুর ও ধূর্ত ব্যক্তি। সে ছিল মূলত এক ছদ্মবেশী সুবিধাবাদী, যে মিশরীয় পৌত্তলিক সংস্কৃতি ও জাদুবিদ্যার প্রভাবে গভীরভাবে প্রভাবিত ছিল। সমকালীন প্রাচীন মিশরে বাছুর বা ষাঁড়ের উপাসনা (যেমন অপিস বুল বা দেবী হাথোরের কাল্ট) ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। সামেরি বনি ইসরাইলের মানুষকে বোঝাল যে দৃশ্যমান কোনো রূপ ছাড়া তাদের উপাসনা অসম্পূর্ণ।
সামেরির প্ররোচনায় বনি ইসরাইলের লোকেরা মিশর থেকে সঙ্গে করে আনা তাদের সমস্ত স্বর্ণালংকার একটি অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করে। সামেরি সেই গলিত স্বর্ণ দিয়ে একটি নিখুঁত বাছুরের অবয়ব তৈরি করে, যা ছিল ফাঁপা এবং যার ভেতরে বাতাস প্রবেশ করলে অলৌকিক এক ধরনের গোঁ গোঁ আওয়াজ বের হতো। এটি প্রদর্শন করে সামেরি ঘোষণা করল: এটিই তোমাদের উপাস্য এবং মুসারও উপাস্য, যা সে ভুলে গিয়ে পর্বতে খুঁজতে গেছে। দীর্ঘদিনের দাসত্বে ক্লান্ত এবং চাক্ষুষ উপাসনায় অভ্যস্ত অর্বাচীন জনতার একটি বিশাল অংশ এই কৃত্রিম স্বর্ণের গোবৎসের সামনে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে এবং নাচ গানে মত্ত হয়ে ওঠে।
হযরত হারুন (আ.) এই প্রকাশ্য শির্ক ও মূর্তিপূজা বন্ধ করতে তাঁর সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিলেন। পবিত্র কুরআনের সূরা ত্বা-হার ৯০ নম্বর আয়াতে বর্ণিত হয়েছে যে হারুন (আ.) তাদের চিৎকার করে সতর্ক করেছিলেন: হে আমার সম্প্রদায়, নিশ্চয় এর মাধ্যমে তোমাদের পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে; তোমাদের প্রকৃত প্রতিপালক পরম দয়ালু রহমান, সুতরাং তোমরা আমার আনুগত্য করো। কিন্তু বিভ্রান্ত জনতা তাঁর কথায় কর্ণপাত করেনি; বরং তারা তাঁকে হত্যা করার হুমকি দেয়। হারুন (আ.) ভাই মুসা (আ.)-এর প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ এড়িয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন।
চল্লিশ রাত পর পাথুরে ফলকগুলো হাতে নিয়ে যখন মুসা (আ.) শিবিরে ফিরে আসেন, তখন দূর থেকে ঢোলের আওয়াজ ও গোবৎসের পূজা দেখে তিনি চরম ক্রোধ ও শোকে স্তব্ধ হয়ে যান। তীব্র মানসিক উত্তেজনায় তিনি হাতের ফলকগুলো মাটিতে রেখে দেন এবং ভ্রাতা হারুনের দাড়ি ও চুল ধরে তীব্র জবাবদিহি চান। হারুন (আ.) বিনয়ের সাথে তাঁর অসহায়ত্ব ও গোত্রীয় বিভাজনের ভয়ের কথা তুলে ধরলে মুসা (আ.) শান্ত হন এবং সামেরির মুখোমুখি হন। মুসা (আ.) সামেরিকে চিরতরে সমাজচ্যুত করে ঘোষণা করেন যে তার জীবনে কোনো মানুষ তাকে স্পর্শ করতে পারবে না (লা মিসাস)। এরপর তিনি সেই স্বর্ণের গোবৎসটিকে আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে সমুদ্রে ভাসিয়ে দেন, যাতে তার কোনো অস্তিত্ব অবশিষ্ট না থাকে। তওবার অংশ হিসেবে সত্যপন্থী এবং অপরাধীদের মাঝে কঠোর শুদ্ধি অভিযান পরিচালিত হয় এবং মুসা (আ.) সত্তর জন নির্বাচিত প্রবীণ নেতাকে সাথে নিয়ে পুনরায় পর্বতে গমন করে আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
অধ্যায় ৩: কানআন সীমান্তে গুপ্তচর প্রেরণ, জাব্বারিনদের ভীতি ও তিহ ময়দানে চল্লিশ বছরের শাস্তি
স্বর্ণের গোবৎস পূজার মারাত্মক আত্মিক সংকট কাটিয়ে ওঠার পর বনি ইসরাইল পুনরায় তাদের মূল লক্ষ্য অর্থাৎ কানআনের পবিত্র ভূমির উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। তারা সিনাই পর্বত ত্যাগ করে উত্তর পূর্বে অবস্থিত কাদেশ বারনিয়া (Kadesh Barnea) নামক এক প্রান্তিক মরূদ্যানে পৌঁছায়, যা ছিল কানআন বা ফিলিস্তিনের দক্ষিণ সীমান্ত। এই স্থানে পৌঁছানোর পর হযরত মুসা (আ.) আল্লাহর নির্দেশ তাদের সামনে ঘোষণা করেন, যা সূরা আল-মায়িদাহর ২১ নম্বর আয়াতে লিপিবদ্ধ আছে: হে আমার সম্প্রদায়, পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ করো যা আল্লাহ তোমাদের জন্য বরাদ্দ করেছেন, এবং পেছনে ফিরে যেয়ো না, অন্যথায় তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
পবিত্র ভূমির প্রতিরক্ষা, জনমিতি ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা যাচাই করার উদ্দেশ্যে মুসা (আ.) প্রতিটি গোত্র থেকে একজন করে মোট বারোজন প্রধান বা গুপ্তচরকে (নুকাউবা) কানআনে পাঠান। এই বারোজন প্রতিনিধি পুরো কানআন ভূখণ্ড, বিশেষ করে আল-খলিল (হেবরন) এবং এশকোল উপত্যকা পরিদর্শন করেন। তারা দেখতে পান যে কানআন এক অপূর্ব উর্বর শস্যশ্যামল ভূমি, কিন্তু একই সাথে তারা প্রত্যক্ষ করেন যে সেখানকার প্রাচীন অধিবাসীরা (আমালেকীয় ও কানআনীয় গোষ্ঠী, যাদের কুরআনে 'কওমে জাব্বারিন' বা পরাক্রান্ত জাতি বলা হয়েছে) ছিল অত্যন্ত বলিষ্ঠ, দীর্ঘকায় ও সুসংগঠিত এবং তাদের নগরগুলো ছিল সুবিশাল দুর্গপ্রাচীরে সুরক্ষিত।
চল্লিশ দিন পর ফিরে এসে বারোজন গুপ্তচরের মধ্যে দশজনই চরম ভীতি ও পরাজয়মূলক খবর সমগ্র শিবিরে ছড়িয়ে দেয়। তারা মানুষের মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টি করে দাবি করে যে কানআনের অধিবাসীরা দানবীয় এবং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কেবল দুজন সত্যনিষ্ঠ ও আল্লাহভীরু নেতা, ইউশা ইবনে নুন এবং কালিব ইবনে ইউফান্না, জনগণকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। তাঁরা সাহসী কণ্ঠে বলেন: তোমরা তাদের বিরুদ্ধে প্রধান নগরফটক দিয়ে প্রবেশ করো; ফটকে প্রবেশ করলেই তোমরা নিশ্চিত বিজয়ী হবে, এবং একমাত্র আল্লাহর ওপর ভরসা করো যদি তোমরা মুমিন হও।
কিন্তু শতাব্দীব্যাপী দাসত্বের শৃঙ্খল বনি ইসরাইলের অন্তর থেকে সমস্ত তেজ ও বীরত্ব হরণ করে নিয়েছিল। তারা কান্নায় ভেঙে পড়ে এবং বলতে থাকে যে মিশরে বা এই মরুভূমিতে মরে যাওয়াই তাদের জন্য শ্রেয় ছিল। চরম ঔদ্ধত্য ও ধৃষ্টতা প্রকাশ করে তারা মুসা (আ.)-এর মুখে সরাসরি বলে বসে সেই কুখ্যাত বাক্য: হে মুসা, তুমি ও তোমার প্রতিপালক গিয়ে যুদ্ধ করো, আমরা এখানেই বসে রইলাম। এই চরম আনুগত্যহীনতা মুসা (আ.)-কে গভীরভাবে ব্যথিত করে। তিনি আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানান যে তাঁর নিজের ও ভ্রাতা হারুন ছাড়া এই জাতির ওপর তাঁর আর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।
বনি ইসরাইলের এই প্রকাশ্য বিদ্রোহের জবাবে নেমে আসে অলৌকিক ঐশী সিদ্ধান্ত। পবিত্র কুরআনের সূরা আল-মায়িদাহর ২৬ নম্বর আয়াত অনুসারে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন: এই ভূমি চল্লিশ বছরের জন্য তাদের ওপর নিষিদ্ধ করা হলো; তারা জমিনে দিকভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়াবে। এই আদেশের ফলেই সূচিত হয় বিখ্যাত 'তিহ ময়দানের নির্বাসন' (The 40-Year Wilderness Wandering)। একটি জাতির মন থেকে দাসত্বের ভীরুতা দূর করতে এবং স্বাধীনতার উপযোগী নতুন মানসিকতা তৈরি করতে প্রয়োজন ছিল এক সম্পূর্ণ নতুন প্রজন্মের আগমন।
| তুলনামূলক বৈশিষ্ট্য ও মাপকাঠি | মিশরের দাসত্বে লালিত আদি প্রজন্ম | তিহ মরুভূমির আলো বাতাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্ম |
|---|---|---|
| মানসিক গঠন ও মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা | হীনমন্য, ভীরু, পরনির্ভরশীল ও দাসমনোবৃত্তির শৃঙ্খলে বন্দি | স্বাধীনচেতা, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন, কষ্টসহিষ্ণু ও নির্ভীক |
| তাওহিদের প্রতি আনুগত্যের গভীরতা | সামান্য সংকটেই মূর্তিপূজা ও শির্কের প্রতি চরম দোদুল্যমান | মুসা ও তাওরাতের শিক্ষার ওপর অবিচল বিশ্বাসী ও একত্ববাদী |
| সামরিক ও ভৌগোলিক দৃষ্টিভঙ্গি | কানআনের শত্রুর ভয়ে পলায়নপর ও যুদ্ধে সম্পূর্ণরূপে অনীহা | ইউশা ইবনে নুনের নেতৃত্বে প্রতিশ্রুত ভূমি জয়ে বীরত্বপূর্ণ ও প্রস্তুত |
| প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবিলার সক্ষমতা | অভিযোগপ্রবণ, আরামপ্রিয় এবং মিশরের দাসত্বের প্রতি নস্টালজিক | মরুভূমির রুক্ষ কৃচ্ছ্রসাধনে অভ্যস্ত ও ইস্পাতকঠিন শৃঙ্খলায় বলীয়ান |
এই তুলনামূলক রূপরেখা প্রমাণ করে যে চল্লিশ বছরের তিহ পর্ব কোনো নিষ্ফল সময়ক্ষেপণ ছিল না; বরং তা ছিল একটি জাতিকে সামরিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে পুনর্গঠনের এক অপরিহার্য ঐতিহাসিক ফিল্টারিং প্রক্রিয়া।
অধ্যায় ৪: তিহ প্রান্তরে মান্না ও সালওয়ার জীবন, দ্বাদশ ঝরনা ও নতুন প্রজন্মের ঐতিহাসিক রূপান্তর
তিহ ময়দান ছিল মূলত সিনাই উপদ্বীপ ও দক্ষিণ নেগেভের মধ্যবর্তী এক বিশাল অনুর্বর চুনাপাথরের মালভূমি। ভৌগোলিক বিচারে এই অঞ্চলটি কোনো স্থায়ী বসতি বা কৃষিকাজের উপযোগী ছিল না। প্রতিদিন সকালে বনি ইসরাইলের তাঁবুগুলো গুটিয়ে তারা নতুন পথের সন্ধানে যাত্রা করত, কিন্তু দিনশেষে অলৌকিকভাবে তারা নিজেদের সেই একই স্থানে আবিষ্কার করত। এই অদ্ভুত বৃত্তাকার গোলকধাঁধায় আটকা পড়ে চার দশক ধরে তাদের কাটাতে হয়। কিন্তু এই চরম শাস্তির মাঝেও আল্লাহর রহমত তাঁদের সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করেনি। মরুভূমির প্রখর রৌদ্রতাপে যাতে এই বিশাল জনসমষ্টি পুড়ে ছাই না হয়ে যায়, সেজন্য আল্লাহ তাআলা তাদের মাথার ওপর দিবসে অলৌকিক শীতল মেঘমালার ছায়া (গামাম) বিস্তার করে রাখতেন।
অনুর্বর প্রান্তরে কোটি কোটি মানুষের খাদ্যের সংকট নিরসনে নেমে এসেছিল জান্নাতি খাদ্য মান্না ও সালওয়া। প্রতিদিন ভোরে শিশিরের মতো মাটির ওপর জমে থাকত মিষ্টি সাদা দানা, যা ছিল 'মান্না'; আর সন্ধ্যার বাতাসে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে আসত চর্বিযুক্ত সুস্বাদু পাখি 'সালওয়া'। কোনো ধরনের হালচাষ বা শ্রম ছাড়াই তারা প্রতিদিন এই পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করত। কিন্তু দাসমনোবৃত্তির অন্যতম প্রধান লক্ষণ হলো অলৌকিক নেয়ামতের মাঝেও তুচ্ছ পার্থিব লালসার জন্য হা হুতাশ করা। কিছুকাল এই একঘেয়ে খাবার খাওয়ার পর তারা পুনরায় মুসা (আ.)-এর কাছে অভিযোগ তোলে: আমরা একই খাবারে কখনো সন্তুষ্ট থাকতে পারি না; সুতরাং আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করুন তিনি যেন আমাদের জন্য রসুন, পেঁয়াজ, শসা ও ডাল উৎপাদন করে দেন। সূরা আল-বাকারার ৬১ আয়াতে মুসা (আ.) ধিক্কার দিয়ে বলেছিলেন: তোমরা কি উৎকৃষ্টের বিনিময়ে নিকৃষ্ট বস্তু গ্রহণ করতে চাও? তবে কোনো এক শহরে চলে যাও, সেখানে তোমরা যা চাও তা পাবে।
এই দীর্ঘ মরুযাত্রার মাঝেই বনি ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা ও অহংকারের এক চরম প্রকাশ ঘটেছিল ধনাঢ্য কারুনের (Korah) বিদ্রোহে। কারুন ছিল বনি ইসরাইল বংশোদ্ভূত, কিন্তু সে মিশরের আমলেই ফারাওয়ের অনুগ্রহে বিপুল ঐশ্বর্যের মালিক হয়েছিল। তার ধনভাণ্ডারের চাবিগুলো বহন করতেই একদল শক্তিশালী মানুষের প্রয়োজন হতো। মরুভূমির শৃঙ্খলায় যখন মুসা (আ.) জাকাত ও সম্পদের সামাজিক হক আদায়ের নির্দেশ দিলেন, তখন কারুন উদ্ধত কণ্ঠে দাবি করল যে এই ধনসম্পদ তার নিজস্ব মেধা ও জ্ঞানের দ্বারা অর্জিত। চরম অহংকারে কারুন যখন মুসা (আ.)-এর নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ উসকে দিল, তখন আল্লাহর গযবে কারুন ও তার সমস্ত অট্টালিকা এবং ধনভাণ্ডারকে জীবন্ত অবস্থায় মাটির গভীরে ধসিয়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনাটি মরুভূমির সমাজে প্রমাণ করেছিল যে সম্পদের দম্ভ আল্লাহর ঐশী বিধানের সামনে কতখানি তুচ্ছ।
চল্লিশ বছরের এই ধারাবাহিক পরিক্রমায় একে একে মৃত্যুবরণ করে মিশরের দাসত্বে জন্ম নেওয়া সেই ভীরু প্রজন্ম। মরুভূমির ধূলিঝড় ও তপ্ত বাতাসের ভেতর শৈশব ও কৈশোর কাটিয়ে বড় হয়ে ওঠে এক নতুন প্রজন্ম। তারা মিশরীয় চাবুকের শব্দ শোনেনি, তারা ফারাওয়ের প্রাসাদের ঐশ্বর্য দেখে হীনমন্যতায় ভোগেনি; বরং তারা শৈশব থেকেই দেখেছে তূর পর্বতের গাম্ভীর্য, লাঠির আঘাতে পাথর থেকে ঝরনা ফোটার অলৌকিকতা এবং একমাত্র আল্লাহর ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকার বাস্তবতা। এই নতুন প্রজন্ম ছিল শারীরিক দিক থেকে অত্যন্ত সুঠাম, মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং আধ্যাত্মিক দিক থেকে তাওহিদের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ।
তিহ ময়দানের সমাপ্তিলগ্নে ইতিহাসের মঞ্চ থেকে একে একে বিদায় নেন বনি ইসরাইলের প্রথম যুগের মহান কাণ্ডারিরা। প্রথমে হর পর্বতের চূড়ায় ওফাত লাভ করেন শান্ত ও বিজ্ঞ নবী হযরত হারুন (আ.)। এর কিছুদিন পর, যখন নতুন প্রজন্ম কানআন অভিযানের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত, তখন জাবাল নিবো বা পিসগাহ পর্বতের শিখরে দাঁড়িয়ে দূর থেকে কানআনের পবিত্র ভূমি প্রত্যক্ষ করেন মহিমান্বিত পয়গম্বর হযরত মুসা (আ.)। একশত বিশ বছর বয়সে পৌঁছে মুসা (আ.) বুঝতে পারেন যে তাঁর ঐতিহাসিক দায়িত্ব সমাপ্ত হয়েছে। আল্লাহর দরবারে তিনি অন্তিম প্রার্থনা জানান যাতে তাঁর কবরটি প্রতিশ্রুত পবিত্র ভূমির অন্তত একটি ঢিল ছোঁড়া দূরত্বের ভেতরে হয়। জর্ডান নদীর পূর্ব তীরে লাল বালিয়াড়ির কাছে তিনি পরম শান্তিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বনি ইসরাইলের নেতৃত্ব অর্পিত হয় তরুণ সেনাপতি ও নবী হযরত ইউশা ইবনে নুনের ওপর, যাঁর কাঁধে চেপে এই নতুন জাতিটি প্রস্তুত হয় কানআনের দুর্ভেদ্য প্রাচীর ভাঙার ঐতিহাসিক অভিযানে।
আমরা কী শিখলাম?
১. দাসমনোবৃত্তি অপসারণের দীর্ঘ প্রক্রিয়া: একটি জাতির বাহ্যিক ভৌগোলিক মুক্তি দ্রুত ঘটলেও তার মনস্তত্ত্ব থেকে হীনমন্যতা, পরনির্ভরশীলতা ও ভীরুতার শৃঙ্খল ভাঙতে সুদীর্ঘ সময় ও প্রজন্মগত রূপান্তরের প্রয়োজন হয়।
২. ঐশী নেয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতার পরিণতি: বারবার অলৌকিক সাহায্য ও খাদ্য নিরাপত্তা পাওয়ার পরেও তুচ্ছ পার্থিব চাহিদার জন্য বিলাপ করা নৈতিক অবক্ষয়ের স্পষ্ট লক্ষণ।
৩. চাক্ষুষ রূপের মোহ ও শির্কের বিপদ: অদৃশ্য এক আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণ বিশ্বাসের অভাব মানুষকে বারবার দৃশ্যমান প্রতীকের মোহে টানে, যার করুণ পরিণতি ছিল স্বর্ণের গোবৎস পূজার বিভীষিকা।
৪. নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য ও সাহসিকতা: আল্লাহর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কেবল বিশ্বাসই যথেষ্ট নয়; বরং নির্দেশ এলে বাস্তব বিপদ মোকাবিলায় বীরত্ব ও আত্মত্যাগের সাথে ময়দানে নামা অপরিহার্য।
৫. কৃচ্ছ্রসাধনের মধ্য দিয়ে জাতির নবজন্ম: বিলাসিতা ও দাসত্বের আরাম ছেড়ে মরুভূমির কঠোর পরিশ্রম ও শৃঙ্খলাই একটি জাতিকে অপরাজিত সামরিক ও আত্মিক শক্তিতে রূপান্তর করতে পারে।
উপসংহার
হযরত মুসা (আ.)-এর নেতৃত্বে সিনাই প্রান্তর ও তিহ ময়দানের চল্লিশ বছরের নির্বাসন পর্বটি ছিল বনি ইসরাইলের ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন অথচ সবচেয়ে গঠনমূলক অধ্যায়। লোহিত সাগরের মোহনা থেকে শুরু করে জাবাল মুসার তাওরাত প্রাপ্তি, গোবৎসের বিভ্রান্তি এবং কাদেশ বারনিয়ায় কানআন জয়ে অস্বীকৃতির প্রতিটি ঘটনা একটি নবজাতক জাতির আত্মিক দোদুল্যমানতার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। মিশরের দাসত্বের বোঝা কাঁধে নিয়ে একটি জাতি কখনোই স্বাধীন রাষ্ট্র ও সার্বভৌম সভ্যতা নির্মাণ করতে পারে না; তিহ ময়দানের কঠোর মরুপ্রান্তর সেই দাসত্বকে ভস্মীভূত করে এক নতুন তেজস্বী প্রজন্ম উপহার দিয়েছিল।
এই চল্লিশ বছরে বনি ইসরাইল যাযাবর শরণার্থীদের দল থেকে উন্নীত হয়েছিল একটি সুসংহত আইনভিত্তিক তাওহিদি সমাজে। মান্না ও সালওয়ার অলৌকিক আহার, বারোটি ঝরনার সুষম বণ্টন এবং মুসা (আ.)-এর অটল অভিভাবকত্ব তাদের শিখিয়েছিল যে সামরিক শক্তির চেয়েও বড় শক্তি হলো আল্লাহর ওপর অবিচল তাওয়াক্কুল ও আত্মত্যাগ। মহিমান্বিত পয়গম্বর মুসা (আ.) তাঁর গোটা জীবন উৎসর্গ করেছিলেন একটি অবাধ্য জাতিকে মানুষের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করতে; আর নিজের মৃত্যুর প্রাক্কালে তিনি তাদের রেখে গিয়েছিলেন প্রতিশ্রুত ভূমির উন্মুক্ত দরজায়।
কীভাবে মুসা (আ.)-এর ওফাতের পর বীর সেনাপতি ও নবী হযরত ইউশা ইবনে নুন (আ.) সেই মরু-প্রশিক্ষিত অপরাজেয় নতুন প্রজন্মকে সাথে নিয়ে জর্ডান নদী অতিক্রম করলেন, কীভাবে আল-মুকাদ্দাসাহ ভূমির প্রথম দুর্গনগরী জেরিকোর বিশাল প্রাচীর ভেঙে পবিত্র ভূমিতে বনি ইসরাইলের ঐতিহাসিক প্রবেশ ঘটল এবং কীভাবে শতাব্দীকালের নির্বাসন শেষে পিতা ইবরাহিম ও ইয়াকুবের চারণভূমিতে তাওহিদের পতাকা পুনরায় উড্ডীন হলো, সেই বিজয়গাথা উন্মোচিত হবে সিরিজের পরবর্তী পর্বে।
নিজেকে যাচাই করুন
এই লেখার কুইজ
সিনাইয়ের রেফিদিম উপত্যকায় পানির তীব্র সংকট দেখা দিলে মুসা (আ.)-এর লাঠির আঘাতে পাথর থেকে কয়টি প্রস্রবণ বা ঝরনা প্রবাহিত হয়েছিল?
আল্লাহ তাআলা হযরত মুসা (আ.)-কে তাওরাতের বিধানাবলি প্রদানের জন্য তূর পর্বতে মোট কত রাতের অঙ্গীকারে ডেকেছিলেন?
মুসা (আ.)-এর অনুপস্থিতিতে বনি ইসরাইলকে বিভ্রান্ত করে স্বর্ণের অলংকার গলিয়ে গোবৎস তৈরি করেছিল কোন ব্যক্তি?
কানআন বিজয়ের প্রস্তুতি হিসেবে কাদেশ বারনিয়া থেকে প্রেরিত বারোজন প্রতিনিধির মধ্যে কারা ভীতি উপেক্ষা করে নগরফটক দিয়ে প্রবেশের আহ্বান জানিয়েছিলেন?
কানআনে প্রবেশে অস্বীকৃতি ও অবাধ্যতার কারণে বনি ইসরাইলের ওপর তিহ প্রান্তরে কত বছরের জন্য দিকভ্রান্ত নির্বাসনের ঐশী নির্দেশ এসেছিল?
তিহ প্রান্তরের দীর্ঘ নির্বাসনকালে বনি ইসরাইলের ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য আকাশ থেকে কোন দুটি খাদ্য নিয়মিত অবতীর্ণ হতো?
মরুভূমিতে মুসা (আ.)-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও সম্পদের চরম অহংকার প্রদর্শনের কারণে কারুনকে কীভাবে ঐশী শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়েছিল?
চল্লিশ বছরের মরু নির্বাসনের সমাপ্তিলগ্নে প্রতিশ্রুত পবিত্র কানআন ভূমি দূর থেকে প্রত্যক্ষ করে হযরত মুসা (আ.) কোন পর্বতে ইনতিকাল করেন?
এই বিষয়ের কুইজ চ্যালেঞ্জ
কানআন থেকে গাজা কুইজে যান